বদরুল আলম মজুমদার

  ২৪ নভেম্বর, ২০২০

তুরাগ দখল করে ফের সেই আড়ত

টঙ্গী সেতুর উত্তরা অংশের পশ্চিম পাশঘেঁষে প্রায় ১০ বিঘা জমির ওপর গড়ে উঠেছে বড় একটি মাছের আড়ত। তুরাগ নদের জায়গা ভরাট করে গড়ে তোলা মাছের আড়তটি আগে রাস্তা থেকে ১৫-২০ হাতের মধ্যে সীমিত থাকলেও গত কয়েক বছরে দখল বেড়েছে প্রায় ৫০ গুণ। পুরো জায়গাটিই নেওয়া হয়েছে নদীর জায়গা ভরাট করে।

স্থানীয় অনেক বাসিন্দা বলছেন, গত দশ বছরে এই মাছের আড়তটিতে কয়েক দফা উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও আবার নদীর জায়গা দখল করে বানানো হয় আড়ত। সর্বশেষ গত মার্চ-এপ্রিলে টঙ্গী সেতুর আশপাশে উচ্ছেদ করা হয় অবৈধ স্থাপনা। কিন্তু উচ্ছেদের দু-এক দিনের পর থেকেই সেই আড়ত গড়ে তোলা হতে থাকে আগের চেয়েও বেশি জায়গা দখল করে।

অভিযোগ আছে, রাজনৈতিক দলের স্থানীয় কয়েকজন নেতা এবং পৈতৃক সূত্রে জমির মালিক দাবি করা কিছু লোক একজন কাউন্সিলরকে সামনে রেখে মাছের আড়তটি পরিচালনা করছেন। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তাও এই দুষ্টচক্রের সঙ্গে জড়িত। ওই চক্রের লোকজন আড়ত থেকে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এ বিষয়ে স্থানীয় সাবেক এক জনপ্রতিনিধি প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘মনে করেছিলাম এবার হয়তো তুরাগের জায়গা উদ্ধার হবে, কিন্তু তা তো হয়নি বরং উল্টো তা ভরাট করে আরো সরু করে দিয়েছে দখলদাররা।’

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, টঙ্গী সেতু থেকে পশ্চিম দিকে আধা কিলোমিটার পর্যন্ত নদীর প্রশস্ততা কমতে কমতে ৩০-৪০ গজে এসে ঠেকেছে। আধা কিলোমিটার উজানে এবং ইজতেমা ময়দানঘেঁষে এর প্রশস্ততা ১০০ গজের বেশি হবে। আবার সেতুর ভাটিতে এর প্রশস্ততা ক্ষেত্রবিশেষ আরো বেশি। সেতুর ভাটির দিকে তুরাগের সীমনা নির্ধারণ করে টঙ্গী ও দক্ষিণখান অংশে ওয়ার্কওয়ে নির্মাণ করায় এ দখল অনেকাংশে ঠেকানো সম্ভব হলেও সীমানায় থাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) জায়গা দখল হচ্ছে দেদার। ওই অংশে পাউবোর জায়গায় পাকা ঘরবাড়ি বানিয়ে যে যার মতো মালিকানার ভুযা কাগজ তৈরি করে নিয়েছে। আর ওইসব ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে করা মামলায় কোনো মতে উচ্ছেদ ঠেকিয়ে রাখছে দখলবাজরা।

নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে। এরই মধ্যে নদীগুলোর ব্যাপারে সরকার টাস্কফোর্স গঠন করেছে। নদী দখলের খবর পেলেই আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেব। সরকার ঢাকার চারপাশের নদীর হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ফেরানোর জন্য কাজ করছে।’

এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক আরিফ উদ্দিন প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘অনেকে মামলার কাগজপত্র দেখিয়ে জায়গা ছাড়তে চায় না। এসব মামলার যে কোনো ভিত্তি নেই সেটা মামলাকারী ব্যক্তিরাও জানে। তুরাগের পুরোনো নকশা দেখলেই বোঝা যায় কার কোথায় অবস্থান। অনেকে বাপ-দাদার জমি দাবি করে দখল বজায় রাখার চেষ্টা করছে। এ ছাড়া ভুয়া কাগজপত্রে কিছু বেচাবিক্রির খবরও আমরা জানি। যেহেতু মামলা হয়েছে, আমরাও নদীর জায়গা উদ্ধার করতে কোর্টে যাব। ভুয়া মামলাগুলো দু-একটি শুনানি হলেই খারিজ হয়ে যাবে।’ বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক বলেন, দখলে-দূষণে মুমুর্ষু ঢাকার চারপাশের নদীগুলো উদ্ধার করতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধায়নে বিআইডব্লিউটিএর নেতৃত্বে গত বছর ২৯ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছিল নদীমুক্তির যুদ্ধ। আমরা এখনো মাঝ দরিয়ায়। যুদ্ধ এখনো চলছে। দরিয়া পাড়ি দিয়ে তীরে পৌঁছাতেই হবে আমাদের। এর কোনো বিকল্প নেই। পিছু হটার সুযোগ নেই।

স্থানীয় অনেক বাসিন্দা জানান, বিআইডব্লিউটিএর নজরদারির অভাবে এবার দখল চলছে ইকোনমিক জোনের (অর্থনৈতিক অঞ্চল) নামে। গত ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে তুরাগ নদের পশ্চিম পারে চর ওয়াশপুর ও শ্যামলাপুর মৌজায় এর জায়গায় গড়ে তোলা বিদ্যুৎ প্লান্ট এবং তার আশপাশের অবৈধ অংশ উচ্ছেদ করেছিল বিআইডব্লিউটিএ। তবে ছয় মাস না যেতেই একই জায়গা ইকোনমিক জোনের নামে দখল করে নতুন স্থাপনা তৈরি করা হচ্ছে বিআইডব্লিউটিএর একজন ঠিকাদারের নেতৃত্বে। বিআইডব্লিউটিএ বলছে, একজন ঠিকাদারের সহায়তায় নতুনভাবে জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করছেন এক প্রভাবশালী ব্যক্তি। বিআইডব্লিউটিএর ছাড়পত্র না থাকলে আবার অভিযান চালানো হবে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, তুরাগের বড় একটি অংশের পাশাপাশি বেদখল হয়ে গেছে এলাকার বেউরার চর ও ওয়াশপুর খাল দুটিও। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নামে আশপাশের জমিও দখল করা হচ্ছে। এ বিষয়ে খোঁজ নিতে গেলে বাধা দেন সংশ্লিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োজিত আনসার সদস্যরা। তবে বিআইডব্লিউটিএ বলছে, তুরাগতীরে কোনো ইকোনমিক জোনের ছাড়পত্র তারা দেয়নি।

পরিবেশবিদরা বলছেন, নদীর জায়গা দখল করে গড়া অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পর তা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য গঠন করতে হবে আলাদা কমিটি। কমিটিকে পুরো পরিস্থিতি দেখভাল করতে হবে। মাত্র ছয় মাস আগেই উত্তরার ধৌড় এলাকায় তুরাগ নদের অংশটিতে অভিযান চালিয়ে দখলমুক্ত করেছিল বিআইডব্লিউটিএ। কিছুদিনের মধ্যেই বিশাল ওই এলাকা জুড়ে অবৈধভাবে আবার গড়ে উঠে কাঁচাবাজার।

পিডিএসও/হেলাল

তুরাগ,আড়ত,উচ্ছেদ অভিযান
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়