মরিস বুখাইলির সেই ময়নাতদন্ত

প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০২০, ১৬:৩৩ | আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২০, ১৬:৪৫

তানজিন তিপিয়া

যেকোনো ধর্মগ্রন্থ দেখলে মনে হয় যেন ভয়ঙ্কর কিছু। ধারণা কেবল এটিই কি আর থাকবে? ভালো কাজ করার নসিয়ত আর মন্দ কাজে বিপদ। কিন্তু এর বাদেও আরও কিছু মন আছে যা হয়তো আমরা যারা বিশ্বাসী আছি, তা জেনে চমকে যেতে পারি; কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মাওলানা-মুফতি অথবা ইসলামের ধর্মগুরু এসব নিয়ে তেমন একটা বক্তব্য রাখেন না। হতে পারে সময়ের অভাব অথবা গবেষণায় আলসেভাব। এমনি কিছু অবাক করার মতো একটি বিষয় হলো ফেরাউনের লাশ। হ্যাঁ লাশ। এমন একটি লাশ যা ৪০০০ বছর পুরোনো কিন্তু আজও পচেনি। পাওয়া যায় ১৮৮১ সালে। কায়রো শহরের মিসরীয় জাদুঘরে এর বর্তমান অবস্থান। মিসরের এক অহংকারী রাজা যিনি ভূমিষ্ঠ হওয়া থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কোন রোগে আক্রান্ত হননি। তিনি নিজেকে খোদা দাবি করতেন।

ফেরাউনের (রামসেস-২) মৃত্যু হয়ে ডুবে গিয়ে হয়েছিল। তো এমন কি হলো? যে কোন রাসায়নিক পদার্থ ছাড়াই আজও টিকে আছে? এমনটা কি করে বাস্তব হয়? প্রশ্নটি ফ্রান্সের চিকিৎসক মরিসের মাথায় খুব শক্ত করে বসে পড়ে। যিনি ১৯৭৩ সালে সৌদি রাজা ফয়সালের পারিবারিক চিকিৎসক হিসেবে নিয়োজিত হন। সেই সাথে মিসরের রাষ্ট্রপতি আনোয়ার সাদাতের পরিবারের সদস্যরাও তার চিকিৎসা নিতেন। তাছাড়া তার পিতামাতা ছিলেন মিশরবিদ্যার ফ্রান্স সমাজের সদস্য। মরিস বুখাইলি (১৯২০-১৯৯৮) পেশায় ছিলেন মেডিসিন বিভাগে গ্যাসট্রএন্ট্রেরলোজির বিশেষজ্ঞ (১৯৪৫-১৯৮২)। তিনি গবেষণা আরম্ভ করেন। বাইবেলে পান শুধু ডুবে যাওয়ার কথা কিন্তু এখনো টিকে আছে কি করে তা উল্লেখ নেই।

তিনি কারও কথায় না পাল্টে তার সিদ্ধান্তে অটল থেকে মুসলিম দেশগুলোতে ভ্রমণ করা আরম্ভ করলেন। পৌঁছেই তিনি সাক্ষাৎ করেন কিছু আলেমদের সাথে, যারা ময়নাতদন্তে বিশেষীকরণকারী। তিনি জানতে পারেন, ফেরাউনের লাশ সংরক্ষণের এই তথ্য ১৪০০ আগেই মুসলিমদের কুরআনে উল্লেখিত আছে। দশম অধ্যায় ইউনুসের ৯০-৯২ আয়াতে “আর বনী ইসরাইলকে আমি পার করে দিয়েছি নদী। তারপর তাদের পশ্চাদ্ধাবন করেছে ফেরাউন ও তার সেনাবাহিনী, দুরাচার ও বাড়াবাড়ির উদ্দেশে। এমনকি যখন তারা ডুবতে আরম্ভ করলো, তখন বললো, এবার বিশ্বাস করে নিচ্ছি যে, কোন মাবুদ নেই তাকে ছাড়া, যার ওপর ঈমান এনেছে বনী ইসরাইলরা। বস্তুত আমিও তারই অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত”। 

