শেখ নজরুল ইসলাম

  ০৭ জুলাই, ২০২১

মন্তব্য প্রতিবেদন

নাটাই কিন্তু আমাদের হাতে

যে করোনা সারা দুনিয়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বিশ্বের অনেক সচ্ছল দেশকে ধরাশায়ী করছে। সেই করোনাকে আমাদের দেশের আলেম মহলের একাংশ বিষয়টিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে। তাদের মতে, এখানে করোনার প্রভাব কোনোভাবেই ভয়াবহ হবে না। কারণ হিসেবে তাদের কাছে মনে হয়েছে, এখানে মানুষ অনেক ধর্মপ্রাণ। অনেকেই তাহাজ্জুদ নামাজ পড়েন। তাদের এসব ধারণার পেছনে নিশ্চয় বড় ধরনের যুক্তি আছে। সেই যুক্তির পেছনে তাদের শক্ত বিশ্বাস আছে। তবে এই করোনা কিন্তু ভাটিক্যানসিটি, গয়া, মক্কা-মদিনা কোথায়ও তাচ্ছিল্য করতে দেখা যায়নি। প্রতিরোধে কোনো ধরনের আপস করেনি। এটা সবার মনে রাখা জরুরি। 

আমাদের গ্রামগুলোর মানুষ আরো একধাপ এগিয়ে। তারা মনে করেন, তাদের করোনা হবে না। কারণ হিসেবে তারা মনে করেন, তারা পান-পান্তা খান। এ ছাড়া রয়েছে গরিবদের কেন করোনা ধরবে। এটি তাদের বিশ্বাস। তাদের এই বিশ্বাসের পেছনে শক্ত কোনো যুক্তি নেই। গ্রামের যে মসজিদে আমি জুমার নামাজ পড়ি, সেখানে প্রায় ৩০০ মুসল্লি অংশ নেন। অথচ একজনকেও মাস্ক পরিহিত অবস্থায় দেখা যায় না। যখন আমার মতো কাউকে মাস্ক পরা অবস্থায় দেখেন, তখন অবাক হয়ে তারা তাকিয়ে থাকেন। মাস্ক সরবরাহ করতে গেলে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়।

প্রথমবারের ধাক্কায় গ্রামের মানুষ উতরিয়ে গেলেও এবার কিন্তু গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে এবং পড়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, দেড় বছরের অধিক সময় ধরে চলা এই অতিমারিতে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই চিকিৎসাসেবা নেওয়ার মতো অবস্থা নেই অনেকের। আর যাদের আছে, তারা ইচ্ছা করলেই চিকিৎসাসেবা পাবেন না। ‘প্রতিদিনের সংবাদে’ বুধবার এমনই একটা সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, খুলনা মহানগরের খালিশপুরের শেখ ওয়াহিদ আলির কলেজ পড়ুয়া মেয়েকে মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে ১৩ দিন ধরে ঘুরছেন বিভিন্ন হাসপাতালে। একজন বাবা তার সন্তানের চিকিৎসার জন্য চেষ্টা করবেন এটাই সমাজের প্র্যাকটিস। তবে যেখানে হাজারো রোগী লাইনে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে সুযোগ মেলাটা খুবই প্রতিযোগিতামূলক। এ অবস্থা শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে একই চিত্র। হাসপাতালে সিটের জন্য হাহাকার আমরা দেখেছি ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে। সে তুলনায় আমাদের সামর্থ্য অনেকটাই কম। আমাদের হাতে গোনা সরকারি হাসপাতাল, কিছু উন্নত মানের বেসরকারি হাসপাতাল থাকলেও বাকিগুলোর মান অনেকটাই নাজুক। তাই বাস্তবতার নিরিখে জরুরি বিষয় হলো সচেতনার সঙ্গে চলা। সরকারি- বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন সাবধান বাণী দিয়ে যাচ্ছে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন মিডিয়া প্রতিদিন প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কে শোনে কার কথা। 

বাজার থেকে শুরু করে সবখানেই মানুষ আজ বড় বেশি দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিচ্ছে। নিয়ম না মানার একটা প্রতিযোগিতা যেন সর্বত্র। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ের অনেক সংস্থাই করোনা প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু কারো কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। আসলে যাদের এই অভিজ্ঞতা হচ্ছে, তারাই শুধু বলতে পারবেন, আক্রান্ত অবস্থায় মানুষ কতটা অসহায়। কেউ এ অবস্থার মধ্যে পড়ুক, তা কেউই চান না। তবে সেই প্রতাশায় আমাদের সবার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া উচিত। আমাদের মনে রাখতে হবে, চীনের উহান থেকে জেগে ওঠা এই অদৃশ্য মানবশত্রু আজ পৃথিবী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। কোথায় আবার সে বিশ্রাম নিয়ে আরো শক্তিশালী হয়ে আঘাত হানছে। 

পৃথিবীর সব মানুষ আজ একসঙ্গে লড়লে হয়তো ফল আরো ভালো হতো, কিন্তু তা তো হওয়ার নয়। কোথাও দেশ কোথাওবা অঞ্চলকে প্রাধান্য দিয়ে তা মোকাবিলার চেষ্টা চলছে যে যার মতো। আমরাও সারা দুনিয়া চষে বেড়াচ্ছি টিকার জন্য। মিলছে, তবে তা ধীরগতিতে। আমাদের দেশের জন্য যে বড় চালান প্রয়োজন, তা পেতে সময় লাগবে। দেশেও চলছে টিকা উৎপাদনের চেষ্টা। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে শিগগিরই তার দেখা মিলবে। তবে আজ আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নিজেদের সাবধান হওয়া। বড় বিপদের জন্য অপেক্ষা না করে আগে থেকে সাবধান ও সতর্কতাই হতে পারে ইতিবাচক ট্রিটমেন্ট।

লেখক : সম্পাদক, প্রতিদিনের সংবাদ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
শেখ নজরুল ইসলাম,সম্পাদক,প্রতিদিনের সংবাদ
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close