কক্সবাজারে ৮ বছর আটকা মানবপাচার আইনে দায়েরকৃত ৬৩৭ মামলা

প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৮:২৯

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, কক্সবাজার

পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও কোস্টগার্ডসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার নানামুখী অভিযানের পরও বন্ধ হচ্ছে না মানবপাচার। ঘাট পরিবর্তন ও কৌশলে চলছে আইনপরিপন্থী এসব অপরাধ। গত ১১ ফেব্রুয়ারি সাগর পথে মালয়েশিয়ায় যাত্রাকালে সেন্টমার্টিনে ট্রলার ডুবিতে ২১ জন রোহিঙ্গা নিহত হওয়া ঘটনা সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তুলেছে। 

অন্য দিকে, কক্সবাজারে এখন পর্যন্ত ৬৩৭টি মামলা হলেও বিচার হয়নি একটিরও। বিচারক সঙ্কট ও সাক্ষীর অনুপস্থিতির কারণে আদালতে আটকে আছে মানবপাচার মামলাগুলো। মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণে মানবপাচারের শিকার লোকজন ক্ষতিগ্রস্ত ও বিচার বঞ্চিত হচ্ছে।

আইন কর্মকর্তার দাবি, এসব মামলায় সাক্ষী পাওয়া কঠিন তাই সহজে বিচার কাজ শেষ করাও কঠিন। তবে শুধু মামলা নয়, দালাল নিয়ন্ত্রণ ও মানবপাচার রোধে সমন্বিতভাবে কাজ করার কথা বলছেন বিশ্লেষকরা। পুলিশ বলছে, ইতোমধ্যে দালালদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এদের ধরতে অভিযান চলছে।

সাগরপথে মালয়েশিয়ার মানবপাচার শুরু ২০১১ সাল থেকে। বিভিন্ন সংস্থার পদক্ষেপের কারণে ২০১৪ সালের শেষ দিক থেকে অনেকটাই বন্ধ ছিল সাগরপথে মানবপাচার। কিন্তু রোহিঙ্গা শরনার্থীদের ঘিরে ২০১৭ সালের পর আবারও সক্রিয় হয়ে উঠে দালালচক্র।

মানবপাচার মামলার বিষয়ে বেসরকারি সংস্থা নোঙরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত কক্সবাজারের আট থানায় মানবপাচার মামলা হয়েছে ৬৩৭টি। এর মধ্যে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় ৯৭টি, রামু থানায় ২৪টি, উখিয়া থানায় ৬৮টি, টেকনাফ মডেল থানায় ২১৮টি, চকরিয়া থানায় ১৯টি, কুতুবদিয়া থানায় একটি, মহেশখালী থানায় ৩৬টি এবং পেকুয়া থানায় ৮টি মামলা হয়েছে। থানার এসব মামলা ছাড়া ট্রাইব্যুনালেও অনেক মামলা রয়েছে। চলতি বছর জেলার বিভিন্ন থানায় মানবপাচার আইনে মামলা হয়েছে আরো ২৮টি।
মামলাগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৬৩৭ মানবপাচার মামলার একটিও নিষ্পত্তি হয়নি। সাক্ষীর অভাবে মামলায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।  এছাড়াও অধিকাংশ মামলায় আসামিদের সম্পদ ক্রোকের জন্য আদালত আদেশ দিলেও একটিও কার্যকর হয়নি
এ পর্যন্ত

চলতি বছর সাগরপথে মানবপাচার আর প্রাণহানিকে ঘিরে আবারও আলোচনায় চলে আসে কক্সবাজার। 

পুলিশের দেয়া তথ্যমতে, ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কক্সবাজার উপকূলে মানবপাচারের ঘটনা ঘটে ২৮টি। যেখানে ৭১৩ রোহিঙ্গাকে উদ্ধারের পাশাপাশি গ্রেফতার করা হয় ৬৯ জনকে।

নোঙরের প্রধান নির্বাহী দিদারুল আলম রাশেদ বলেন, কক্সবাজারে মানবপাচারের অহরহ ঘটনা ঘটলেও মামলা হয়েছে কিছু। এর মধ্যে একটি মামলারও সুরাহা হয়নি। এটা কোনোভাবে কাম্য নয়। যারা দুঃসাহস দেখিয়ে মামলা করার জন্য এগিয়ে এসেছে, তাদের সমাধান দিতে না পারাটা অত্যন্ত দুঃখজনক। এটার সুযোগ নিয়ে পাচারকারীরা উল্টো আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে।

