লে. কর্নেল নাজমুল হুদা খান

  ০৫ ডিসেম্বর, ২০২১

করোনার আরেক আতঙ্ক ওমিক্রন  

প্রাচীন যুগের করোনার ইতিহাস আমাদের অজানাই ছিল। তবে কোভিড-১৯-এর আতঙ্ক ও বিস্তৃতির গোড়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। খ্রিস্টপূর্ব ৮ হাজার সালেও পৃথিবীতে এর অস্তিত্ব ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ২৪০০ সালে আলফা, ৩০০০ সালে বেটা ও ডেল্টা এবং ২৮০০ সালে গামা ধরনের উৎপত্তি ঘটে। এর ক্রমধারায় ২০০৩ সালে সার্স কোভি-১, ২০১২ সালে সার্স কোভি এবং দুই বছর ধরে বৈশ্বিক অতিমারি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সার্স কোভি-২ বা নভেল করোনাভাইরাস-২০১৯-এর।

দুই বছর ধরে বিশ্বের ২০০ বেশি রাষ্ট্র এ রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারে অবিরাম যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এ বিধ্বংসী ভাইরাসটিও বসে নেই। পূর্ব পুরুষদের মতোই ক্রমাগত বিবর্তনের ধারা বজায় রেখে একেক সময় একেক রূপে ও সংক্রমণ ক্ষমতা নিয়ে আবির্ভূত হচ্ছে। বৈশ্বিক করোনা অতিমারিতে আলোচিত ধরনগুলোর মধ্যে চীন স্ট্রেইন, দক্ষিণ আফ্রিকা স্ট্রেইন, ব্রাজিল স্ট্রেইন, যুক্তরাজ্য স্ট্রেইন, যুক্তরাষ্ট্র স্ট্রেইন, ভারত ডাবল ও ট্রিপল মিউট্যান্ট স্ট্রেইন, ডেল্টা এবং ডেল্টা প্লাস স্ট্রেইনগুলো সর্বাধিক আলোচিত। এদের প্রতিটির আবির্ভাবে করোনার সংক্রমণ ক্ষমতা বৃদ্ধি, উপসর্গের তীব্রতা ও মৃত্যুর হার বৃদ্ধি, প্রচলিত নির্ণয় পদ্ধতিকে ফাঁকি দেওয়া, অ্যান্টিভাইরাস ওষুধগুলোকে অক্ষম করে ফেলা, দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে অকার্যকর করে রাখা, ভ্যাকসিন গ্রহণের পরও সংক্রমণ, শিশু ও Immunocompromised ব্যক্তির দেহে অধিকতর বিস্তার লাভ এবং সর্বোপরি দেহ থেকে বিদায়ের পরও লং কোভিড সিন্ড্রোম হিসেবে এর উপস্থিতি জানান দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও আগমন অব্যাহত থাকবে।

সারা বিশ্ব করোনার প্রথম ঢেউ সামলিয়ে যখন স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফেরার উদ্যোগ নিচ্ছিল। ভ্যাকসিন অস্ত্র দিয়ে করোনাযুদ্ধে বিজয়ের সফলতা দেখা শুরু করতেই জোরে শোরে আলোচনায় আসে করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মহারাষ্ট্রে; মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। হাসপাতালগুলো কিংবা আইসিইউ শেষ হতে সময় লাগেনি; মৃত্যুর মিছিলও লম্বা হতে থাকে। যার ঢেউ সামলাতে হয়েছে বাংলাদেশকেও।

পুনরায় বিশ্ব যখন করোনা সমাপ্তির ধরন, সময়সীমা প্রভৃতি নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে; দক্ষিণ আফ্রিকায় ফের দেখা দিয়েছে করোনার নতুন বিধ্বংসী রূপ। যাকে আরো ভয়ংকর হিসেবে আখ্যা দিয়েছে জীবাণু ও রোগতত্ত্ববিদরা। জাতিসংঘ এর নাম দিয়েছে ওমিক্রন। যার জেনেটিক কোড বি.১.১.৫২৯। জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ে দেখা গেছে এরই মধ্যে করোনার এ ধরনটির মিউটেশন ঘটেছে প্রায় ৫০ বার এবং স্পাইক প্রোটিনে পরিবর্তন ঘটেছে ৩০ বার। যে স্পাইক প্রোটিনকে ঘিরেই ভ্যাকসিনের আবিষ্কার তারই এতবার রং বদলালে ভ্যাকসিনগুলো এ নতুন ধরনের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর থাকবে তা শিগগিরই জানা যাবে। উপরন্তু ডেল্টা ভাইরাসের রিসেস্টর বাইন্ডিং প্রোটিনে যেখানে পরিবর্তন ঘটেছে মাত্র দুবার; ওমিক্রনে তা ঘটেছে ১০ বার। তাই ডেল্টার চেয়ে এটি অধিক ও দ্রুত সংক্রমণশীল কিনা দ্রুতই বুঝা যাবে।

দক্ষিণ আফ্রিকার গটেং প্রদেশে হঠাৎই সংক্রমণের হার বেড়ে যায় নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। ৯ নভেম্বর রোগীর দেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে সিকোয়েন্সিংয়ের জন্য পাঠানো হয়। ২৪ নভেম্বর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে এর বিস্তারিত তথ্য আসে এবং এ সংস্থা এটিকে ভ্যারিয়েন্ট অব কনসার্ন শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করে। এরই মধ্যে এ ধরনটির সংক্রমণের আশঙ্কায় নামিবিয়া, জিম্বাবুয়ে, বতসোয়ানা, লেসোথো, মোজাম্বিক, এসোয়াটিনি ও মালাবা প্রভৃতি দেশের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ভারত, ইরান ও ব্রাজিল প্রভৃতি দেশও এ ভাইরাসের ব্যাপারে অধিক সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে। এসব দেশে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, কোয়ারেন্টাইন, সীমান্ত ও বিমানবন্দরে স্ক্রিনিং ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। যদিও এ ভাইরাসের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তথাপি বিজ্ঞানীরা ধারনা করছেন, ‘ওমিক্রন ভাইরাসটি সবচেয়ে দ্রুত ও অধিক সংক্রমণক্ষম হবে। উপসর্গ, অসুস্থতার তীব্রতা ও মৃত্যুর হার বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। ভ্যাকসিন ও করোনা চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধগুলোর কার্যকারিতা হ্রাস করবে এবং দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম হবে এ নতুন ভাইরাস।’

এখন পর্যন্ত দক্ষিন আফ্রিকা ছাড়াও ইসরায়েল, হংকং, বেলজিয়াম, বতসোয়ানা প্রভৃতি দেশে করোনা রোগীর দেহে এ নতুন ধরনের শনাক্ত হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের ৬১ জনের দেহে এ ভাইরাস পাওয়া গেছে; তারা সবাই দক্ষিণ আফ্রিকা ভ্রমণকারী। যুক্তরাজ্য ও জার্মানিতেও এ ভাইরাস সংক্রমণের সত্যতা মিলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এরই মধ্যে সামাজিক ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর জোর দিতে বলেছে সব দেশকে। মাঠ পর্যায়ে জরিপ, ভাইরাসটির গতি প্রকৃতি বিশ্লেষণ এবং করোনা টেস্ট বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্বারোপ করেছে এ সংস্থাটি।

বাংলাদেশে এ ধরনের বিস্তার ঘটবে না এমনটি বলা যায় না। সুতরাং প্রথম থেকেই আমাদের সব পর্যায়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধির ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন এবং সবার তা মেনে চলা জরুরি। অন্যথায় আবারও নতুন এক ভয়ংকর ঢেউয়ের মুখোমুখি হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

লেখক : সহকারী পরিচালক, কুর্মিটোলা

জেনারেল হাসপাতাল, কুর্মিটোলা, ঢাকা

[email protected]

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
করোনাভাইরাস,মহামারি,ওমিক্রন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close