লে. কর্নেল নাজমুল হুদা খান, এমফিল, এমপিএইচ

  ১৩ ডিসেম্বর, ২০২১

করোনাকালে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা 

দুবছর ধরে বিশ্ববাসী যুদ্ধ করে যাচ্ছে অদৃশ্য করোনা অতিমারির বিরুদ্ধে। বিশ্বব্যাপী এ পর্যন্ত কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৬৮ কোটি, মৃতের সংখ্যা ৫৩ লাখ। বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা ১৬ লাখের কাছাকাছি; মৃত্যু ঘটেছে ২৮ হাজারের বেশি। অনেকটাই অপরিচিত এ অতিমারির মুখোমুখি হয়ে পৃথিবীর অন্যতম উন্নত দেশসমূহের স্বাস্থ্যব্যবস্থাও ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এই অতিমারি মোকাবিলায় হাসপাতালসমূহের দক্ষতা ও সক্ষমতায় ঘাটতি; স্বাস্থ্যকর্মীর অপর্যাপ্ততা, স্বাস্থ্যসেবায় ব্যবহৃত লজিস্টিকস সরবরাহে অপ্রতুলতা ইত্যাদির কারণে সারা বিশ্বকে হিমশিম খেতে হয়েছে। উপরন্তু কোভিড-১৯ যুদ্ধে লিপ্ত থাকা এবং এ খাতে বিশালাকার বাজেট বরাদ্দের আবশ্যকতার কারণে বৈশ্বিক অন্যান্য স্বাস্থ্যব্যবস্থাও অনেকটা অবহেলিত থেকে গেছে। বাংলাদেশের শহর ও গ্রামীণ বহু হাসপাতাল শুধু কোভিড-১৯ রোগীদের সেবায় নিয়োজিত রয়েছে। ফলে অন্য রোগীরা সাধারণ ও অতিপ্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

বৈশ্বিক এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে ১২ ডিসেম্বর পালিত হচ্ছে বিশ্ব সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা দিবস-২০২১। 'Leave no one’s health behind: Invest in health systems for all' এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বিশ্বের সব দেশে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নকে মূল চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচনা করে বিশ্বনেতারা ও বিশ্ববাসীকে এ কর্মসূচিকে সফল করতে এগিয়ে আসতে আহ্বান জানানো হয়।

এ প্রসঙ্গে বলে রাখা প্রয়োজন, ২০০০ সালে ১৮৯টি দেশের নেতারা MDGবা সহস্রাব্ধ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস, মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং এইডস, ম্যালেরিয়া এবং অন্যান্য রোগ প্রতিরোধসহ ৮টি লক্ষ্য নির্ধারণ করে ২০১৫ সালের মধ্যে তা বাস্তবায়নে সূচক নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। পরে ২০১৫ সালে জাতিসংঘ সাধারণ সভায় ১৭টি লক্ষ্য নির্বাচন করে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে এসডিজি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে স্বাস্থ্যবিষয়ক লক্ষ্যমাত্রাকে বলা হয় SDG-3 : Good health and বিষষ- being। এ কর্মসূচিকে সফল করতে ১৩টি টার্গেটের অন্যতম প্রতিপাদ্য বিষয়Achieve universal health coverageবা সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ কর্মসূচি। যাতে বিশ্ববাসীর আর্থিক ঝুঁকি নিরাময়ের মাধ্যমে সব প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা; নিরাপদ, কার্যকর, উন্নত ও সুলভমূল্যে ওষুধ এবং ভ্যাকসিন নিশ্চিত করার নির্দেশনা রয়েছে। এই সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিশ্বনেতাদের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং বিশ্ববাসীর মধ্যে জনসচেতনতা সৃষ্টির প্রয়াসে জাতিসংঘ ২০১৭ সাল থেকে প্রতি বছর ১২ ডিসেম্বর তারিখে সারা বিশ্বে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা দিবস পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় 'Protect and invest health and care workers' । বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা এবারের লক্ষ্যমাত্রায় ৩০০ কোটি মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। ১০০ কোটি মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো, ১০০ কোটি মানুষকে জরুরি সেবা ও সুরক্ষা প্রদান এবং অপর ১০০ কোটি মানুষের উন্নত স্বাস্থ্য বিনির্মাণে ভূমিকা রাখতে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বব্যাপী সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবাকে সফল করতে ৪টি ক্যাটাগরিতে ১৬টি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবাকে চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত; প্রজনন,মা, শিশু ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবার গ্রুপে-পরিবার পরিকল্পনা, গর্ভবতী ও প্রসব-পরবর্তী মায়ের যত্ন, শিশুকে প্রতিষেধক ভ্যাকসিন প্রদান এবং নিউমোনিয়া চিকিৎসা গ্রহণে সচেতন করে তোলা। দ্বিতীয়ত; সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা উপদলে যক্ষ্মা, এইডস, ম্যালেরিয়া এবং রোগ প্রতিরোধে স্যানিটেশন ব্যবস্থা জোরদার।তৃতীয়ত; অসংক্রামক রোগ শ্রেণিতে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, জরায়ুর ক্যানসার এবং ধূমপানজনিত রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা। চতুর্থত; সেবা সক্ষমতা বৃদ্ধি অধ্যায়ে হাসপাতালের সেবার পরিধি বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বাড়ানো, প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রের পর্যাপ্ত সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুযায়ী স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ।

