শেখ নজরুল ইসলাম

  ১৮ আগস্ট, ২০২১

মন্তব্য প্রতিবেদন

সমূলে উৎপাটিত হোক দুর্নীতি

চীনের উহানে করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার পর বিশ্ব এখনো সে বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। দেড় বছরের অধিক সময় বিশ্ব আজ নানা জটিলতায় ভুগছে। সারা বিশ্বের ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সবকিছু অনেকটাই মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। আর এর প্রভাব পড়ছে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে। করোনা কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা বদলাতে বাধ্য করেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, করোনার হাওয়া ধনী-দরিদ্র সব দেশেই লেগেছে। সব মানুষকেই স্পর্শ করেছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর শ্রেণির ওপর দিয়ে বয়ে গেছে এবং যাচ্ছে স্ট্রিমরোলার।   

বিশ্বের সব স্থানে যখন এই মহামারি রুখতে চলছে লকডাউন থেকে কঠোর লকডাউন, তখন মানুষের ঘরে বন্দি থাকা ছাড়া তেমন কোনো উপায় নেই। পৃথিবীর অন্য দেশের মতো আমাদের দেশেও তাই এ সময়ে অনলাইনের বেশ জনপ্রিয়তা বেড়ে গেছে। এতে ক্রেতারা অনেকটাই স্বস্তির মধ্যে ছিল। অনেক প্রতিষ্ঠান বেশ জমিয়ে ব্যবসা করে মোটাতাজা হচ্ছিল। কিন্তু সমস্যাটা দেখা দিল তখনই যখন এর মধ্যে ষোলোআনা লোভ ঢুকে পড়ল। ফলে আঙুল ফুলে কলাগাছ থেকে বটগাছ হওয়ার স্বপ্নে অনেকেই বিভোর হয়ে উঠলেন। প্রতিযোগিতা শুরু হলো কত কম দামে অফার দেওয়া যায়। এ যেন এক অসুস্থ প্রতিযোগিতার শুরু। যখন প্রতিযোগিতা অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে ওঠে, তখন আর কোনো শৃঙ্খলা থাকে না, ভেঙে যায় সব প্রতিশ্রুতি। এ ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। 

একের পর এক অনলাইনে পণ্য সরবরাহ প্রতিষ্ঠানের নামে উঠে এলো মামলা। অভিযোগ সব ছাপিয়ে চলে গেল আদালতে। আর দিন দিন বাড়তে থাকে এর সংখ্যা। যারা হাজার হাজার কোটি টাকার হিসাব গরমিল করছে, তাদের জন্য তেমন অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তবে যারা এই দুর্দিনে কোনো ধরনের মাথাগুঁজে ব্যবসা চালিয়ে যেতে চাচ্ছে, তাদের জন্য নেমে এলো কষ্টের পাহাড়। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাটাও কঠিন হয়ে গেল। ফলে একের বোঝা অন্যের ঘাড়ে পড়বেই এবং এসব সমস্যা তাদেরও সামাল দিতে হবে। এমন অসংখ্য ছোটখাটো ব্যবসায়ীর আজ মাথায় হাত। বিপদের ওপর নতুন করে সুনামির আশঙ্কা।

সম্প্রতি এ ধরনের সংবাদ যখন মিডিয়ায় চাউর হচ্ছে, ঠিক তখনই পণ্যের নগদ টাকা পরিশোধের পর নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলেও পণ্য বুঝে না পেয়ে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জের বিরুদ্ধে মামলা করেন এক গ্রাহক। গত মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশান থানায় মামলাটি করা হয় মাসুকুর রহমান, আমানউল্লাহ, বীথি আক্তার, কাউসার আহমেদ, সোনিয়া মেহজাবিনসহ ই-অরেঞ্জের মালিকদের বিরুদ্ধে। এর আগে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জের মালিকানা পরিবর্তনসহ কর্তৃপক্ষের কোনো খোঁজ না পেয়ে বিক্ষোভ করেন ই-অরেঞ্জে অর্ডার করে পণ্য বুঝে না পাওয়া ভুক্তভোগীরা। বিক্ষুব্ধ ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজারের চেয়ে অনেক কমমূল্যে মোটরসাইকেলসহ অনেক পণ্যের বিপরীতে প্রায় ২০০ কোটি টাকার অর্ডার নেওয়ার পর ই-অরেঞ্জের মালিক ও কর্মকর্তারা লাপাত্তা। দাবি করা হচ্ছে, সারা দেশ থেকে অন্তত দুই লাখ ক্রেতা ই-অরেঞ্জের মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্য অর্ডার করেছেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগা দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান কীভাবে গজিয়ে উঠছে। সাধারণ মানুষের কষ্টের ২০০ কোটি টাকা কীভাবে উদ্ধার হবে বা তাদের পণ্যপ্রাপ্তির কী হবে! আর যদি এই ঠকদের বিচার না হয় তবে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের সুবিধা পাবে। কয়েক যুগ আগে আমরা দেখেছি ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে গ্রামের এক সাধারণ ব্যবসায়ী কাজল তার হাতের জাদুতে পুরো এলাকার উন্নয়নের ধারায় ভরে দিলেও হাজারো মানুষ নিঃস্ব হওয়ায় তাকে জেলে যেতে হয়। তবে যারা সর্বস্বান্ত হয়েছিলেন তারা কিন্তু কোনো সমাধান পাননি। 

দেশের কোটি মানুষকে এমনও হাজারো কাজল বিভিন্ন নামে মানুষকে ঠকিয়ে আসছে। কাজলের প্রেতাত্মারা আরো শক্তিশালী হয়ে আজ রাজধানীর বুকে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে দিনদুপুরে, মানুষের পকেটের টাকা দিয়ে মাস্তি করছে। এদের থামাতে না পারলে ব্যবসার যেমন উন্নতি ঘটবে না, তেমনি সাধারণ মানুষ তাদের সর্বস্ব হারাতেই থাকবে। তাই এই কুচক্রীমহলকে আইনকানুনের আওতায় এনে নিয়ন্ত্রণ করা সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

লেখক : সম্পাদক, প্রতিদিনের সংবাদ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
সম্পাদক,প্রতিদিনের সংবাদ
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close