ফুল বিক্রি ৫০ কোটি টাকা ছাড়াবে

গদখালিতে এক সপ্তাহে ১৫ কোটি টাকার ফুলবাণিজ্য

প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১০:০৭

যশোর প্রতিনিধি

জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালিতে জমে ওঠেছে ফুলের বেচাকেনা। এ বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এ বাজারে ফুল বিক্রি ৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আবদুর রহিম। আজ ভ্যালেনটাইন দিবস, বসন্ত উৎসব সামনের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, বাংলা নববর্ষ, উপলক্ষে ফুল বেচাকেনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন ফুলচাষি ও ক্রেতারা। রাজধানী ঢাকা, চট্রগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে পাইকারি ফুল ক্রেতারা গদখালিতে এসে ফুল কিনছেন।

এবার গদখালিতে গোলাপের দাম রেকর্ড ভেঙেছে। প্রতি পিস ১৮ থেকে ২০ টাকায় পাইকারি বিক্রি করেছেন চাষিরা। যা স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি দাম বলছেন সংশ্লিষ্টরা। গত এক সপ্তাহে গদখালিতে ১৫ কোটি টাকার ওপরে গোলাপ বিক্রি হয়েছে। এ ফুল খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকার নিচে না।

সারা বছর ফুলচাষিরা ফুল বিক্রি করলেও তাদের মূল লক্ষ্য থাকে ফেব্রুয়ারি মাসের তিনটি উৎসব। এছাড়া বাংলা নববর্ষেও ফুলের জমজমাট বেচাকেনা হয়ে থাকে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গদখালি ও পানিসার এলাকায় সাড়ে ৬ হাজারের বেশি কৃষক বাণিজ্যিকভাবে চাষ করছেন রজনীগন্ধ্যা, গোলাপ, রডস্টিক, গাঁদা, গ্লাডিওলাস, জারবেরা, জিপসি, কেলেনডোলা, চন্দ্রমল্লিকাসহ ১২ ধরনের ফুল। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, জেলার তিন উপজেলায় ফুল চাষ হয়ে থাকে। এ জেলায় মোট ৬৫০ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ঝিকরগাছা উপজেলায় ফুল চাষ হয়েছে ৬৪০ হেক্টর জমিতে। ঝিকরগাছায় ফুল চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে জানান ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আবদুর রহিম। এ উপজেলার গদখালি, পানিসারা, হাড়িয়া, নীলকণ্ঠ নগর, চাওরা, কৃষ্ণন্দ্রপুর, চাঁদপুর, বাইশা, পাটুয়াপাড়া, নারানজালি গ্রামসহ প্রায় ৫০টি গ্রামে ফুল চাষ হয়ে থাকে। এছাড়া শার্শা উপজেলায় ১০ হেক্টর জমিতে এবং কেশবপুর উপজেলায় ফুল চাষ হয়েছে ১ হেক্টরের সামান্য বেশি জমিতে। দেশের ফুলের মোট চাহিদার ৭০ ভাগই যশোরের গদখালি ও শার্শা থেকে সরবরাহ হয়ে থাকে।

গদখালি বাজারের ফুল ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের গন্ডি পেরিয়ে এখানকার ফুল দুবাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশে রফতানি হচ্ছে।

পানিসারা গ্রামের ফুলচাষি হারুন-অর-রশিদ ও আবু মুসা জানান, তারা প্রত্যেকে এক একরের বেশি জমিতে ফুল চাষ করেছেন। ফুলের উৎপাদনও ভালো হয়েছে। ইংরেজি নববর্ষসহ সামনের তিনটি উৎসবে তারা সবচেয়ে বেশি ফুল বিক্রি করে থাকেন। গদখালি বাজারের ফুলের পাইকারি ব্যবসায়ী আবু সাইদ জানান, ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম থেকেই ফুলের বাজার চাঙ্গা। দর বেশ ভালো। চলতি মাসের বিভিন্ন উৎসবের আগে ফুলের দাম আরো বাড়বে। ফলে চাষিরা লাভবান হবে বলে তিনি জানান। এ বাজারের ফুলের আরেক পাইকারি ব্যবসায়ী শেখ আহমেদ বলেন, তিনি প্রতিদিন ঢাকা ও চট্টগ্রামে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার ফুল পাইকারি বিক্রি করেন।

যশোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. এমদাদ হোসেন সেখ জানান, ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালি, পানিসারা, নাভারন ও মাগুরা ইউনিয়নে বাণিজ্যিকভাবে ফুলের চাষ হয়ে থাকে। এ চারটি ইউনিয়নের সাড়ে ৬ হাজারের বেশি ফুলচাষি ফুল চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন। ফুলের চাষ বাড়াতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রদর্শনীসহ ফুলচাষিদের উদ্বুদ্ধকরণ এবং নিয়মিতভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়ে থাকে।

গোলাপের রেকর্ড পরিমাণ দাম পেলেও খুশি নন চাষিরা। কুঁড়িপচা রোগ ও বৈরী আবহাওয়ায় গোলাপ উৎপাদনে ধস নেমেছে বলে দাবি গদখালি এলাকার ফুলচাষিদের। এজন্যই চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে। গদখালি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে বাহারী ফুলের মেলায় কৃষকের মুখে স্বপ্নের ঝিলিক। ঝিকরগাছা উপজেলার হাড়িয়া গ্রামের মোকলেসুর রহমান জানান, আমি দুই বিঘা জমিতে পলি হাউসে গোলাপ আবাদ করেছি। এতে ফুলের রঙ ও আবাদ ভালো হয়। নীলকণ্ঠনগর গ্রামের চাষি কামারুল ইসলাম জানান, তিনি ৫০ শতক জমিতে পলিহাউসের মাধ্যমে গোলাপের আবাদ করছেন। এতে ফুলের রঙ ও উচ্চতা সঠিক মাপে হচ্ছে। পটুয়াপাড়া গ্রামের শহিদুল ইসলাম বলেন, তিনি দুই বিঘা জমিতে গোলাপের আবাদ করছেন।

হাড়িয়া গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ সলেমান জানান, চার বিঘা জমিতে গোলাপ ফুলের চাষ করেছেন তিনি। এরই মধ্যে ৭ হাজার পিস গোলাপ ফুল বিক্রি করেছেন তিনি। আর এক চাষি হোসেন জানান, সাত বিঘা জমিতে ফুল চাষ করেছেন তিনি। এর মধ্যে গোলাপ ফুল রয়েছে তিন বিঘা জমিতে। এবার গোলাপের উৎপাদনে ধস নেমেছে। কাঁচাপাতা ঝরা ও কুঁড়িপচা রোগে উৎপাদন ৭০ শতাংশ কমেছে। এজন্য গোলাপের দাম রেকর্ড ছাড়িয়েছে।

কুলিয়া গ্রামের চাষি আনিসুর রহমান বলেন, বসন্তবরণ ও ভালোবাসা দিবসে হলুদ ফুল ও গোলাপের চাহিদা বেশি থাকে। এজন্য দামও বেশি হয়। ফুলচাষি ও ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম বলেন, এবার আমি ১৫ বিঘা জমিতে রজনীগন্ধা, ডাবল রজনীগন্ধা (ভুট্টা) ও হাইব্রিড রজনীগন্ধা (উজ্জ্বল), গোলাপ, জারবেরা, গাঁদা এবং গ্লাডিওলাস চাষ করেছি। ইংরেজি নববর্ষে ব্যবসা হয়নি। বসন্ত উৎসব, ভালোবাসা দিবস এবং মহান শহীদ দিবসকে কেন্দ্র করে ৫ লাখ টাকার ফুল বিক্রির আশা করছি।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি ও গদখালি ফুল চাষি কল্যাণ সমিতির সাবেক সভাপতি আবদুর রহিম বলেন, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাব, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে বৃষ্টিপাতের কারণে ফুলের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এছাড়াও গোলাপ ক্ষেতে ভাইরাস লেগে উৎপাদনে ধস নেমেছে। চাহিদার তুলনায় গোলাপ মিলছে না। তিনি আরো বলেন, সারা দেশের প্রায় ৩০ লাখ মানুষের জীবিকা এই ফুলকে কন্দ্র করে। প্রায় ২০ হাজার কৃষক ফুলচাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে কেবল যশোরেই প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার ফুলচাষি রয়েছেন।

পিডিএসও/হেলাল