তবে দুবছর ধরে কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিশ্বের সব দেশের মনোযোগ। এ রোগ প্রতিরোধ চিকিৎসায় বিশাল বাজেট বরাদ্দ ও খরচ এবং জীবনযাত্রার সব পর্যায়ে ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করায় দরিদ্র, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো তো বটেই, উন্নত দেশগুলোওসর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে হিমশিম খাচ্ছে। বলা যায়, কিছু কিছুক্ষেত্রে টেকসই লক্ষ্যমাত্রা মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে বহু দেশে। এই অতিমারি প্রতিরোধ ও চিকিৎসার প্রস্তুতি, দক্ষ জনবল ও সরবরাহ ঘাটতি ছিল সারা বিশ্বে। তাই মৃত্যুর হার বৃদ্ধিসহ নানামুখী প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে প্রথম থেকেই। পরে উন্নত বিশ্বে চাহিদামাফিক জনশক্তি, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলেও অধিকাংশ দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের দেশে বিদ্যমান সম্পদ দিয়ে এই অতিমারিকে ঠেকাতে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা ঝুঁকির সম্মুখীন হয়। ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পরও ভ্যাকসিনপ্রাপ্তি ও সরবরাহ পর্যাপ্ততায় উন্নত দেশের বিপরীতে উন্নয়নশীল দেশসমূহের চিত্রে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। উপরন্তু করোনাভাইরাসের ঘন ঘন ধরন পরিবর্তনের কারণে যুদ্ধটি দীর্ঘায়িত হতে থাকে। ফলে কোভিড-১৯-এর স্বল্পমেয়াদি প্রভাবকে কোনোমতে রোধ করা গেলেও অর্থনীতি, জীবনযাত্রা ও স্বাস্থ্যের অন্যান্য খাতে মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রোধে দীর্ঘ সময় ব্যয় হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এর প্রভাব সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে, তা অনেকটাই নিশ্চিত।

বাংলাদেশে কোভিড-১৯ অতিমারি মোকাবিলার প্রথম থেকেই বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসরণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, মাস্কের ব্যবহার, চলাচলে নিষেধাজ্ঞা, হাত ধোয়া, পরিচ্ছন্নতা ও জীবাণুনাশক ব্যবহারের উদ্যোগ গ্রহণ করে। পাশাপাশি নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও হাসপাতালসমূহের সক্ষমতা যথা- আইসিইউ বেড বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও পিপিই সরবরাহ, টেস্টিং যন্ত্র ও কীট সরবরাহে সর্বশক্তি নিয়োগ করে; ফলে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার নিয়ন্ত্রণে সফলতা লাভ সক্ষম হয়। ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পরও বিভিন্ন উৎস থেকে বিশ্বসেরা ফাইজার, মডার্না, অ্যাস্ট্রেজেনিকা ও সিনোফার্ম ভ্যাকসিন সংগ্রহ ও সর্বস্তরের সাধারণের মধ্যে প্রয়োগ করা হয় এবং আজও পর্যন্ত প্রায় ৫ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক এবং ২ লাখ শিক্ষার্থীকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে।

