আরমান ভূঁইয়া

  ০১ অক্টোবর, ২০২২

কিশোর গ্যাং আতঙ্কে রাজধানীর মিরপুর

ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীতে ক্রমেই বাড়ছে কিশোর অপরাধ। কিশোর গ্যাং উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে নগরবাসী। গ্যাংয়ের অধিকাংশ সদস্যই ছিন্নমূল ও বস্তিবাসী। যাদের বেশির ভাগের বয়স ১৮ থেকে ২২ বছর। মাদক সেবন ও চুরি-ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িত তারা। মাদক বিক্রি, জমি দখল, চুরি-ছিনতাই এমনকি হত্যা মামলাও রয়েছে অনেক কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি মিরপুরে বেড়েছে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত। গ্যাং সদস্যদের দাপটে মিরপুরবাসীর অনেকের ঘুম হারাম হয়ে যাচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় হামলার শিকার হয়েছেন অনেক বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী।

রাজনৈতিক পেশিশক্তির ঢাল ও মাদক কারবারের স্বার্থে কিশোর অপরাধ বাড়ছে বলে মনে করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সংগত কারণে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন এলাকার প্রভাবশালী কিছু রাজনৈতিক নেতা ও মাদক কারবারি। তবে কিশোর অপরাধ রুখতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তালিকাভুক্ত করা হয়েছে থানাভিত্তিক কিশোর গ্যাং লিডার, সদস্য ও পৃষ্ঠপোষকদের।

পুলিশের তথ্য বলছে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের ৭টি থানায় অন্তত ২৫টির বেশি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এসব গ্যাংয়ে পাঁচ শতাধিক সদস্য রয়েছে। যার বেশিরভাগের বয়স ১৮ থেকে ২২ বছর। পৃষ্ঠপোষকতায় রয়েছেন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা।

মিরপুরের ৭টি থানার মধ্যে পল্লবী থানা এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত সবচেয়ে বেশি। পল্লবী থানাধীন কালশী বালুর মাঠ বস্তি, মুরাপাড়া ক্যাম্প এলাকায় রয়েছে শফিক-শারাফাত গ্যাংয়ের মাত্রাতিরিক্ত উৎপাত। তাদের নেতৃত্বে আমজাদ, ভাগনে বাবু, সজিব, রিয়াদ টান আকাশ, অয়ন, আরজু ও দাঁতভাঙা মাসুমসহ অন্তত ২০-২৫ জন সক্রিয় সদস্য রয়েছে। মাদক, অস্ত্র, ছিনতাই, মারামারি এমনকি হত্যা মামলাও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। নারীদের দিয়ে মাদক বিক্রি করা এ গ্যাংয়ের একটি কৌশল। এ গ্যাংয়ের মাদক কারবারিতে বাধা দেওয়ায় হামলার শিকারও হয়েছেন অনেকে। অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে শফিক-শারাফাত সাভার এলাকা থেকে এ গ্যাং নিয়ন্ত্রণ ও মাদক কারবারি পরিচালনা করছে। স্থানীয় এক ব্যবসায়ী খলিল বলেন, ‘এই গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করায় শফিক-শারাফাতের লোকজন আমাকে ধরে নিয়ে মারধর করে। পরে তারা পুলিশের যোগসাজশে আমাকে মাদক মামলায় জড়িয়ে দেয়।’

আরেক ভুক্তভোগী বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘কিশোররা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। তাদের মাদক কারবারে বাধা দেওয়ায় আমাকে বালুর মাঠ বস্তিতে ধরে নিয়ে হাত-পা ভেঙে দেয় শফিক বাহিনী। ওই সময় পানি খেতে চাইলে তারা আমার মুখের ওপর প্রস্রাব করে দেয়।’ ১২ নম্বর সেকশনের বি-ব্লক, বিয়ে বাড়ি কমিউনিটি সেন্টার ও আশপাশ এলাকায় সক্রিয় রকি গ্রুপ। রকি গ্রুপে ২০ জনের অধিক সদস্য রয়েছে। এর মধ্যে মাসুম ওরফে কালা মাসুম, আকাশ, ইউসুফ ওরফে হাড্ডি ইউসুফ, রাজু, শামিম ওরফে কালা শামিম, হৃদয় এবং রিপন ওরফে দাঁত ভাঙা রিপন পুলিশের তালিকাভুক্ত। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে মাদক ও মারামারির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এ গ্রুপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় অনেকে হামলার শিকার হয়েছেন।

বাউনিয়া বাঁধ, ই-ব্লকে সোহেল গ্রুপ নামে আরেকটি সক্রিয় কিশোর গ্যাং রয়েছে। গ্যাং লিডার সোহেলের নেতৃত্বে শরীফ ওরফে ধাসা শরীফ, রিয়াজ, জুয়েল ও সজিবসহ ১২-১৫ জন সদস্য রয়েছে। তারা পুলিশের তালিকাভুক্ত। এই গ্রুপের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ওঠে আসে ৫নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নাঈমের নাম। তবে নাঈম এসব বিষয় অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘এটি একটি মিথ্যা অভিযোগ। আমি কোনো গ্যাং বা কোনো অপরাধীকে প্রশ্রয় দেই না। বরং সমাজে অপরাধ প্রবণতা রোধে কাজ করি।’

