নিজস্ব প্রতিবেদক

  ০৭ অক্টোবর, ২০২২

বিদেশ পাঠানোর নামে প্রতারণা : পাঁচ শতাধিক ব্যক্তির টাকা আত্মসাৎ 

প্রতীকী ছবি

ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে দুই বছরে পাঁচ শতাধিক মানুষের কাছ থেকে সাড়ে তিন কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে একটি সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারী চক্র। বিদেশ যেতে আগ্রহী দরিদ্র মানুষকে টার্গেট করত চক্রটি। তবে কাউকেই বিদেশে পাঠায়নি তারা।

এমন শতাধিক অভিযোগের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার (৬ অক্টোবর) রাজধানীর শান্তিনগর এলাকা থেকে মানব পাচারকারী চক্রের হোতাসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৫২১টি পাসপোর্ট ও সৌদি, ইরাক, কুয়েত, দুবাই, রোমানিয়া, কানাডা, কম্বোডিয়ায় চাকরির ভুয়া নিয়োগপত্রসহ বিভিন্ন ধরনের ভুয়া নথি জব্দ করা হয়েছে।

র‌্যাব জানায়, জব্দ পাসপোর্টের ব্যক্তিদের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যেতে আগ্রহীদের কাছ থেকে চক্রের সদস্যরা দুই থেকে তিন লাখ টাকা করে নিয়েছে। ইউরোপে যেতে আগ্রহীদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ছয় থেকে সাত লাখ টাকা। এভাবে চক্রটি পাঁচ শতাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে অন্তত সাড়ে তিন কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে।

চক্রটি মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে যেতে আগ্রহী ব্যক্তিদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পর বিদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির ভুয়া নিয়োগপত্র দিয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তিকে বিদেশে পাঠায়নি বলে জানায় র‌্যাব।

গ্রেপ্তাররা হলেন চক্রের মূলহোতা মাহবুব উল হাসান (৫০) ও তার সহযোগী মাহমুদ করিম (৩৬)।

শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, দুই বছরে বিদেশে পাঠানোর নাম করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নিলেও কাউকেই বিদেশে পাঠানো হয়নি। এমনকি বিদেশে পাঠানোর কোনো প্রক্রিয়াই শুরু করেনি চক্রটি। বিদেশে যেতে বিলম্ব দেখে ভুক্তভোগীরা অর্থ ফেরত চাইলে চক্রের প্রধান মাহবুব উল আলম টাকা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

তারপরও দালালদের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকার বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় করছিলেন মাহবুব। এসব অর্থ নিয়ে চক্রের প্রধান মাহবুব উল আলমের তার সহযোগীকে নিয়ে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল ।

র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক বলেন, মাহবুব ২২ বছর ধরে সংঘবদ্ধ মানব পাচার ও প্রতারক চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত। করোনা মহামারির আগ পর্যন্ত তারা উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মানব পাচার করত।

ভুক্তভোগীদের তারা ভ্রমণ ভিসায় বিদেশ পাঠাত। বিদেশে গিয়ে বুঝতে পারতেন, প্রতারণার শিকার হয়েছেন তারা। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার পর ভুক্তভোগীদের জিম্মি করত সেখানে থাকা চক্রের অন্য সদস্যরা। তাদের কাজ দেওয়ার নাম করে অজ্ঞাত স্থানে বন্দি করে রাখা হতো। দেওয়া হতো না কোনো খাবার। সেখানে তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন করা হতো। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ভুক্তভোগীরা সেখান থেকে পালিয়ে নিজেদের চেষ্টায় দেশে ফিরে আসতেন। তবে দুই বছরে চক্রটি পাঁচ শতাধিক মানুষের কাছ থেকে টাকা নিলেও কাউকেই বিদেশে পাঠায়নি।

গ্রেপ্তার দুজন সম্পর্কে র‌্যাব জানায়, চক্রের প্রধান মাহবুব উল হাসান এসএসসি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। তিনি ১৯৯৩ সালে কাজের সন্ধানে মালয়েশিয়ায় যান। পাঁচ বছর পর দেশে ফিরে কৃষিকাজ শুরু করেন। স্বল্প পরিশ্রমে অধিক অর্থ উপার্জনের আশায় ২০০০ সাল থেকে শান্তিনগরের একটি এজেন্সির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে লোক পাঠানো শুরু করেন। ২০১৪ সালে শান্তিনগরের আরেকটি এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে মানব পাচার করছিলেন। ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মাহবুব আলমের মাধ্যমে যারা বিদেশে গিয়েছেন, তারা কেউই কাজ পাননি। পরে বাধ্য হয়েই দেশে ফিরেছেন।

মাহবুবের সহযোগী মাহমুদ করিম এসএসসি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। তিনি ২০১২ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় চুরির দায়ে গ্রেপ্তার হয়ে সাত মাস কারাগারে ছিলেন। জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি ২০১৩ সালে ঢাকায় আসেন। এক আত্মীয়ের মাধ্যমে মাহবুবের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে তিনি মাহবুবের প্রধান সহযোগী হয়ে ওঠেন।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
বিদেশ পাঠানো,প্রতারণা,টাকা আত্মসাৎ
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close