বন্যার আরও অবনতি

প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০১৭, ১০:৪৮

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, আড়িয়াল খাঁ, কুমার ও মধুমতির পানি প্রবাহিত হচ্ছে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে। এসব নদী অববাহিকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে গেছে। জামালপুরের ইসলামপুর, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা, পলাশবাড়ি, গোবিন্দগঞ্জ ও সদর উপজেলার ৪২টি ইউনিয়ন এবং গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার ১৮টি গ্রামের মাঠের ১০২০ হেক্টর জমির আমন ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। ফরিদপুরের নিম্নাঞ্চলে বন্যার বিস্তার ঘটছে। সিরাজগঞ্জের পাঁচটি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এনায়েতপুর, বেলকুচি, সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকার চার হাজার ৮৩৭ হেক্টর আবাদি জমির ফসল বিনষ্ট হয়েছে। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় বন্যার পানিতে ডুবে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এদিকে, বানভাসিরা ছুটছেন ত্রাণের জন্য। কিন্তু অনেক দুর্গত এলাকায় ত্রাণ তৎপরতা শুরু হয়নি। কিছু কিছু এলাকায় অপ্রতুল ত্রাণ তৎপরতার খবর পাওয়া গেছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো রিপোর্ট—

ইসলামপুর (জামালপুর) : যমুনার ফুঁসে ওঠা পানি প্রবেশ করছে ইসলামপুরের বিস্তীর্ণ জনপদে। বন্যাকবলিত হয়েছে তিন লক্ষাধিক মানুষ। ইসলামপুর স্টেশনের আউট সিগন্যালে রেললাইনে পানি ওঠায় জামালপুর থেকে দেওয়ানগঞ্জ রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ইসলামপুরে যমুনার পানি বুধবার সকালে বিপৎসীমার ১৩৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বন্যাদুর্গতরা উঁচু রাস্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ত্রাণের জন্য চলছে

বন্যাকবলিত এলাকা হাহাকার। উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মেহেদী হাসান জানান, ইসলামপুর সদর ইউনিয়ন, নোয়ারপাড়া, সাপধরী, চিনাডুলী, বেলগাছা, কুলকান্দি ও পাথর্শী ইউনিয়ন বন্যার পানিতে ভাসছে। পলবান্ধা, গোয়ারলেরচর, চরগোয়ালিনীতে আংশিক বন্যার পানি উঠেছে। এক লাখ ২০ হাজার ১২৬ জন মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যার্তদের মধ্যে মঙ্গলবার পর্যন্ত ২৭ মেট্রিক টন চাল ও এক হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

এ ছাড়াও দেওয়ানগঞ্জ চিকাজানী ইউনিয়নে সাড়ে চার হাজার মানুষ পানিবন্দি। গত মঙ্গলবার সেখানে ২০০ জনকে ত্রাণ হিসেবে ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে। যমুনার ভাঙনে ১২টি বাড়ি যমুনা গর্ভে চলে গেছে। ভাঙনকবলিত মানুষ খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করেছ।

দেওয়ানগঞ্জের চুকাইবাড়ি ইউনিয়ন বন্যার পানিতে ভাসছে। উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে ১৭ হাজার পরিবারের ৮৫ হাজার ১১০ জন লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এ পর্যন্ত ত্রাণ হিসেবে ১৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পেয়েছেন বানভাসিরা। এ ছাড়া ৫০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ জন্য তৈরি করা হয়েছে।

ফরিদপুর : দেশের উত্তরাঞ্চলের পর এখন বাড়তে শুরু করেছে মধ্য অঞ্চলের নদ-নদীর পানি। কয়েক দিন ধরে ফরিদপুরের নিম্নাঞ্চলে এই পানি প্রবেশ করছে। পদ্মার পানি বাড়ার ফলে ফরিদপুর জেলা সদরের নর্থচ্যানেল ইউনিয়নের গোলডাঙ্গী সড়কটি পদ্মার পানিতে তলিয়ে গেছে। সড়কটি দিয়ে এখন নৌকা দিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে। ভোগান্তিতে পড়েছে মানুষ।

ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মার পানি গোয়ালন্দ পয়েন্টে ২০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে এখন বিপৎসীমার ৭৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার পদ্মা, আড়িয়াল খাঁ, কুমার ও মধুমতি নদীতে পানি বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে। এর ফলে জেলার কয়েক হাজার পরিবার এখন পানিবন্দি।

ফরিদপুর সদর উপজেলার নর্থচ্যানেল ইউপির চেয়ারম্যান মোস্তাকুজ্জামান জানান, তার ইউনিয়নটি পদ্মা নদীবেষ্টিত। এই কারণেই এখন চারদিক দিয়েই পানি প্রবেশ করেছে। এই ইউনিয়নে পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দি। পানি বাড়ার কারণে চরে এখন পশুখাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে।

সাঘাটা (গাইবান্ধা) : গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় ৫টি ইউনিয়নের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। প্রায় দুই হাজার বানভাসি এখন ওয়াপদা বাঁধসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছে। গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন তারা। হাজার হাজার একর রোপা আমন খেত পানিতে ডুবে গেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, সাঘাটায় ব্রক্ষ্মপুত্রের পানি ২০.৮৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বিপৎসীমার ১০১ সেন্টিমিটার অতিক্রম করছে। ভরতখালী ইউনিয়নের কুকড়াহাট থেকে ভরতখালী গো-হাট পর্যন্ত মিনি বিশ্বরোডে ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে বালুর বস্তা ফেলে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। বিভিন্ন রাস্তাঘাট বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সাঘাটা ইউনিয়নের প্রায় ১৪ হাজার মানুষ, হলদিয়া ইউনিয়নের ১৪টি গ্রামের প্রায় ২৫ হাজার মানুষ, জুমারবাড়ী ইউনিয়নের প্রায় ৫ হাজার পরিবার, ভরতখালী ইউনিয়নে প্রায় ৪ হাজার মানুষ, কচুয়া ইউনিয়নের প্রায় এক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। দুর্গতরা গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে উঁচু রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছেন। পরপর দুই দফা বন্যায় সেখানকার মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। এসব ইউনিয়নের নির্বাচিত চেয়ারম্যানগন এসব তথ্য জানান।

পিডিএসও/হেলাল