ভারী বর্ষণে কোমর পানি

চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসনে তোড়জোড়

প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০১৯, ১৩:০৩

মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামের দুঃখ কি? এক কথায় নগরীর যে কেউ জবাব দেবেন, জলাবদ্ধতা। গত ৮ জুলাই ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরীতে জমে থাকা পানি পরবর্তী সময়ে থেমে থেমে ভারী ও হালকা বর্ষণের মধ্যেও প্রায় সরেই গিয়েছিল। কিন্তু গত শুক্রবার রাত থেকে টানা বৃষ্টিতে গতকাল শনিবার আবারও নগরীর অধিকাংশ এলাকা ডুবে যায় কোমর সমান পানিতে। জমে যাওয়া বৃষ্টির পানি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সরাতে জোর তৎপরতা শুরু হয়েছে, জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চারটি টিম কাজ শুরু করেছে।

এ বিষয়ে প্রতিদিনের সংবাদের সঙ্গে শনিবার বিকালে আলাপকালে সেনাবাহিনীর জলাবদ্ধতা নিরসন মেগা প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. শাহ আলী বলেন, কাপাসগোলায় পানি জমে যাওয়ার কারণগুলো স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে খুঁজে দেখছি এবং চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি। আমরা কালক্ষেপণ না করে দ্রুতই ব্যবস্থা নিচ্ছি। তিনি আরো জানান,

এর আগে সকালের দিকে এরই মধ্যে আমাদের চারটি টিম সেকশনে ৪০ জন সেনাসদস্য সকাল থেকে ষোলশহর ২নং গেট, মুরাদপুর, প্রবর্তক মোড় এলাকায় গিয়ে পানি দ্রুত অপসারণে বাধাগুলো চিহ্নিত করেছি। তাৎক্ষণিক পানি সরানোর কাজ শুরু করেছি।

তিনি বলেন, আমরা গোটা শহর ঘুরে ঘুরে যেখানে পানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সেটা খতিয়ে দেখছি। চট্টগ্রামবাসীর জলাবদ্ধতার দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনর্খনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন শীর্ষক’ ৫ হাজার ৬১৬ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার টাকার এ মেগা প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। সিডিএ’র তত্ত্বাবধানে সেনাবাহিনী মেগা এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের মেয়াদকাল ধরা হয় ২০১৭ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২০ সালের ৩০ জুন।

এ প্রকল্পের অধীনে ৩৬টি খালের ওপর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং খালগুলো খননের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিন ধাপে খালগুলো খনন ও সংস্কার করা হবে। প্রথম দফায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ১৩টি খালের খননকাজ চলছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে ১০টি এবং শেষ পর্যায়ে বাকি খালগুলো থেকে মাটি উত্তোলন করা হবে। খাল খনন ও সংস্কারের পর প্রতিরোধ দেয়াল তৈরি করে খালের পাড়ে ১০ ফুট করে রাস্তা করা হবে। তিন বছর মেয়াদি এ প্রকল্পে প্রাথমিক পর্যায়ে ২০১৮ সালে ৩৬ খালের মাটি অপসারণসহ ৩০০ কিলোমিটার নতুন ড্রেন নির্মাণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় নতুন করে ১০০ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ, ২০২০ সালের মধ্যে নগরে ৩৬টি খাল খনন, খালের পাশে ১৭৬ কিলোমিটার প্রতিরোধক দেয়াল, ৮৫ কিলোমিটার সড়ক, ৪২টি সিল্ট ট্র্যাপসহ নানা অবকাঠামো নির্মাণ করার কথা রয়েছে।

এদিকে বর্ষার মাত্র কয়েক দিনের দ্বিতীয় দফার এ বৃষ্টিতে নগরীর বাসাবাড়ি, দোকানপাট, স্কুল-কলেজ অফিসে পানি ঢুকে পড়েছে। সীমাহীন দুর্ভোগে রয়েছেন নগরীর বাসিন্দারা। সাময়িক বন্ধ রয়েছে গণপরিবহন চলাচল।

চট্টগ্রামের পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ চৌধুরী প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত আগের দিন থেকে ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ৯৪ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আজও চট্টগ্রাম অঞ্চলের অধিকাংশ জায়গায় অস্থায়ী দমকা হাওয়া ও বজ্রসহ বৃষ্টি এবং ভারী ও অতি ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তিনি আজ রোববারের পর পরিস্থিতি উন্নতি হতে থাকবে আশা করছেন। এদিকে চট্টগ্রামে শনিবার ভাটা শুরু হয়েছে সকাল ১০টা ২৩ মিনিটে। জোয়ার শুরু হবে বিকেল ৪টা ৫৪ মিনিটে।

আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে কোমর পানি : গত শুক্রবারের বর্ষণে নগরীর আগ্রাবাদে স্থাপিত মা ও শিশু হাসপাতালের নিচতলায় কোমর পানি জমে যায়। হাসপাতালের শিশু বিকাশ কেন্দ্র জেনারেল ওয়ার্ড, বহির্বিভাগ ও প্রশাসনিক কার্যালয় বন্ধ করে দিতে হয়।

