শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অর্থনীতিতে সাফল্য

প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২০, ১২:১৪

মোতাহার হোসেন

বৈশ্বিক মহামারি করোনায় দেশের সামগ্রিক কাঠামোতে আঘাত হেনেছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, দেশে দেশে করোনার এই অভিঘাত আঘাত হেনেছে মারাত্মকভাবে। বিশেষ করে মানুষের জীবন, জীবিকা ও কর্মে এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বের মানুষ হতাশা ও অনিশ্চয়তায় গভীর অন্ধকার দেখছিলেন সামনের দিনগুলো সম্পর্কে। এ পর্যায়ে করোনার কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক অবস্থা ও মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেছে জাতিসংঘ, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগী দাতা প্রতিষ্ঠানসমূহ। তাদের মধ্যে জাতিসংঘ, জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থা এফএও, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। তাদের আশঙ্কার মধ্যে রয়েছে করোনার কারণে বাংলাদেশের নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ ক্ষুধা ও দারিদ্র্যে নিপতিত হবে। করোনায় হাজার হাজার মানুষ মারা যাবে। শিশুরা পুষ্টিহীনতায় নিপতিত হবে। বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না ইত্যাদি।

তবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের পূর্বাভাস ও আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণ করেছে। যা সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্ব, সময়োচিত সিদ্ধান্ত, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং তার সরকারের নিরলস প্রচেষ্টায়। এসব কারণেই দেশের হতাশাগ্রস্ত মানুষ, অনিশ্চয়তা ও অন্ধকারে নিমজ্জিত মানুষ আশার আলো দেখতে শুরু করেছে। বিশেষ করে করোনা মোকাবিলা এবং মানুষের জীবিকা ও জীবনকে সচল রাখা এবং অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ ‘সোয়া লাখ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক প্রণোদনা প্যাকেজ’। এরই মধ্যে গত ১৫ সেপ্টেম্বর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) করোনার মধ্যেই সরকারের সোয়া লাখ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজসহ নানা কর্মসূচির কারণে চলতি অর্থবছরে জিডিপি ৬ দশমিক ৮ শতাংশ অর্জিত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। সরকার গৃহীত প্রণোদনা প্যাকেজ এবং এর সঠিক বাস্তবায়নের কারণে এর সুফল ইতোমধ্যে মানুষ পেতে শুরু করেছে। মূলত এখানেই নিহিত রয়েছে শেখ হাসিনার ক্যারিশমেটিক নেতৃত্ব। যার ফলে এই করোনাকালেও দেশে অর্থনীতিতে সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনার এই সংকটকালীন পরিস্থিতির ধাক্কা সামলাতে শুরু থেকে মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি দেশের অতিদরিদ্র খেটে খাওয়া মানুষের জীবিকার কথা বিবেচনায় নিয়ে নানা রকম সামাজিক কর্মসূচির আওতা সম্প্রসারণ ও উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। এসব কর্মসূচির মুখ্য উদ্দেশ্যই হচ্ছে প্রাণঘাতী করোনার মধ্যে মানুষের জীবন রক্ষা করা, মানুষের জীবিকার চাকা সচল রাখা এবং দেশে চলমান অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের গতিকে এগিয়ে নেওয়া। এমনি অবস্থায় সরকার গৃহীত এসব কর্মসূচির সফলতাও আসতে শুরু করেছে এবং হতাশার মধ্যে আশার আলো দেখছেন সব শ্রেণিপেশার মানুষ। স্থানীয়ভাবে অর্থনীতির প্রধানতম সব সূচকে ঊর্ধ্বমুখী অবস্থান বিরাজ করছে। বিশেষ করে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রফতানি আয় হয়েছে ৪ হাজার ৫৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার। তথা ৪০ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার। এ আয় লক্ষ্যমাত্রা অপেক্ষায় ৪ শতাংশ বেশি আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি। এ সময় শুধু রফতানিমুখি তৈরি পোশাক খাত থেকে আয় হয় ৩ হাজার ৪১০ কোটি ডলার। যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১১ দশমিক ৯৯ শতাংশ বেশি। বিগত অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হচ্ছে ৩৯ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার আর গত আগস্ট মাসে প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ১৭৩ কোটি ডলার, আর জুনে এসেছে ১৮৩ কোটি ডলার। মূলত রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি, রিজার্ভ আর রেমিট্যান্স বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হচ্ছে প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্সের ওপর ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা প্রদান। এ কারণে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ সরকারের বৈধ চ্যানেল তথা ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা প্রেরণ। রেমিট্যান্সের ওপর প্রণোদনা প্রদানে প্রবাসীরা বৈধ চ্যানেল ব্যবহার করায় রিজার্ভ, রেমিট্যান্স দুটোই ক্রমাগত সমান হারে বাড়ছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ, উন্নয়ন সহযোগী এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) কর্তৃক প্রকাশিত ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুকের সেপ্টেম্বর আপডেটে ইতিবাচক তথ্য ওঠে এসেছে। তাদের পূর্বাভাসে বলা হয়, ‘প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস মহামারির ধাক্কা সামলে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৬ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়তে পারে বলে প্রাক্কলন করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এডিবি।’ অর্থমন্ত্রী বরাবরই বলে আসছেন বছরান্তে জিডিপি ৮ শতাংশ অর্জিত হবে। তবে এই পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে মহামারিকেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি বলে মনে করছে এডিবি। অর্থাৎ বাংলাদেশে কিংবা বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের গন্তব্য দেশগুলোতে মহামারির সংকট দীর্ঘায়িত হলে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নাও হতে পারে। তারা বলছে, উৎপাদনের গতি বাড়ায় এবং বাংলাদেশি পণ্যের ক্রেতা দেশগুলোতে প্রবৃদ্ধি বাড়তে থাকায় বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। এধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ ২০২১ সালে মূল্যস্ফীতিকে ৫ দশমিক ৫ শতাংশে এবং চলতি হিসেবের ঘাটতিকে জিডিপির ১ দশমিক ১ শতাংশের মধ্যে বেঁধে রাখতে পারবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের এধারা টেকসই করতে সামষ্টিক অর্থনীতির বিচক্ষণ ব্যবস্থাপনা এবং সরকারের ঘোষিত প্রণোদনা কর্মসূচির বাস্তবায়নে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে এডিবি। এডিবির মতে, মহামারির ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্য খাতে বিপুল চাপের পরও সরকার যথাযথ প্রণোদনা ঘোষণা এবং সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়িয়ে দারিদ্র্য ও ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা নিয়ে অর্থনীতিকে ভালোই সামাল দিয়েছে।’

