মাওয়ায় বিশাল কর্মযজ্ঞ

দেশের সর্বপ্রথম এক্সপ্রেসওয়ে হচ্ছে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক *সড়ক যোগাযোগে আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন

প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০১৯, ১০:০১

কাইয়ুম আহমেদ

পুরান ঢাকার নয়াবাজার ধরে বুড়িগঙ্গা দ্বিতীয় সেতু পার হলেই চোখ আটকে যাবে বিশাল কর্মযজ্ঞে। কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া চৌরাস্তা থেকে মাওয়া পদ্মা সেতু লিঙ্ক পর্যন্ত সড়ক উন্নয়নে অবিরাম কাজ চলছে অত্যাধুনিক সব যন্ত্রের সাহায্যে। ঈদুল আযহার ছুটির মধ্যেও ব্যস্ত শত শত শ্রমিকের হাত। কোথাও চলছে ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ, কোথাও-বা রেলওয়ে ওভারপাস, কোথাওবা নির্মাণ হচ্ছে ব্রিজ-কালভার্ট আবার কোথাও চলছে দুই লেনের সরু রাস্তাকে আট লেনে পরিণত করার কাজ। একই চিত্র ফুটে উঠবে ঢাকার দোলাইরপাড় থেকেও। মাওয়া পর্যন্ত এই কর্মযজ্ঞ স্বপ্নের পদ্মা সেতুকে ঘিরে। আর এটিই হচ্ছে বাংলাদেশের সর্বপ্রথম এক্সপ্রেসওয়ে।

গত শুক্রবার দিনভর ঢাকা থেকে মাওয়া পর্যন্ত ঘুরে উন্নয়নের এই কর্মযজ্ঞ দেখা দেখা গেছে। এ এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ শেষ হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশেষ করে ফরিদপুর, মাদারীপুর, বরিশাল, শরীয়তপুর, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, খুলনাসহ সংলগ্ন ২১ জেলাকে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে যুক্ত করবে। সড়ক যোগাযোগে আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সেতু চালু হলে এ সড়কের গুরুত্ব বহুলাংশে বেড়ে যাবে। তখন এই সেতুর প্রভাবে দক্ষিণবঙ্গের অর্থনীতি চাঙা হয়ে উঠবে। এর ফলে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার বাড়বে দেড় শতাংশ।

জানা গেছে, সড়কটি সম্পূর্ণ এক্সেস কন্ট্রোল, যে কারণে হাট-বাজার কিংবা ডান-বাম থেকে অন্য কোনো যানবাহন প্রবেশ করে যানজট সৃষ্টির কোনো সুযোগ থাকবে না। যে গাড়ি এ সড়কে প্রবেশ করবে, সে গাড়ি তার মতো করেই চলে যাবে এবং তা গড়ে ১২০ কিলোমিটার বেগে। এ সড়ক ব্যবহারকারীরা যাত্রাবাড়ী থেকে ৩৫ মিনিটে ৫৫ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় পৌঁছাতে পারবে। এ ছাড়া এ সড়কের বিভিন্ন জায়গায় রেলওয়ে ওভারপাস, ফ্লাইওভার, আন্ডারপাসসহ ব্রিজ-কালভার্ট, যেখানে যেভাবে যা করা দরকার—তাই করা হচ্ছে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে।

এদিকে শ্যামপুর থেকে মাওয়া হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ৫৫ কিলোমিটার সড়ক এক্সপ্রেসওয়েতে রূপ নিচ্ছে শিগগিরই। তার মধ্যে ঢাকা থেকে মাওয়া পর্যন্ত হচ্ছে ৩৫ কিলোমিটার। আর জাজিরা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার। যেখানে মূল সড়কে থাকবে চারটি লেন। সঙ্গে সড়কের দুই পাশে থাকবে সাড়ে ৫ মিটার করে (একেক পাশে দুই লেন করে) দুটি সার্ভিস লেন। আর নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর এ সড়কটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হলে ঢাকা থেকে মাত্র ৪২ মিনিটেই পৌঁছা যাবে প্রমত্তা পদ্মার ওপারে ফরিদপুরের ভাঙ্গায়। এরই মধ্যে এ প্রকল্পের সামগ্রিক কাজ প্রায় ৭০ শতাংশেরও বেশি শেষ।

ঢাকা থেকে মাওয়া পর্যন্ত ঘুরে দেখা গেছে, হানিফ ফ্লাইওভার থেকে নেমে যাত্রাবাড়ী-দোলাইরপাড় ও বুড়িগঙ্গা দ্বিতীয় সেতু পার হয়ে কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া থেকে চলছে ইন্টারসেকশন নির্মাণের কাজ। এখান থেকেই শুরু বিশাল এ প্রকল্পের কাজ। পোস্তগোলায় বুড়িগঙ্গা সেতু পার হওয়ার পর যত এগোনো যায়, ততই চোখে পড়ে বিদ্যমান সড়কের দুই পাশে নতুন সড়ক নির্মাণের কাজ। এরই মধ্যে পদ্মার ওপারে শরীয়তপুরের পাঁচ্চর থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত অংশের ভাঙ্গা এলাকার কাজ প্রায় শেষ। অন্যদিকে দোলাইরপাড় থেকে মাওয়া পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার সড়কের অনেক স্থানে বিভিন্ন ভাগে রাস্তার কাজও প্রায় শেষ। কোথাও চলছে রোলিংয়ের কাজ, কোথাও বা ম্যাকারডম ফেলা হয়েছে। আবার কোথাও কার্পেটিংয়ের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। আবার অনেক স্থানে রাস্তার জন্য ট্রাকে ট্রাকে মাটি ফেলা হচ্ছে।