“এখন এ কথা বলছো! অথচ তুমি ইতোপূর্বে না-ফরমানি করেছিলে। এবং পথভ্রষ্টদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলে”। 

“তোমার লাশ অক্ষত রেখে দেবো পরবর্তী বান্দাদের জন্য। অতএব আজকের দিনে বাঁচিয়ে দিচ্ছি আমি তোমার দেহকে, যাতে তোমার পশ্চাৎবর্তীদের জন্য নিদর্শন হতে পারে। আর নিঃসন্দেহে বহু লোক আমার মহাশক্তির প্রতি লক্ষ্য করে না”।

ফ্রান্সে ফিরে এসে মরিস বুখাইলি আর চাকরি করেননি, ১০টি বছর তিনি কোরআন নিয়ে গবেষণা করেন। খুব সূক্ষ্মভাবে জানতে-বুঝতেই তিনি আরবি ভাষা রপ্ত করতে ব্যয় করেন পুরো সময়। এক প্রকার অনুসন্ধান আরম্ভ করেন কোরআনে কোন বৈজ্ঞানিক দ্বন্দ্ব খুজে পান কি না। 

“নিশ্চয় যারা কোরআন আসার পর তা অস্বীকার করে, তাদের মধ্যে চিন্তা ভাবনার অভাব রয়েছে। এটি অবশ্যই এক সম্মানিত গ্রন্থ”। 

“এতে মিথ্যার প্রভাব নেই, সামনের দিক থেকেও নেই এবং পেছনের দিক থেকেও নেই। এটা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসিত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ”। 

পড়ে মুগ্ধ হন এবং নিশ্চিত হন যে, এটি মানুষের লিখিত নয়, এটি স্রষ্টার প্রেরিত যা নবী করীম মুহাম্মদ (সা.)-কে দেওয়া হয়েছিল।

মরিস নিশ্চিত হন আল্লাহর সম্পর্কে এবং নিজেও ইসলাম গ্রহণ করেন। তবে অল্পসংখ্যক মানুষের তর্ক রয়েই গেছে, তিনি কুরআনের বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলো উদ্ভাবন করে বই লিখেছেন ঠিক কিন্তু ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম হননি। তার লিখিত বই “দ্যা বাইবেল দ্যা কুরআন, অ্যান্ড সাইন্স’ ১৯৭৬ সালে প্রকাশ পায়। ১৯৮৬ সালে “গোল্ডেন বুক” সম্মাননা অর্জন করে। ১৯৮৭ সালেই নতুন ১৩তম মুদ্রণে বইটির ১ লাখ ৪০ হাজার কপি বিক্রি হয়। 

ঘটনাটি ঘটলো তখন যখন ফ্রান্সের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রয়াত ফ্রান্সিসকো মিত্রা। আশির শতকের শেষার্ধে মিসরকে অনুরোধ করেন ফেরাউনের লাশ পাঠাতে। তারা ময়নাতদন্ত করবেন প্রত্নতাত্ত্বিক পরীক্ষার শর্তে। লাশকে স্বাগত করার জন্য রাষ্ট্রপতি নিজেই উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রিমণ্ডল এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে। সম্মান জানাতে সকলে ফেরাউনের লাশের সামনে মাথা নত হন। যেন লাশ নয় জীবিত ফেরাউনকে স্বাগত করা হচ্ছে। রাজকীয় অনুষ্ঠান শেষে নিয়ে যাওয়া হয় ফ্রান্স আর্কিওলজিকাল সেন্টারের একটি বিশেষভাবে তৈরিকৃত ওয়ার্ডে। যেখানে ফ্রান্সের সেরা সার্জন এবং এটোস্পিরা লেগে পড়েন মমির রহস্য উৎঘাটনে। সেরা দলটির প্রধান ছিলেন প্রভাষক মরিস বুখাইল। টেস্ট রিপোর্টে পাওয়া গেল শুধু লবণ। যেহেতু ডুবে মৃত্যু হয়েছে তাহলে এই লাশ আর্দ্রতায় পচে গলে যাওয়ার কথা, পানি থেকে বের করলো কে?

