আশরাফুল ইসলাম

  ০৭ অক্টোবর, ২০২২

ই-বুক অথবা অডিও বুক

পাঠাভ্যাসে পরিবর্তন

অলংকরণ : বদরুল হায়দার

বাস ছাড়তে এখনো আধঘণ্টা বাকি। লোকাল বাস, সিট থেকে উঠে বাইরে গেলে সিট দখল হয়ে যাবে। অগত্যা বাসে বসে বসে বিরক্ত হচ্ছি। ফোনে ইন্টারনেট কেনা নেই যে ফেসবুক চালাব। হঠাৎ মনে হলো, ফোনে তো অডিও বুক নামানো আছে। সত্যজিত রায়ের ফেলুদা সিরিজের কয়েকটা গল্প। কানে ইয়ারফোন গুঁজে অডিও ছেড়ে দিলাম। রহস্য-রোমাঞ্চে ডুবে থাকতে থাকতে কখন বাস ছাড়ল, কখন গন্তব্যে পৌঁছলাম, সেটা টের পাইনি। মনে হচ্ছিল, গল্পের চরিত্রদের সামনে দেখতে পাচ্ছি। বর্ণনার ভঙ্গি এবং ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক এত চমৎকার, শুনে আরাম পাওয়া যাবে নিশ্চয়ই।

এ রকম একটা অডিও বুক চ্যানেলের নাম ‘মিরচি বাংলা’। সানডে সাসপেন্স নামে যে অনুষ্ঠানটা প্রচারিত হয়, সেটা অনবদ্য। যেসব গল্প আমরা শৈশব-কৈশোরে পড়ে ভরপুর রহস্যে ডুবে থেকেছি, বর্তমানে তা অডিও আকারে শুনে আরো রোমাঞ্চিত হচ্ছি।

বর্তমানে কাগজের বই সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণ করাটা অনেকের পক্ষে অসুবিধার। সেখানে ফোনেই যদি থাকে প্রিয় লেখক, প্রিয় বইগুলোর অডিও ভার্সন, তাহলে সময়টা চমৎকার কাটে।

খুব সাম্প্রতিক সানডে সাসপেন্সের নতুন যে অ্যাপিসোড ছেড়েছে ইউটিউবে, তার নাম ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’। লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। ইউটিউবে এটা দেখা হয়েছে আট লাখের কাছাকাছি। অর্থাৎ তিন ঘণ্টা এগারো মিনিটের একটা অডিও তিন-চার দিনেই আট-নয় লাখ মানুষ শুনে ফেলেছে। একটা নতুন বই প্রকাশিত হলে এক সপ্তাহে এক লাখ কপি বই বিক্রি হওয়ার রেকর্ড বর্তমানে নেই। অথচ কত সহজে সিংহভাগ মানুষ গল্পগুলো অডিও ফরম্যাটে শুনছে। এখানে কোনো দেশ, ভূখণ্ডের বেড়াজাল নেই। যেকোনো দেশে প্রকাশিত বইয়ের অডিও ভার্সন মানুষ যেকোনো দেশে বসে শুনতে পারছে।


ই-বুক ভালো পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করছে। নতুন লেখক, পুরাতন লেখক কারোরই কোনো প্রকাশনা খরচ নেই, শুধু পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করলেই চলে


এবার আসি ই-বুকের কথা। যেহেতু আমি শিক্ষকতা পেশায় আছি, সচরাচর দেখা যায়—দুটি পিরিয়ড ক্লাস নেওয়ার পর একটা পিরিয়ড গ্যাপ থাকে। তা প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মতো। টিচার্স রুমে বসে অলস সময় কাটে, তখনই ফোনের ই-বুক অ্যাপ খুলে বসি। অতি অল্পমূল্যে ডাউনলোড করা পছন্দের বইগুলো ফোনের স্ক্রিনেই পড়া যায়। ইচ্ছামতো লেখার ফন্ট ছোট-বড় করা যায়, যাতে চোখের অসুবিধা না হয়। পৃষ্ঠা উল্টে পড়ার মতো ব্যাপার।

বাংলাদেশে ই-বুক প্ল্যাটফর্ম দিনে দিনে জনপ্রিয় হচ্ছে। আমি ‘বইটই’ নামে একটা অ্যাপ থেকে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’ বইটা নামিয়ে ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে পড়ে ফেলেছি। কাগজের বই পড়ার মতোই স্বাদ পেয়েছি। ‘বইঘর’ নামক একটা ই-বুক প্ল্যাটফর্ম থেকে আমার পছন্দের বইগুলো কিনেছি। বর্তমানে আমার অবসর কাটে ফোনের স্ক্রিনে বই পড়ে। বর্তমানে কাগজ এবং অন্য উপকরণের মূল্য যে হারে বাড়ছে, কাগজে ছাপা বই অনেকের পক্ষেই কেনা মুশকিল হবে, সে ক্ষেত্রে স্বল্প খরচে পছন্দের বই পাওয়ার সেরা মাধ্যম হতে পারে ই-বুক।

লেখকদের জন্যও সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে ই-বুক। কোনো নতুন লেখক বই প্রকাশ করতে আগ্রহী হলে প্রকাশকদের কাছ থেকে প্রতারণার শিকার হয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, নতুন লেখকের বই প্রকাশ করা ঝুঁকিপূর্ণ, বিক্রি হবে কী হবে না—প্রকাশক এই ঝুঁকি নিতে চান না। বই প্রকাশনার যাবতীয় খরচ বহন করতে হয় লেখককে। বিক্রির দায়িত্বও পড়ে যায় লেখকের ওপর। মেলা শেষে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, প্রকাশক বেচাবিক্রির সঠিক হিসাব দিচ্ছেন না। লেখক পড়ে যান বিপদে। তিনি অনেক স্বপ্ন নিয়ে একটা বই প্রকাশ করেছেন, বই বিক্রি হবে, লভ্যাংশ দিয়ে তিনি ধার করে আনা টাকা শোধ করবেন। কিন্তু মেলা শেষে থাকে শুধু একরাশ হতাশা।

ই-বুক এ ক্ষেত্রে ভালো পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করছে। নতুন লেখক, পুরাতন লেখক কারোরই কোনো প্রকাশনা খরচ নেই, শুধু পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করলেই চলে। বই কত কপি বিক্রি হলো, সেটা প্যানেল থেকে লেখক দেখতে পারবেন। স্বচ্ছতার সঙ্গে রয়্যালটিও পাবেন। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আমার পরিচিত কয়েকজন লেখক ই-বুক প্ল্যাটফর্ম থেকে লাখের ঊর্ধে্ব রয়্যালটি পেয়েছেন।

লেখা শেষ করি। মলাটবদ্ধ কাগজের বই অবশ্যই অন্যরকম অনুভূতি সৃষ্টি করে। নতুন বইয়ের গন্ধ ব্যাপারটা নান্দনিক। তবে স্বল্প খরচে অধিক সুবিধা পেতে চাইলে ই-বুক কিংবা অডিও বুকের বিকল্প নেই বললেই চলে।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
অডিও বুক,ই-বুক,পাঠাভ্যাস
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close