আক্রান্ত না.গঞ্জ : গোপনে এলাকা ছাড়ার হিড়িক!

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২০, ০৮:৩০

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি

নারায়ণগঞ্জে পুলিশ ও সেনাসদস্যদের কড়াকড়ির মধ্যেই গোপনে শ্রমিক অধ্যুষিত এই জেলা থেকে পালানোর হিড়িক পড়েছে যেন। দেশের ভেতরে করোনাভাইরাসের এপিসেন্টার বা মূলকেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে নারায়ণগঞ্জকে। সেখানে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা যেমন বেশি তেমনি মৃত্যুর সংখ্যাও অনেক।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা বলেন, নতুন আক্রান্ত ১৩৯ জনের মধ্যে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ঢাকা শহরে রয়েছে ৬২ জন এবং ঢাকা শহরের বাইরে অন্যান্য এলাকায় বাকিরা। এছাড়া নতুন করে চার জেলায় করোনাভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে।

জেলা চারটি হলো লক্ষ্মীপুর, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও ও ঝালকাঠি। এ চারটি জেলায় যারা নতুন করে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন তারা এক সপ্তাহের মধ্যে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে সেখানে গেছেন। স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবে শনিবার পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ৪৮২ জনের মধ্যে নারায়ণগঞ্জে আছেন ৮৩ জন।

এই অবস্থায় কয়েকদিন ধরেই নারায়ণগঞ্জ থেকে মানুষ গোপনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে গেছেন। এসব মানুষ হয়তো নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন পেশায় জড়িত। যেসব জেলায় নারায়ণগঞ্জ থেকে মানুষ গেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে চাঁদপুর, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, গাজীপুর, ভোলা ও বরিশাল।

গত সপ্তাহের শেষের দিকে নারায়ণগঞ্জ থেকে ফেনী গেছেন এমন দুজন ব্যক্তির জানান, নারায়ণগঞ্জে তারা ছোটখাটো চাকরি করতেন। মার্চ মার্চের ২৬ তারিখ থেকে কোনো কাজ না থাকায় তারা গ্রামের বাড়ি ফেনীতে চলে যান। তাদের আশঙ্কা, নারায়ণগঞ্জে তারা যেখানে বসবাস করেন সে বাড়িতে বা তার আশপাশে যদি কারো দেহে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া তাহলে হয়তো সে এলাকা থেকে আর বের হতে পারবেন না। সেজন্য তারা গ্রামের বাড়ি চলে যান।

তারা জানান, নারায়ণগঞ্জে বেশ কয়েকজনের মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের খবর ছড়িয়ে গেলে তাদের মনে আতঙ্ক তৈরি হয়। তাছাড়া নারায়ণগঞ্জে তারা কার্যত বন্দি জীবনযাপন করছিলেন। তবে দুজনেই জানিয়েছেন, গ্রামের বাড়িতে যাবার পর তারা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখছেন।

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ থেকে গোপনে বরিশালের উজিরপুরে যাওয়ার কারণে সেখানে বেশ কয়েকটি বাড়ি লকডাউন করে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

গত বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জ থেকে মাইক্রোবাস, পিকআপ ও অ্যাম্বুলেন্সে করে কিছু মানুষ ঠাকুরগাঁও গেছে। এখন সেসব ব্যক্তি এবং তাদের বহনকারী যানবাহন খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে প্রশাসন।

দেশজুড়ে যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ হলেও নারায়ণগঞ্জ থেকে দলে দলে মানুষ কীভাবে দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে সে প্রশ্ন উঠেছে। নারায়ণগঞ্জ থেকে ভৈরবে পালিয়ে যাবার কারণে পাঁচকে বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে পাঠিয়েছে ভৈরব উপজেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।

কেন নারায়ণগঞ্জ থেকে মানুষ গোপনে চলে যাচ্ছে : সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইডিসিআর) উপদেষ্টা মোশতাক হোসেন বলেন, যারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের বিভিন্ন জায়গায় সামাজিকভাবে একঘরে করে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এ বিষয়টি নিয়ে মানুষের মনে এক ধরণের ভীতি তৈরি হয়েছে। সেজন্য করোনাভাইরাসের উপসর্গ থাকলেও এখন অনেকে পরীক্ষা করাতে আগ্রহী হচ্ছেন না।

দেখা যাচ্ছে কোনো বাড়িতে সন্দেহভাজন রোগীকে পরীক্ষা করতে এলেই তার বাড়ি লকডাউন হয়ে যাচ্ছে। তারা টেস্টের রেজাল্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করছে না। ফলে মানুষের মধ্যে রোগটা লুকিয়ে রাখা বা এক জায়গা থেকে পালিয়ে অন্য জায়গায় চলে যাবার প্রবণতা বাড়ছে ।

তিনি বলেন, লকডাউন বিষয়টি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা দেওয়ার একটি পদ্ধতি। এটাকে যদি ভয়াবহভাবে উপস্থাপন করা হয় তাহলে তো জনস্বাস্থ্যের জন্য যে উদ্দেশ্য-ভাইরাসটা যেন ছড়িয়ে না পড়ে, সে উদ্দেশ্যটাই ব্যাহত হচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জের উদাহরণ দিয়ে হোসেন বলেন, লকডাউন নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হওয়ার কারণেই অনেকে নারায়ণগঞ্জ থেকে গোপনে অন্য এলাকায় চলে গেছে। তারা ভাবছে লকডাউনের সময় ঘরে বসে থাকবে, তারা না খেয়ে মারা যাবে। মৃত্যু হলেও কেউ দেখতে আসবে না। এই আশঙ্কা থেকেই তারা অন্য জায়গায় যাচ্ছে। এত করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আরো ছড়িয়ে যাবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

পিডিএসও/তাজ