দ্বিতীয় বুড়িগঙ্গা সেতু পার হয়ে কিছুদূর এগোলেই দেখা মিলবে চুনকুটিয়া চৌরাস্তায় নির্মাণ হচ্ছে ফ্লাইওভার। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শিগগিরই এ ফ্লাইওভারের কাজ তারা শেষ করতে চাচ্ছেন। এ জন্য দিনে-রাতে সহস্রাধিক শ্রমিক কাজ করছেন। এরই মধ্যে ফ্লাইওভারের গার্ডার বসানোর কাজ প্রায় শেষ। তারপর দেওয়া হবে ঢালাই।

এ ছাড়া জুরাইন, কুচিয়ামোড়া, শ্রীনগর ও আতাদিতে চারটি রেলওয়ে ওভারপাস নির্মাণের কাজও চলছে দ্রুতগতিতে। গ্রেট সেপারেটর হিসেবে ১৫টি আন্ডারপাস ও তিনটি ইন্টারচেঞ্জ নির্মাণ করা হবে। এগুলো হবে যাত্রাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়া ও ভাঙ্গায়।

এদিকে, মাওয়ায় পদ্মা সেতুর ৫টি স্প্যান বসানোর অপেক্ষায় রয়েছে। বর্ষা চলে গেলে স্প্যান বসানোর কাজ শুরু হবে। মাওয়ায় তৈরি রয়েছে আরো পাঁচটি স্প্যান। চলতি মাসের শেষদিকে মাওয়া ও জাজিরার মাঝামাঝি ২৪, ২৫ খুঁটিতে ১৫তম স্প্যানটি বসানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে তৈরি ৫টি স্প্যানই বসার সম্ভাবনা রয়েছে। সেতুটির ৪১টি স্প্যানের মধ্যে এ পর্যন্ত ১৪টি স্প্যান বসে গেছে। চীন থেকে মোট ২৭টি স্প্যান মাওয়ার কুমারভোগের বিশেষায়িত কারখানায় এসে পৌঁছেছে। বাকি স্প্যান চীনে তৈরি করে রাখা হয়েছে। শিগগিরই বাকি স্প্যানও মাওয়ায় পৌঁছাবে।

নড়াইল প্রতিনিধি জানান, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের আওতায় ঢাকা-যশোর-ভাঙ্গা রেললাইনের নড়াইল অংশের কাজ শুরু হয়েছে। দেশের বৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল, বাণিজ্যিক শহর নওয়াপাড়া, শিল্পাঞ্চল খুলনাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগে, এমনকি ভারতের পশ্চিম বাংলায় যাতায়াতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এ রেললাইন। এটি ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের একটি উপ-রুট।

প্রকল্প সূত্র জানায়, গত এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে রেললাইনের নড়াইল অংশের কাজ শুরু হয়েছে। ঢাকা থেকে নড়াইল হয়ে যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার জুড়ে চলছে রেললাইনের নির্মাণকাজ। রেললাইন নির্মাণের ঠিকাদারি কাজে রয়েছে চীনের ‘চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেড’। কাজ শেষের মেয়াদ ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এতে মোট রেলস্টেশন থাকবে ২০টি। এর মধ্যে ১৪টি নতুন রেলস্টেশন নির্মাণ করতে হবে। ব্রডগেজে রেললাইনে ৬৬টি বড় সেতু ও ২৪৪টি ছোট সেতু নির্মাণ করতে হবে। লেভেলক্রসিং গেট থাকবে ৩০টি। নয়টি জেলার ওপর দিয়ে এটি যাবে। ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ভাঙ্গা, নগরকান্দা, মুকসুদপুর, কাশিয়ানী, লোহাগড়া, নড়াইল ও জামদিয়া হয়ে যশোরের রুপদিয়ায় রেললাইনে মিশবে। এর মধ্যে ভাঙ্গা, কাশিয়ানী ও যশোরের পদ্মবিলায় রেলওয়ে জংশন হবে। নড়াইলের লোহাগড়া পৌর এলাকার নারানদিয়ায় ও নড়াইল পৌর এলাকার দুর্গাপুরে রেলস্টেশন হবে। ঢাকা থেকে লোহাগড়ার রেলস্টেশনের দূরত্ব হবে ১২৩ কিলোমিটার এবং নড়াইল রেলস্টেশনের দূরত্ব হবে ১৩৮ কিলোমিটার।

পিডিএসও/হেলাল