২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা বাংলাদেশ ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্যও ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরেছিল। আমাদের মনে রাখা উচিত, করোনা মহামারিতে রফতানি আয় কিছুটা হোঁচট খেয়েছে। তবে এপ্রিল মাসের পর থেকে প্রবাসীদের পাঠানো টাকার পরিমাণ আশাতীত হারে বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত রেমিট্যান্সেও ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। গত অর্থবছরে দেশে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ ১ হাজার ৮২০ কোটি ৩০ লাখ ডলার ছাড়িয়ে যায়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ ৩ হাজার ৩৬৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার আয় করেছে, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৭ শতাংশ কম। তবে মহামারির সংকটে রফতানি আয় যতটা ধাক্কা খাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল, শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি ততটা খারাপ হয়নি।

এডিবি প্রদত্ত বিবৃতিতে বলা হয়, এই সংকটে সম্পদের যথাযথ বণ্টন, ব্যবস্থাপনা, রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, নতুনভাবে কর্মসংস্থানের বিবিধ ক্ষেত্রে বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি তথা ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান, আউটসোর্সিং, ক্ষুদ্র, মাঝারি, কুঠির শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, হাঁস-মুরগি গবাদিপশু পালন, মৎস্য খামার গড়ে তুলে বেকার, তরুণ-যুবকদের কর্মসংস্থান করা গেলে বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতির চাকা আরো বেগবান ও গতিশীল হবে। প্রত্যাশা থাকবে করোনাকালে মানুষের জীবন, জীবিকা স্বাভাবিক রাখা এবং কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির চাকা আরো বেগবান করতে প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবেন। তাহলেই সম্ভব ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের মতো বৈশ্বিক মহামারি করোনাযুদ্ধেও জয়ী হবে দেশ। (পিআইডি ফিচার)

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল