লে. কর্ণেল নাজমুল হুদা খান, এমফিল, এমপিএইচ

  ০২ ডিসেম্বর, ২০২১

ওমিক্রন শঙ্কায় শঙ্কিত পৃথিবী

সারা বিশ্ব করোনার প্রথম ঢেউ সামলিয়ে যখন স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফেরার উদ্যোগ নিচ্ছিল। ভ্যাকসিন অস্ত্র দিয়ে করোনাযুদ্ধে বিজয়ের সফলতা দেখা শুরু করতেই জোরেশোরে আলোচনায় আসে করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মহারাষ্ট্রে; মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। হাসপাতালগুলো কিংবা আইসিইউ শেষ হতে সময় লাগেনি; মৃত্যুর মিছিলও লম্বা হতে থাকে। যার ঢেউ সামলাতে হয়েছে বাংলাদেশকেও।

আবার বিশ্ব যখন করোনা সমাপ্তির ধরন, সময়সীমা প্রভৃতি নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে; দক্ষিণ আফ্রিকায় ফের দেখা দিয়েছে করোনার নতুন বিধ্বংসী রূপ। যাকে আরো ভংয়কর হিসেবে আখ্যা দিয়েছে জীবাণু রোগতত্ত্ববিদরা। জাতিসংঘ এর নাম দিয়েছে ওমিক্রন। যার জেনেটিক কোড বি...৫২৯। জিনোম সিকোয়েন্সিংতে দেখা গেছে, এরই মধ্যে করোনার ধরনটির মিউটেশন ঘটেছে প্রায় ৫০ বার এবং স্পাইক প্রোটিনে পরিবর্তন ঘটেছে ৩০ বার। যে স্পাইক প্রোটিনকে ঘিরেই ভ্যাকসিনের আবিষ্কার তারই এতবার রং বদলালে ভ্যাকসিনগুলো নতুন ধরনের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর থাকবে তা শিগগিরই জানা যাবে। উপরন্তু ডেল্টা ভাইরাসের রিসেস্টর বাইন্ডিং প্রোটিনে যেখানে পরিবর্তন ঘটেছে মাত্র দুবার; ওমিক্রনে তা ঘটেছে ১০ বার। তাই ডেল্টার চেয়ে এটি অধিক দ্রুত সংক্রমনশীল কি না দ্রুতই বুঝা যাবে।

দক্ষিণ আফ্রিকার গটেং প্রদেশে হঠাৎ সংক্রমণের হার বেড়ে যায় নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। নভেম্বর রোগীর শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে সিকোয়েন্সিংয়ের জন্য পাঠানো হয়। ২৪ নভেম্বর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে এর বিস্তারিত তথ্য আসে এবং সংস্থা এটিকে ভ্যারিয়েন্ট অব কনসার্ন শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করে। এরই মধ্যে ধরনটির সংক্রমণের আশঙ্কায় নামিবিয়া, জিম্বাবুয়ে, বতসোয়ানা, লেসোথো, মোজাম্বিক, এসোয়াটিনি মালাবা প্রভৃতি দেশের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন। অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ভারত, ইরান ব্রাজিল প্রভৃতি দেশও ভাইরাসের ব্যাপারে অধিক সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে। এখন পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়াও ইসরায়েল, হংকং, বেলজিয়াম, বতসোয়ানা প্রভৃতি দেশে করোনা রোগীর দেহে নতুন ধরনের শনাক্ত হয়েছে। নেদারল্যান্ডের ৬১ জনের দেহে ভাইরাস পাওয়া গেছে; তারা সবাই দক্ষিণ আফ্রিকা ভ্রমণকারী। যুক্তরাজ্য জার্মানিতেও ভাইরাস সংক্রমণের সত্যতা পাওয়া গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এরই মধ্যে সামাজিক ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর জোর দিতে বলেছে সব দেশকে। মাঠ পর্যায়ে জরিপ, ভাইরাসটির গতি প্রকৃতি বিশ্লেষণ এবং করোনা টেস্ট বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্বারোপ করেছে সংস্থাটি।

বাংলাদেশে ধরনের বিস্তার ঘটবে না এমনটি বলা যায় না। সুতরাং প্রথম থেকেই আমাদের সব পর্যায়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধির ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন এবং সবার তা মেনে চলা জরুরি। অন্যথায় আবারও নতুন এক ভয়ংকর ঢেউয়ের মুখোমুখি হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, যা বাংলাদেশের সমাজ অর্থনীতির ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সুতরাং সময় থাকতে সাবধান হওয়ার সময় এসেছে। যেকোনো ধরনের অবহেলা জাতি রাষ্ট্রকে ভয়ংকর নেতিবাচক পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে, যা কখনোই আমাদের প্রত্যাশিত নয়।

লেখক : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

সহকারী পরিচালক, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, কুর্মিটোলা, ঢাকা।

[email protected]

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
ওমিক্রন,মহামারি,করোনাভাইরাস
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close