ঝালকাঠিতে পেয়ারা চাষীদের হতাশা

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০২০, ১৫:১৭

মো. শাহাদাত হোসেন মনু, ঝালকাঠি

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আষাড় মাসের শেষের দিকেও পেয়ারার সমারোহ শুরু হয়নি। ঝালকাঠিসহ দক্ষিণাঞ্চলের ৫৫ গ্রামে উৎপাদিত বাংলার আপেল খ্যাত মিষ্টি পেয়ারা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিলম্বে ফলন হচ্ছে। ফলে চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছে পেয়ারা চাষীরা।

একদিকে করোনার ছোবল, অপরদিকে নির্দিষ্ট সময়ে পেয়ারার ফলন পরিপক্ক না হওয়ায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা। পেয়ারা পরিপক্ক হতে আরো ১৫দিন সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন চাষীরা। 

জানা গেছে, ঝালকাঠি সদর, স্বরুপকাঠি ও বানারিপাড়া (ঝালকাঠি-বরিশাল ও পিরোজপুর জেলা) এ ৩ উপজেলার ৫৫ গ্রাম নিয়ে গড়ে উঠেছে পেয়ারা রাজ্য। প্রতিবছর আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র মাস এলেই পেয়ারার কারণে পাল্টে যায় ওই অঞ্চলের চিত্র। পেয়ারা বেচা-বিক্রির জন্য ওইসব এলাকার খালে রয়েছে ভাসমান বাজার। প্রতিদিন শত শত নৌকায় চাষীরা আসে পেয়ারা বিক্রি করতে। ট্রাক ও বড় বড় ট্রলার নিয়ে আসেন পাইকাররা পেয়ারা কিনতে। এ ছাড়া প্রাকৃতিক অপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন ভ্রমণ পিপাসুরা। শুধু দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেই নয়, বাংলাদেশে প্রবাসী বিদেশী অতিথিরাও আসেন উপভোগ করতে। 

২০১৮ সালে ঝালকাঠি সদর উপজেলার কির্ত্তিপাশা ইউনিয়নের ভীমরুলী ভাসমান এ পেয়ারা হাট পরিদর্শন করেন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত হর্ষবর্ধন শ্রীংলা। ২০১৯ সালের ১১ জুলাই পরিদর্শন করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার। সঙ্গে তার সফর সঙ্গিরাও ছিলেন। সবাই মিলে ঘুরে ঘুরে দেখলেন পুরো ভাসমান পেয়ারা বাজার। এসময় ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মো. জোহর আলী, পুলিশ সুপার ফাতিহা ইয়াসমিন উপস্থিত ছিলেন। পরিদর্শনকালে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাস্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার মন্তব্য করেন, থাইল্যান্ড-ভিয়েতনামের বিভিন্ন বড় বড় শহরে এমন জলে ভাসা বাজারের দেখা মেলে। কিন্তু বাংলাদেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে জলেভাসা বাজার-হাট গড়ে ওঠা সত্যিই অবাক করার মতো। তাও আবার জমজমাট হাট। অর্ধবাংলায় তিনি বলেন, ‘এটি দেখতে সত্যিই চমৎকার!’ অদ্ভুত সুন্দর ভাসমান এ হাট ও তার আশপাশের প্রকৃতি যে কতটা নজরকাড়া হতে পারে, এটি এখানে না এলে বোঝার উপায় নেই।

স্থানীয়দের কাছে জানা গেল, এ অঞ্চলের ‘সবচেয়ে বড়’ ভাসমান হাট এটি, যা পুরো বাংলাদেশেই অনন্য। এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বাজার এটি। এ ছাড়াও পাশের পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠির (নেছারাবাদ) আটঘর, কুড়িয়ানা, আতা, ঝালকাঠির মাদ্রা। এসবই পিরোজপুর সন্ধ্যা নদী থেকে বয়ে আসা একই খাল পাড়ে অবস্থিত। যথাসময় বৃষ্টি না হওয়ায় আষাঢ় মাস শেষের দিকে হলেও এখন পর্যন্ত পেয়ারা পরিপক্ক হয়নি। তাই ভীমরুলী পেয়ারার ভাসমান হাটে পাকা পেয়ারার সমারোহ নেই। দুই সপ্তাহ ধরে পেয়ারা বাগান এলাকায় যথেষ্ট বৃষ্টি ঝরলেও এপ্রিল ও মে মাসের শুরুতে প্রয়োজনীয় বৃষ্টি না হওয়ায় এ ফলন বিলম্ব হচ্ছে। 

