বেনাপোলে রাজনীতি এবং আইনের বেড়াজালে আটকা আমদানি-রপ্তানি

প্রকাশ : ০৬ জুন ২০২০, ২০:০০

মনির হোসেন, বেনাপোল(যশোর)

সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল। বেনাপোল বন্দরের বিপরীতে ভারতের পেট্রাপোল বন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠন ও প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তি সম্প্রতি বৈঠক করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন শনিবার থেকে বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলপথে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চালু করা হবে। এ সিদ্ধান্তের কথা বেনাপোল সিএন্ডএফ এজেন্টস এসোসিয়েশনকে জানান ভারতীয় সিএন্ডএফ এজেন্ট। সে অনুযায়ী বাংলাদেশের সকল বন্দর ব্যবহারকারী, কাস্টম ও বন্দর সকলে প্রস্তুুত ছিল আমদানি পণ্য গ্রহণ করার জন্য। আমদানি-রপ্তানি চালু হওয়ার খবর শুনে বেনাপোল ও পেট্রাপোল বন্দরের হাজার হাজার শ্রমিক কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। দীর্ঘ আড়াই মাসের অধিক সময় আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকায় তারা মানবেতর জীবন-যাপন করছিল। আমদানিকারকরাও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল আমদানি-রপ্তানি চালুর খবর শুনে।

কিন্তু শনিবারও তারা আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম শুরু করেনি। এর আগে ১ জুন আমদানি-রপ্তানি চালু করার কথা জানানো হয়েছিল ভারত থেকে। সে সময় পেট্রাপোল বন্দরের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ জানান, তারা সকলেই প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিল পণ্য রপ্তানি করার জন্য। কিন্তু তাদের পৌরসভার চেয়ারম্যান জানান বারাসাত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (ডিএম) কর্তৃক সরাসরি পণ্য রপ্তানির একটি পত্র না পাওয়া পর্যন্ত তারা পণ্য রপ্তানি করতে পারবেন না। করোনার দায়িত্ব কে নিবে। আমদানি-রপ্তানি চালু হলে যদি করোনা বেড়ে যায় তাহলে এই দায়-দায়িত্ব আমাদের ঘাড়েই বর্তাবে। সুতরাং ডিএম থেকে সরাসরি রপ্তানি আদেশ না এলে তিনি এই রপ্তানি বন্ধ রাখার জন্য জানান। ফলে নীতিগতভাবে সকল সিদ্ধান্ত থাকলেও বাংলাদেশে পণ্য রপ্তানি করতে পারেননি তারা।

আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে বেনাপোল-পেট্রাপোল সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর। প্রতি বছর ৩০ হাজার কোটি টাকার পণ্য এই স্থলবন্দরের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি হয়ে থাকে। সরাসরি প্রায় ২০ হাজার মানুষ এবং পরোক্ষ ভাবে সব মিলিয়ে ৫০ হাজার মানুষ নির্ভরশীল এই স্থলবন্দরের উপর। কিন্তু পুনরায় রাজনীতি এবং আইনের রোষানলে পড়ে এই আমদানি-রপ্তানির সিদ্ধান্ত বন্ধ হয়ে যায়। 

এদিকে এ আইনের জটিলতা এবং করোনা প্রাদুর্ভাব থাকা সত্ত্বেও পেট্রাপোল আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতি সরাসরি পণ্য রপ্তানির জন্য একটি পত্র ডিএম এর দপ্তরে দিয়েছেন। সেখানে তারা সকল স্বাস্থ্যসেবা প্রতিপালন করেই বাংলাদেশে পণ্য পাঠাবেন বলে উল্লেখ করেছেন। ওই পত্রে তারা ডিএমকে অনুরোধ জানিয়েছেন সরাসরি বাংলাদেশ পণ্য রপ্তানির জন্য। চিঠির আলোকে বৃহস্পতিবার বিকেলে ন্যোম্যান্সল্যান্ডে বৈঠকে ভারতের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার জেলাশাসক চৈতালি চক্রবর্তী, বনগাঁ পৌর সভার মেয়র শংকর আঢ্য ডাকুসহ কাস্টমস, পুলিশ, বিএসএফ ও পেট্রাপোল সিএন্ডএফ এজেন্টস, ট্রাক মালিক সমিতি ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। অপরদিকে বাংলাদেশের পক্ষে বেনাপোল বন্দর, কাস্টমস, বিজিবি ও সিএন্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশন, সিএন্ডএফ স্টাফ এসোসিয়েশন ও ট্রান্সপোর্ট মালিক সমিতির নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানেই সিদ্ধান্ত হয় শনিবার থেকে এ পথে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চালু করা হবে। তবে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো পণ্য আমদানি-রপ্তানি করতে পারেননি ব্যবসায়ীরা।

বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাসের কারণে গত ২৩ মার্চ থেকে বেনাপোল-পেট্রাপোল বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি সম্পূর্ণ ভাবে বন্ধ  হয়ে যায়। আমদানি-রপ্তানি চালু করার জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বারবার পত্র দিলেও কলকাতাতে করোনায় রেড জোন থাকায় রাজ্য সরকার আমদানি-রপ্তানির অনুমতি দেননি। চতুর্থ দফা লকডাউন চালু করার পর কেন্দ্র সরকার বেশ কিছু ক্ষেত্রে লকডাউন তুলে নিয়ে আনলক অন পদ্ধতি চালু করেছে। সে সুবাদে পশ্চিমবাংলা রাজ্য সরকার এবং পেট্রাপোল বন্দরের বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ প্রশাসনের সাথে বৈঠক করে দীর্ঘ প্রায় আড়াই মাস পর আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দিলেও ভারতের ব্যবসায়ীদের কোনো নির্দেশনা না পাওয়ায় থমকে আছে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম।

অন্যদিকে ভারতীয় নেতৃবৃন্দের বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্তের কারণে বেনাপোলের নেতৃবৃন্দ রীতিমতো বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে আছেন। তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমদানিকারকদের জানানো হয়েছিল শনিবার ভারত থেকে পণ্য আমদানি হবে। আমদানিকারকরাও প্রস্তুুতি নিয়েছিল পণ্য খালাসের। কিন্তু তাদের সেই সিদ্ধান্ত যে বেশিক্ষণ টিকবে না এটা কে জানে। তারা এভাবে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে একের পর এক বন্দরকে অচল করে রাখছে। নানা অপকৌশল তৈরি করছে বন্দরে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ রাখার জন্য। বেনাপোলের ব্যবসায়ীরা বলছেন কেন্দ্র যেখানে বাধা দিচ্ছে না। তাছাড়া রাজ্য সরকারেরও একটি পত্র তাদের হাতে আছে সরাসরি আমদানি-রপ্তানি চালু করার। সেখানে কি কারণে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ করে রাখা হয়েছে সেটা একটি রহস্যের মধ্যেই থেকে যাচ্ছে। 

ভারতীয় একজন রপ্তানিকারক বলেন, ওপাশে  (পেট্রাপোলে) প্রায় আড়াই হাজার ট্রাক মাল বোঝাই করে বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। এই ট্রাকগুলোর অনেক পণ্য ইতোমধ্যে ঝড়, রোদ, বৃষ্টিতে ভিজেছে। অনেক ট্রাকের ব্যাটারি, টায়ার নষ্ট হয়ে গেছে। সিদ্ধান্তের দোটানায় আমদানি-রপ্তানি চালু হচ্ছে না পেট্রাপোল বন্দর দিয়ে।

বেনাপোল সিএন্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন জানান, দীর্ঘ আড়াই মাস পর ভারত বাংলাদেশের প্রশাসন ও ব্যবসায়ীদের সাথে বিভিন্ন সময় আলোচনার প্রেক্ষিতে ভারতীয় সিএন্ডএফ এজেন্টস আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চালুর জন্য ঘোষণা দেয়। তবে ভারতের ব্যবসায়ীদের কোনো সাড়া না পাওয়ায় কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সব ধরনের প্রস্তুুতি নিয়ে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরাও প্রস্তুুত। তবে ভারতের ব্যবসায়ীদের সিদ্ধান্ত না পাওয়ায় কার্যক্রম থমকে আছে।

বেনাপোল চেকপোষ্ট কাস্টমস কার্গো শাখার রাজস্ব কর্মকর্তা নাসিদুল হক বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বন্দরের ব্যবসায়ীরা আমদানি-রপ্তানির ঘোষণা দিলেও এখনও পর্যন্ত ভারত থেকে কোনো পণ্যবাহী গাড়ি বাংলাদেশে প্রবেশ করেনি। বাংলাদেশ থেকেও কোনো গাড়ি ভারতে যায়নি। আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম শুরু হয়নি। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা পণ্য আমদানি-রপ্তানি চালু করলেই বন্দর সচল হয়ে যাবে। আমরাও প্রস্তুুত রয়েছি।