পাশেই এক সহকর্মী তাকে বলেন, থাক, এই নিয়ে এত হুড়োহুড়ির দরকার নেই। তিনি ভাবলেন, এই আবিষ্কারে যদি নতুন কিছু পাওয়া যায় তাহলে চিকিৎসা বিজ্ঞান আরও উন্নত হতে পারে। এত বছর আগে তো মানুষ মমি সংরক্ষণ করা জানতোই না। কিছু শত বছর আগেই শিখেছে মাত্র। এই লাশ আজও কি করে রয়ে গেল? 

তিনি তার একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, যখন আমি ৪০ বছর বয়সি ছিলাম প্যারিসে আমার মুসলিম রোগীর সাথে কথা বলতাম। তাদের ধর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতাম। একসময় আমি ভাবতাম এটা মানুষের লেখা। খ্রিস্টান পাদ্রীরা বলতো এটা বাইবেল থেকে চুরি করে মুহাম্মদ নিজে লিখেছে। আমি তখন ৫০ বছর বয়সী, সিদ্ধান্ত নিলাম আরবি শেখার। আরবি শেখার পর আমি নিশ্চিত হলাম স্রষ্টার মাধ্যমেই প্রেরিত এই গ্রন্থ। মানুষের দ্বারা এটি অসম্ভব। 

তার আরেকটি বই “ওয়াট ইজ দ্যা অরিজিন অফ ম্যান”-এ তিনি ডারউইনের মতবাদকেও খারিজ করেন। তিনি বলেন, চার্লস ডারউইন নিজেই বিভান্তিতে ছিলেন যে তিনি কি বলেছেন। তার মতবাদটি সম্পূর্ণ মনগড়া। 

প্রায় ১৫০০ বছর আগে কুরআন দ্বারা প্রদত্ত ব্যাখ্যাগুলির সাথে পুরোপুরি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় যুক্ত হওয়া এবং সন্তোষজনক সমাধান করার সময়কালে তুলনায় উত্থাপিত কিছু প্রশ্নের সাথে কুরআনের ব্যাখ্যা সমন্বিত ছিল। মানবজ্ঞানের মূল্যবান অবদান হিসেবে ডা. বুকাইলির গবেষণাগুলো স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করতে থাকে। খুব বিখ্যাত হয়ে ওঠেন তিনি। যুক্তরাজ্যের  অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তাকে এক্সটেনশন বক্তৃতা দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ করা হয়েছিল। তার কুরআনীয় চিন্তাধারার দ্বারা এবং কুরআনীয় চিন্তার প্রতি তার নজিরবিহীন বাস্তবসম্মত আলোচনাও দৃষ্টিভঙ্গী সকলকে একমত হতে বাধ্য করে।

বুকাইলির মতে, বিভ্রান্ত শ্রেণির লোক বিশ্বাস করতে পারেনি যে, কুরআনই একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যা পবিত্রতা এবং সমস্ত সংযোজন, পরিবর্তন এবং বিরক্তি থেকে মুক্ত ছিল। ফলস্বরূপ এটি এখনও সমস্ত যুগ, স্থান এবং প্রতিটি সংকটে মানবজাতিকে পথনির্দেশনা দেবার পবিত্রতা ধরে রেখেছে। হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এটি মহাবিশ্ব এবং জীবন সম্পর্কে, নিজের সম্পর্কে একাই ধর্মীয় ও মহাজাগতিক জ্ঞানের একমাত্র ধনঘর।

পিডিএসও/হেলাল