করোনা : সাঁথিয়ার তাঁতপল্লীতে সুনশান নিরবতা, অনাহারে তাঁত শ্রমিকরা

সুদ মওকুফের দাবী তাঁত মালিকদের

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২০, ১৩:৫৫

খালেকুজ্জামান পান্নু,পাবনা

করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী সারাদেশের ন্যায় তাঁতসমৃদ্ধ এলাকা পাবনার সাঁথিয়ায় বন্ধ রয়েছে সকল তাঁতের কারখানা। তাঁতপল্লীতে এখন সুনশান নিরবতা। এতে দুর্ভোগে পড়েছে হাজার হাজার তাঁতশ্রমিকসহ মালিকগণ। লাগাতার তাঁত বন্ধের কারণে তাঁতীদের অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটছে। সরকারি সহযোগীতা না পেলে ধ্বংসের মুখে পড়বে সাঁথিয়ার তাঁতশিল্প এমনটাই মনে করছেন তাঁত ব্যবসায়ীরা।

তাঁতীরা জানান, মহামারি করোনার কারণে কারখানা বন্ধ ঘোষণার ২১দিন পার হলেও এখন পর্যন্ত সরকারি বা বেসরকারি কোনও ত্রাণ সহায়তা পাননি কেউ। অপরদিকে হাট-বাজার বন্ধ থাাকায় উৎপাদিত পণ্যর পাহাড় জমে গেলেও বিক্রি করতে পারছেন না কেউ।

তাঁত মালিকেরা বলেন, এ অবস্থায় নিজেরাই চলতে পারছি না শ্রমিকদের দিব কি । মহামারিতে বন্ধ ঘোষণায়  লোকসানে যাচ্ছে তাঁতশিল্প। অপরদিকে ব্যবসা বন্ধ হলেও ব্যাংকের ঋণের সুদ বাড়ছে হু হু করে। এ নিয়ে চিন্তিত রয়েছেন তাঁতীরা। সরকার যদি তাদের সহযোগীতা না করে তবে এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। 

সরেজমিন উপজেলার তাঁত সমৃদ্ধ পিপুলিয়া, শশদিয়া, ফকির পাড়া, ছেচানিয়া, করমজা, ধুলাউড়ি, ঘুঘুদহ, তেতুঁলিয়া নারিন্দা ছাড়াও পাবনার জালালপুর নতুন পাড়া, একদন্ত, চাচকিয়া, দোগাছি গ্রাম ঘুরে দেখা যায় ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে যেসব তাঁতপল্লীতে খটখট শব্দে মুখরিত ছিল। হঠাৎ করোনার প্রভাবে তাঁতীপাড়া এখন নিরব, নিস্তব্ধ । সারা বছর ধরে তাঁতীরা এই সময়ের জন্য অপেক্ষা করে থাকেন। এই সময়েই কাপড়ের সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকায় তাদের দম ফেলার সময় থাকে না। অথচ বছরের সবচেয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন তাঁতীরা। কয়েকজন শ্রমিক এগিয়ে এসে বলেন ভাই আমরা না খেয়ে মরে যাচ্ছি। প্লিজ আমাদের জন্য কিছু করেন। আর পারছি না।

সাঁথিয়ার নজরুল ইসলাম নজু  নামের এক প্রবীণ তাঁত শ্রমিক জানান, আজ তিন সপ্তাহ আমাদের কোনও কাজকর্ম নেই। মহাজন কাপড় বিক্রি না করলে টাকা দিতে পারবে না। ঘরে খাবার নেই পরিবার পরিজন নিয়ে না খেয়ে চলতে পারছি না। আজ প্রায় ১ মাস হতে চললো কারও থেকে কোন সহায়তাও পাইনি। পিপুলিয়া গ্রামের হাফিজুল,আব্দুল্লাহ সহ প্রায় ১০জন তাঁত শ্রমিক জানায় প্রতি সপ্তাহে যে টাকা বিল পেতাম তা দিয়ে কোনভাবে পরিবার নিয়ে কোনভাবে কেটে যেত। তাঁত বন্ধ থাকায় আজ ৩ সপ্তাহ কোন বিল পাই না। কোন কাজকর্ম নেই। ঘরেও কোন খাবার নেই বাজার নেই কার কাছে বলবো। কি যে কষ্টে আছি তা আল্লাহ জানেন।

সাঁথিয়ার খ্যাতনামা তাঁতব্যবসায়ী হালাল লুঙ্গির প্রোপাইটর আলহাজ্ব ইন্তাজ আলী মল্লিক বলেন, আমার প্রায় শতাধিক তাঁত রয়েছে। এখানে  নারী পুরুষ মিলে প্রায় আড়াইশত শ্রমিক কাজ করেন। আজ প্রায় ১মাস হতে চলল কারখানা বন্ধ রয়েছে। হাটবাজারও বন্ধ। উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে না পেরে ব্যাংক থেকে মোটা অংকের ঋণের কিস্তি দিতে পারছি না। প্রতি সপ্তাহে রিকভারী দিতে হয়। কিন্তু দিতে পারছিনা। এ দিকে কারখানা বন্ধ থাকলেও সুদতো বেড়েই চলছে। কিভাবে সুদের টাকা দিব তা আল্লাহ জানেন। 

পিপুলিয়া গ্রামের তাঁতী দেলোয়ার হেসেন জানান, বাড়ি-ঘর জমি বন্ধক রেখে ব্যাংক ও বিভিন্ন এনজিও থেকে ১৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ৪০টি তাঁত কিনে ব্যবসা  শুরু করেছিলাম। তাঁতের উৎপাদিত লুঙ্গি বিক্রি করতে পারছি না। ব্যাংকের কিস্তির টাকা দিতে পারছিনা। ভিটেমাটি বিক্রি করে ঋণের টাকা দিতে হবে । তিনি প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আবেদন রেখে বলেন, তিনি মানবতার মা। তিনি অবশ্যই আমাদের ধংস হতে দিবেন না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই তাঁত বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

সাঁথিয়া বেসিক সেন্টারের লিয়াজোঁ অফিসার শ্রী জুয়েল চন্দ্র তাঁতীদের দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে বলেন,তাঁতবোর্ড থেকে তালিকা চেয়েছেন। আমরা সমিতির মাধ্যমে অসহায় তাঁতী ও তাঁতশ্রমিকের তালিকা তৈরি করছি। খুব দ্রæত এগুলো পাঠিয়ে দিব বোর্ডে। এর আগে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট একটি তালিকা জমা দিয়েছি। এখন পর্যন্ত কোনও সাহায্য সহযোগীতা আসেনি।

সাঁথিয়া পৌর মেয়র মিরাজুল ইসলাম বলেন, পৌরসভার বেশ কিছু জায়গায় তাঁতীদের আমরা ত্রান দিয়েছি। আরও কয়েক শ’তাঁতী পরিবারকে ত্রাণসহায়তা দেয়ার উদ্যাগ নেয়া হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার এসএম জামাল আহম্মেদ জানান, সরকারের পক্ষ থেকে যে ত্রাণ এসেছিল তা বিভিন্ন উপজেলায় চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে অসহায়দের মাঝে বন্টন করা হচ্ছে। ত্রাণ অপর্যাপ্ত থাকায় সবাইকে দেয়া সম্ভব হয় নাই। আবার আসবে। এলে পর্যায়ক্রমে সবাইকে দেয়া হবে। তাঁত মালিকদের ঋণের সুদ মওকুফের জন্য সুপারিশ করা হবে।

পিডিএসও/মা