তিনি আরও বলেন, মানবপাচার আইন অনুযায়ী এই মামলার ৯০ দিনের মধ্যে অভিযোগ গঠন এবং ১৮০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করার কথা। কিন্তু দুঃখজনক হলো, গত আট বছরে একটি মামলারও বিচারকাজ শেষ হয়নি। ফলে মানবপাচার প্রতিরোধে প্রণীত আইনের কোনো সুফল পাচ্ছে না ভিকটিমরা। পাচারও রোধ করা যাচ্ছে না।

কক্সবাজার আদালতের সিনিয়র আইনজীবী সরওয়ার কামাল জানান, কক্সবাজারের মানবপাচার মামলাগুলো নিষ্পত্তি না হওয়ার পেছনে একমাত্র কারণ সাক্ষী ও বাদিদের আদালতে হাজির না হওয়া। সাক্ষী হাজির না হওয়ার কারণে মানবপাচার মামলায় কোনো ধরণের অগ্রগতি নেই। মামলায় স্থবিরতা ও শাস্তি না হওয়ার কারণে মানবপাচারকারীরা আরও সুযোগ নিচ্ছে। সুযোগ পেলেই জড়িয়ে যাচ্ছে ফের মানবপাচারে। এ কারণে কক্সবাজার অঞ্চলে মানবপাচার বন্ধ হচ্ছে না।

মানবপাচারের শিকার সুমন বড়ুয়া (৩২), বদিউল আলমসহ (৫২) বেশ কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মামলায় সাক্ষ্য দেয়ার জন্য আদালত বা থানা থেকে কোনো ধরণের নোটিশ দেয়া হয় না। মাঝে মধ্যে আদালতে মামলার বিষয়ে খোঁজখবর নিতে গেলে পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি), পেশকার ও দায়িত্বপ্রাপ্তরা জানিয়ে দেন, মানবপাচার মামলাগুলোর বাদি সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে এসব মামলা পরিচালনা হচ্ছে। তাই সাক্ষীদের আদালতে যাওয়ার দরকার নেই। পুলিশের পক্ষ থেকেও কিছু জানানো হয় না। এই সুযোগে মানবপাচারকারীরা জামিনে বের হয়ে এসে সাক্ষীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে বলে অভিযোগ।

কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ফরিদুল আলম জানান, ২০১১ সাল থেকে কক্সাবাজারে মানবপাচার আইনে ৬৩৭টি মামলা হলেও তার একটির বিচারকাজও শেষ হয়নি। মামলা সমূহের কিছু কিছু চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করা হয়েছে। তবে মামলার স্বাক্ষী পাওয়াটা একটু কঠিন। তবু রাষ্ট্রপক্ষ চেষ্টা চালাচ্ছে এসব মামলা নিষ্পত্তি করতে।

কক্সবাজার জেলা আদালতের অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট অরুপ বড়ুয়া অপু বলেন, ভিকটিম এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সঠিক সময়ে সাক্ষ্য দিতে আসেন না। অনেক ভিকটিম খবরও নেন না। সাক্ষীরা যদি সঠিকভাবে আদালতে এসে সাক্ষ্য দেন তাহলে মানবপাচার মামলা নিষ্পত্তি করা কোনো ব্যাপার না। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মামলার বিচার না হওয়ার পাশাপাশি মানবপাচার প্রতিরোধে বিভিন্ন সময়ে নেয়া নানা উদ্যোগও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে আবারও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেয়েছে দালালচক্র।

কক্সবাজার পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন (বিপিএিমবার) বলেন, মানবপাচারের সাথে জড়িত দালালচক্র শনাক্ত হয়েছে। এখন চেষ্টা চলছে তাদের ধরার। এমনকি বিকাশের মাধ্যমে মানবপাচারের টাকা লেনদেনকারিও শনাক্ত হয়েছে। আমরা অচিরেই সবাইকে আইনের আওতায় আনতে পারবো।

প্রসংগত,সাগরপথে অনিশ্চিত স্বপ্ন যাত্রায় সর্বশেষ গত ১১ ফেব্রুয়ারি সেন্টমার্টিনের কাছে ট্রলার ডুবে মারা যায় অন্তত ২১ রোহিঙ্গা। এঘটনায় দালাল ও মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় মামলাও হয়েছে।

পিডিএসও/রি.মা