প্রবর্তক মোড় : নগরীর মেডিকেল কলেজসংলগ্ন নগরীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা প্রবর্তক মোড়ে সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটু থেকে কোমর পানিতে নিমজ্জিত হয়ে যায়। ওই এলাকায় নালার ওপর স্থাপন করা হয়েছে প্রিমিয়ার বিশ্বদ্যিালয়ের একটি ক্যাম্পাস। এর কারণে পানির প্রবাহে বাধার সৃষ্টি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শনিবার সকাল থেকেই নগরীর ওয়াসা, মেহেদিবাগ, অক্সিজেন মোড়, মুরাদপুর, ষোলশহর ২ নম্বর গেট, চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা, বহদ্দারহাট, বাদুরতলা, পাঁচলাইশ, শুলকবহর, কাপাসগোলা, কাতালগঞ্জ, আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, বাকলিয়া, হালিশহরসহ চট্টগ্রাম মহানগরীর একটা বড় অংশজুড়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে সকাল থেকে টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কেও পানি উঠেছে। বৃহত্তম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ, আসাদগঞ্জ ও চাক্তাই এলাকায় পেঁয়াজ, চাল-ডালের আড়ত, শুঁটকিপট্টি, তেলের দোকান, ভুষির আড়ত, মসলার বাজারের বেশ কিছু দোকানের মালামাল পানিতে ভিজে নষ্ট হয়েছে বলে জানা গেছে।

দুর্যোগ মোকাবিলায় ২৮৪টি মেডিকেল টিম : অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড় ও ভূমিধসজনিত সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় চট্টগ্রামে ২৮৪টি মেডিকেল টিম গঠন করেছে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়। সেখানে খোলা কন্ট্রোল রুমে ০৩১-৬৩৪৮৪৩ নম্বরে যোগাযোগের জন্য বলা হয়েছে। এছাড়া ২৮৪টি মেডিকেল টিমের স্বাস্থ্যকর্মী মাঠে দায়িত্ব পালন করছেন। সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী জানিয়েছেন, প্রত্যেক উপজেলায় পাঁচটি করে মোট ৭০টি, প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে ২০০টি, আরবান ডিসপেনসারি ও জেনারেল হাসপাতালসহ ২৮৪টি মেডিকেলে টিম কাজ করছে।

জবাবদিহিতার অভাবে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা : ক্যাব চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের কাজ শুরুর তিন বছর পার হলেও জবাবদিহিতার অভাবে সুফল মিলছে না দাবি করে বিবৃতি দিয়েছেন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগ ও মহানগর কমিটির নেতারা।

এর আগে সংবাদমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে তারা বলেন, সামান্য বৃষ্টিতে বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত চট্টগ্রাম পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত, বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পকলকারখানা, প্রধান সড়কগুলো তলিয়ে জনজীবন পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। অথচ সরকার এ যন্ত্রনা লাগবে অর্থ বরাদ্দ করলেও প্রকৃতপক্ষে জলাবদ্ধতা নিরসনে কিছু রাজনৈতিক বুলি, সভা সমাবেশ ও বিলবোর্ড, ফেস্টুন ছাড়া কিছুই অর্জন হয়নি। এজন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মধ্যে সমন্বয়হীনতা যেমন ছিল, তেমনি জবাবদিহিতার অভাবে অর্থ বরাদ্দের পরও প্রকল্পের আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি।

ক্যাবের বিবৃতিদাতা নেতারা হলেন, ক্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন, সাধারণ সম্পাদক কাজী ইকবাল বাহার ছাবেরী, যুগ্ম সম্পাদক আবু মোশারফ রাসেল, নগর সভাপতি জেসমিন সুলতানা পারু, সাধারণ সম্পাদক অজয় মিত্র শংকু, যুগ্ম সম্পাদক এ এম তৌহিদুল ইসলাম, দক্ষিণ জেলা সভাপতি আবদুল মান্নান।

নাগরিক উদ্যোগের সভায় উদ্বেগ :  শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সড়কটি যান ও জনগণের চলাচল প্রতিবন্ধকতামুক্ত রাখতে আহ্বান জানিয়েছেন ‘নাগরিক উদ্যোগের’ প্রধান উপদেষ্টা ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খোরশেদ আলম সুজন। গত শুক্রবার কার্যালয়ে নাগরিক উদ্যোগের এক জরুরি সভায় এ আহ্বান জানান তিনি।

এ সময় তিনি বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে পর্যবেক্ষণ করছি, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক সড়কটি যান ও জনগণের চলাচলের অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি কয়েক দিনের বৃষ্টিতে সে অবস্থা আরো মারাত্মক হয়ে উঠেছে যা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।

সুজন আরো বলেন, এযাবৎকালের সর্বোচ্চ বরাদ্দের পরেও নগরবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে যা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক।

নাগরিক উদ্যোগের উপদেষ্টা হাজী মো. ইলিয়াছের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আবদুর রহমান মিয়া, সাইদুর রহমান চৌধুরী, সংগঠনের সদস্য সচিব হাজী মো. হোসেনসহ নেতারা।

পিডিএসও/তাজ