তবে করোনা অতিমারিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশকেও সামলাতে হয়েছে অতিমারি প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনার সংকট। স্বাস্থ্যকর্মীর অপ্রতুলতা, পর্যাপ্ত ও কার্যকর পিপিইর ঘাটতি, কোভিড-১৯ রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতির অভাব, আইসিইউ সুবিধা ও সংশ্লিষ্ট ওষুধপত্রের অপর্যাপ্ততার মতো কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ফলে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার সূচকসমূহ অর্জনে বেগ পেতে হচ্ছে। যদিও বাংলাদেশ এক যুগব্যাপী সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস এবং তথ্যপ্রযুক্তির সফল ব্যবহারের জন্য ২০১০ সালে জাতিসংঘের ৬৫তম অধিবেশনে বাংলাদেশ বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। তবু প্রায় ৬৫ ভাগ মানুষ এখনো জরুরি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাপ্রাপ্তির প্রয়োজনে নিজের অর্জিত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। তবে জাতিসংঘের মতে, বাংলাদেশে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় শ্রেয়তর স্বাস্থ্য অবকাঠামো রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ৫০০টি উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পাঁচ হাজার ইউনিয়ন সাব-সেন্টার এবং ১৩ হাজারের অধিক কমিউনিটি ক্লিনিক মাঠপর্যায় এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সেবা প্রদানে নিয়োজিত। আমাদের দেশের ৫ বছরের নিচে শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি, প্রতিষেধক টিকা প্রয়োগের হার বৃদ্ধি এবং যক্ষ্মা ও এইডস রোগ নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি করোনা অতিমারিতেও উল্লেখযোগ্য অর্জন। উপরন্তু আমাদের মাতৃমৃত্যুর হার ৭৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, শিশুমৃত্যুর হার অর্ধেকে নেমে এসেছে এবং গড় আয়ু আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের চেয়েও এগিয়ে।

করোনা অতিমারির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার বহু সংকট ও ঘাটতির মধ্যেও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা খাতে অনেক ক্ষেত্রে ইতিবাচক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অতিমারি প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, পরিচ্ছন্ন জীবনযাত্রা এবং স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের অভ্যাসের কারণে অন্যান্য সংক্রামক রোগের বিস্তার কমেছে। করোনার কো-মর্বিডিটির কারণে করোনা রোগের তীব্রতা ও মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ার জন্য অসংক্রামক রোগ ব্যাধির বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। অতিমারি মোকাবিলায় গৃহীত সব পদক্ষেপের কারণে দেশের স্বাস্থ্য কাঠামো, জনশক্তি ও সংক্রামক রোগব্যবস্থা শক্তিশালী হয়েছে, বহুদিন ধরে ঝিমিয়ে পড়া ভ্যাকসিন প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাত উন্নত ও অগ্রসর হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে নিয়োজিত সরকারি-বেসরকারি, এনজিওসহ সব সংস্থা আরো বেশি কার্যকর ও সুসংহত হয়েছে। এসব অগ্রগতি সব দেশে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সহায়তা করবে। এ অগ্রগতিসমূহের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবায় সফলতা আনয়নে কাজে লাগাতে হবে।

টেকসই উন্নয়নে লক্ষ্যমাত্রায় স্বাস্থ্যবিষয়ক এসডিজি-৩ সুস্থ বিশ্ব বিনির্মাণের পূর্বশর্ত। এর ১৩টি টার্গেটে সফলতা আনয়নে যে সূচক নির্ধারণ করা হয়েছে, তা নিম্ন আয়ের এবং উন্নয়নশীল দেশসমূহের জন্য দুরূহ বটে। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণই উন্নত ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনের পূর্বশর্ত; এটি সারা বিশ্বের নেতারা নিজ নিজ দেশ এবং সর্বোপরি সুস্থ ও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গঠনে একমত হয়েছেন। সুতরাং বৈশ্বিক করোনা অতিমারিকে পরাস্ত করেও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব।

লেখক : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

সহকারী পরিচালক, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, কুর্মিটোলা, ঢাকা।

[email protected]

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
লে. কর্নেল নাজমুল হুদা খান, এমফিল, এমপিএইচ,করোনাভাইরাস,মহামারি,অতিমারি,চিকিৎসা
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close