পল্লবীর তালতলা মোড়, নাভানা আবাসিক ভবন, ও সবুজ বাংলা আবাসিক গেট এলাকায় আশিক গ্রুপের উৎপাতে অতিষ্ঠ বাসিন্দারা। আশিকের নেতৃত্বে এ গ্রুপে শামীম, রায়হান, আল-আমিন, রাব্বি, রনি, মহিন ও সুমনসহ ১২-১৩ জন সদস্য সক্রিয় রয়েছে। আশিক গ্রুপকে লিড দিচ্ছে পল্লবী থানা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিলন ঢালী। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আমি কোনো কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ বা প্রশ্রয় দেই না। বরং কিশোর গ্যাং উৎপাত রোধে কাজ করছি। যুবলীগের কিছু নেতাকর্মীরা এসব কিশোর গ্যাংদের মদদ দিচ্ছে।’

১১ নম্বর সেকশনের ডি-ব্লক এবং রামগড় এলাকায় জল্লা মিলন গ্রুপ। বিহারি মিলনের নেতৃত্বে সুমন, ফয়সাল, ডি-ব্লকের পাভেল, সানজু, হায়দার ও রাজুসহ এ গ্রুপে অন্তত ১২ রয়েছে। এদের বিরুদ্ধে এলাকায় মাদক কারবার, ছিনতাই, ফিটিং এবং আধিপত্য বিস্তারের একাধিক অভিযোগ রয়েছে।

বি-ব্লক, ঈদগাহ মাঠ এলাকায় রয়েছে- পিন্টু-কাল্লু গ্রুপ। অন্তত ২০ জন সক্রিয় সদস্য রয়েছে এ গ্রুপে। বাউনিয়া বাঁধ বি-ব্লকের কাল্লু, ‘ডি’ ব্লকের উজ্জ্বল, সজিব, সাজ্জাদ, শুক্কুর, ‘ই’ ব্লকের জন্টু এবং ‘এ’ ব্লকের হাসান অন্যতম। অভিযোগ রয়েছে এ গ্যাংয়ে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ৫নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান এবং ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সদস্য সুলতান। এ বিষয়ে খলিলুর রহমানের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

কিশোর গ্যাংকে মদদ দেওয়া বিষয়টি অস্বীকার করে যুবলীগ নেতা সুলতান বলেন, ‘আমরা রাজনীতি করি। এর মানে এই নয় যে, কিশোর গ্যাংদের প্রশ্রয় দিব। হয়তো প্রতিপক্ষের বিরোধের জের ধরে আমাকে জড়ানো হচ্ছে।’

মুসা হারুন গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছে পল্লবী এলাকায় স্থানীয় সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত দুই ভাই মুসা ও স্বপন। স্থানীয়দের কাছে ভাই গ্রুপ নামেও পরিচিত। তাদের গ্যাংয়ে হারুন, আসিফ, হোসেন, সোহরাব ও আরিফসহ অন্তত ২০ সক্রিয় সদস্য রয়েছে। পল্লবী থানায় তাদের সবার বিরুদ্ধে মাদক কারবার ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ রয়েছে।

রানা মুন্সি নামে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘মিরপুর এলাকায় বেশ কয়েকটি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। গ্যাংয়ের বেশির ভাগ সদস্য কিশোর হলেও তাদের পরিচালনা করেন কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতা। বিশেষ করে মাদক কারবারি, ছিনতাই ও রাজনৈতিক অপকর্মে তাদের ব্যবহার করা হয়। এসব গ্যাং সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে হামলা-দামলা এমনকি মামলারও শিকার হতে হয়।’

পল্লবীর ই-ব্লকে রয়েছে রোমান্টিক গ্রুপ। কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দা ভুলু এ গ্রুপের লিডার। মনু, জসিম ওরফে ক্যাডার জসিম, পল্টু, দেলোয়ার ও গুড্ডু এ প্রুগের অন্যতম সদস্য। তাদের বিরুদ্ধে মাদক কারবার ও মারামারির অভিযোগ রয়েছে। রোমান্টিক গ্রুপের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে বিহারি ক্যাম্পের চেয়ারম্যান জালাল উদ্দিন ভন্টুর নাম ওঠে আসে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি ক্যাম্পের চেয়ারম্যান। আমার কাছে সবাই আসে, তাই বলে কী আমি সবাইকে মদদ দেই! আমাদের এখানে কোনো গ্রুপ নেই। এখানে কোনো কিশোর গ্যাং নেই।’

কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ ও মদদদাতাদের বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) জসীম উদ্দীন মোল্লা বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আমরা সব সময়ই কাজ করছি। বিশেষ করে কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি থানা পুলিশ মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
কিশোর গ্যাং,মিরপুর
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close