reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ২৯ ডিসেম্বর, ২০২১

বিবিসির গবেষণা তথ্য

মানসিক চাপে ভুগছে শহরের অধিকাংশ কিশোর-কিশোরী

পড়াশোনা নিয়েও মানসিক চাপে থাকেন কিশোর বয়সীরা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা বাড়ছে, কিন্তু নানা ধরনের বিষণ্ণতা এবং অবসাদ কিংবা আত্মহত্যার মতো ঘটনাও বাড়ছে। বিশেষ করে ১৩-১৯ বছর বয়সী শহুরে ছেলেমেয়েদের ৬০ শতাংশের বেশি মাঝারি থেকে তীব্র মানসিক চাপে ভোগে।

বুধবার (২৮ ডিসেম্বর) আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি বাংলার জরিপ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে।

ওই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, ১৩ থেকে ১৯ বছরের কিশোর-কিশোরীদের অতিরিক্ত মানসিক চাপের ফলে তাদের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়, যাদের একটি বড় অংশ স্থূলতা এবং বিষণ্ণতায় ভোগে।

এছাড়া শহুরে ছেলেমেয়েদের মধ্যে শারীরিকভাবে সক্রিয় মানে নিয়মিত খেলাধুলা এবং কায়িক পরিশ্রমের কাজ করে মাত্র আড়াই শতাংশের কিছু বেশি কিশোর-কিশোরী।

বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশন, পাবলিক হেলথ ইন্সটিটিউট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি সংস্থার করা যৌথ এই গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তানদের এ ধরনের মানসিক চাপের ব্যাপারে পরিবারে বা অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা খুবই কম। ফলে মানসিক চাপ সামলাতে পরিবার এবং স্কুলের সহায়তাও খুবই কম পায় তারা।

মানসিক চাপের কারণ : আমব্রিনা ফেরদৌস নামে এক গবেষক জানান, জরিপটি মহামারি শুরুর আগে ২০১৯ সালে ঢাকাসহ দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে পরিচালনা করা হয়েছিল। বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল বিএমআরসি গবেষণা নিবন্ধটি অনুমোদন দিয়েছে। প্রায় সাড়ে চার হাজারের বেশি কিশোর-কিশোরীর সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে গবেষণাটি প্রকাশ করা হয়।

দেখা যায়, বয়ঃসন্ধিকালে সারা পৃথিবীতেই ছেলেমেয়েরা নানা রকম মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। আর হরমোনের নানা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশার চাপ। ভালো স্কুলে শিক্ষার সুযোগ পাওয়া, ভালো ফলসহ শিক্ষা কার্যক্রমে সাফল্য এমনতর নানাবিধ চাপ তৈরি হয় ছেলেমেয়েদের ওপর।

ওই গবেষক জানান, ছেলেমেয়েরা সবচেয়ে বেশি মানসিক চাপ বোধ করে পড়াশোনা নিয়ে। পরীক্ষার রেজাল্ট, বাবা-মায়েদের প্রত্যাশা এবং স্কুলে পড়াশোনার চাপ থেকে তারা সবচেয়ে বেশি মানসিক চাপ অনুভব করে। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে কোথায় পড়তে যাবে, কী করবে এসব নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগে এই বয়সী ছেলেমেয়েরা। তাছাড়া শারীরিক অবয়ব দেখতে কেমন তা নিয়েও রয়েছে বিস্তর চাপ।

শহুরে ছেলেমেয়েদের খাদ্যাভ্যাসে জাঙ্কফুড গ্রহণের প্রবণতা বেশি, খেলাধুলার সুযোগও কম। ফলে তাদের মধ্যে ওবেসিটির (স্থূলতা) সমস্যা প্রকটভাবে রয়েছে। ফলে এ নিয়েও ছেলেমেয়েরা মানসিক চাপের মধ্যে পড়ে।

ওই গবেষক আরও জানান, কিশোর বয়সী ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মা-বাবার মানসিক দূরত্ব, নাগরিক জীবনে একক পরিবার কাঠামোর কারণে একাকীত্ব, স্কুলে বা অবসর সময়ে সমবয়সীদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, বুলিয়িং—এসব কারণও তাদের মানসিক চাপ সৃষ্টিতে সহায়ক বলে প্রত্যক্ষ করেছে গবেষক দল। ফলে অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের জীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে। প্রায়শই তারা নিজেদের সমস্যার কথা তারা পরিবারের সঙ্গে শেয়ার করতে পারে না। এক্ষেত্রে তারা বন্ধু বা সমবয়সীদের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

বাড়তি ওজন কমানোর জন্য শারীরিক পরিশ্রমের কাজ কিংবা বিশেষজ্ঞ পরামর্শের বদলে খাওয়া কমিয়ে দেয়, যা পরে তাদের শরীরে পুষ্টির ঘাটতি তৈরি করে।

গবেষণা পরিসংখ্যান বলছে, ২৬ শতাংশের বেশি শহুরে কিশোর-কিশোরীর ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। এছাড়া ৩০ শতাংশের বেশি ছেলেমেয়ে দিনের বড় সময়টি বাড়ির ভেতরেই থাকে। এছাড়া ঘরের বাইরে খেলাধুলা এবং কায়িক পরিশ্রমের কাজ করে মাত্র ২.৬ শতাংশ কিশোর-কিশোরী।

শহর এলাকায় খোলা জায়গার অভাব এবং ইনডোর গেমের প্রতি আকর্ষণের কারণে ওবেসিটির সমস্যা দিন দিন বাড়ছে। এসব সমস্যা চিহ্নিত করে, একে এড়িয়ে না গিয়ে সমাধানের দিকে নজর দেবার পরামর্শ দেয়া হয়েছে গবেষণায়।

অনেকেই না বুঝে কুসংসর্গে পড়ে বিপথগামী হয়, কেউ মাদকাসক্তিসহ নানা রকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে, কেউবা আবার আত্মহণনের পথও বেছে নেয়।

তিনি বলছেন, বয়ঃসন্ধিকালে তাদের সাহায্য দরকার। তারা যে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে তা নিয়ে সচেতনতার কথা বলা হলেও এ নিয়ে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। পরিবার এবং স্কুলগুলোর ভূমিকা এখানে আরো অনেক জোরালো হওয়া দরকার।

গবেষকরা বলছেন, কিশোর-কিশোরীদের এসব মানসিক সমস্যা সমাধানে মা-বাবাদের এগিয়ে আসতে হবে। অন্যথা ছেলেমেয়েদের জীবনে ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে আসতে পারে।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
বিবিসি,গবেষণা জরিপ,কিশোর-কিশোরী,বিষণ্নতা,মানসিক চাপ
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close