ভীমরুলী এলাকার পেয়ারা চাষী গৌতম মিস্ত্রি জানান, আমরা কয়েক পুরুষ পেয়ারা চাষ করেই জীবিকা নির্বাহ করি। প্রতিবছরের চেয়ে এ বছর ফলন কম ধরেছে। ফলন যা আসছে তাও পরিপক্ক হতে দেরী হচ্ছে। একদিকে করোনার কারণে অন্যসব উপার্জন আমাদের বন্ধ। শুধু পেয়ারার দিকে তাকিয়েই দিন গুনছি। কখন পেয়ারা পাকতে শুরু করবে আর কবে তা বিক্রি করতে পারবো। 

ফলন দেরীতে আসার কারণ হিসেবে গৌতম মিস্ত্রি পূর্বপুরুষদের কথিত মতের বর্ণনা দিয়ে জানান, এবছর বৈশাখ ও   জ্যৈষ্ঠ মাসে তেমন বৃষ্টি হয়নি। যা হয়েছে তাও আবার উত্তর-পশ্চিম দিকের ঠান্ডা বৃষ্টি। ওই ঠান্ডা বৃষ্টির কারণে পেয়ারা গাছে ফুল দেরীতে আসছে। যদি পূর্ব দিকের বৃষ্টি হতো তাহলে তা একটু গরম থাকতো। আর পেয়ারা গাছেও ফুল তাড়াতাড়ি আসতো। 

আদমকাঠি গ্রামের পেয়ারা চাষী প্রেমানন্দ মন্ডল (৭০) জানান, পুরুষানুক্রমে তারা পেয়ারার চাষ করে আসছেন। এবছর সারা জ্যৈষ্ঠ মাস জুড়ে বৃষ্টি হয়নি, এমনকি আষাঢ়ের শুরুতেও তা না হওয়ায় পেয়ারার ফলন কমপক্ষে তিন সপ্তাহ পিছিয়ে গেছে। সাধারণত মধ্য আষাঢ়ে পেয়ারা পাকতে শুরু করে এবং বাজারেও পাঠানো হয়। এবছর আষাঢ়ের শেষ প্রায়, শ্রাবণ মাসের প্রথম সপ্তাহে পেয়ারা তোলার আশা করছেন তারা।

ডুমুরিয়া গ্রামের পঙ্কজ বড়াল জানান, প্রতিবছর সাধারণত জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষের দিকে অথবা আষাঢ় মাসের প্রথম দিকে পেয়ারা পাকতে শুরু করে। এবছর পেয়ারা গাছে ফুল দেরীতে আসায় পেয়ারা পাকতেও দেরী হচ্ছে। অন্যান্য বছরের তূলনায় এবছর ফলনও কম আসছে। একদিকে করোনার কারণে পাইকার, ফরিয়া কম আসবে তাই পেয়ারা সরবরাহ করতে চাহিদাও কম থাকবে। অন্যদিকে চাহিদা ও সরবরাহের সুযোগ কম থাকায় ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার আগাম হতাশা প্রকাশ করেন পঙ্কজ বড়াল। 

ঝালকাঠি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহ জালাল জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পেয়ারার ফলনে বিলম্ব হচ্ছে। প্রতিবছর এমন সময় কয়েকশ মন পেয়ারা বিক্রি করতে পারে চাষীরা। কিন্তু এখন পর্যন্ত পেয়ারা পরিপক্ক হয়ে পাকতেও শুরু করেনি। আরো ১৫ দিন সময় লাগবে পেয়ারা পাকতে।

পিডিএসও/এসএম শামীম

 

সর্বাধিক পঠিত