বিচ্ছিন্ন বাবাদের অভয়াশ্রম ‘নিরাপদ বৃদ্ধাশ্রম’

প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০১৯, ১৭:৩০

ওয়ালি মাহমুদ সুমন, নীলফামারী

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে তিন ব্যক্তির উদ্যোগে গড়ে উঠেছে ‘নিরাপদ বৃদ্ধাশ্রম’। মাত্র এক বছরে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন এগার জনের ঠাঁই হয়েছে এখানে। 

চলছে নারীদের নিয়ে আলাদা একটি ইউনিট চালু করণেরও। এজন্য একটি বাড়ি ভাড়া নেয়ার প্রক্রিয়া চালাচ্ছেন উদ্যোক্তাগণ। ‘নিরাপদ বিদ্ধাশ্রম’ কিশোরগঞ্জ উপজেলা সদরের কিশোরগঞ্জ ইউনিয়নের কিশোরগঞ্জ সরকারী কলেজ সংলগ্ন(রুপালী কেশবা) এলাকায় গেল বছরের ১৮জুন যাত্রা শুরু করে। 

এটি গড়ে উঠে উপজেলার বড়ভিটা ইউনিয়নের বড়ভিটা সরকার পাড়া এলাকার কিটনাশক ব্যবসায়ী সাজেদুর রহমান সাজুর প্রচেষ্টায়। 
এরপর থেকে এটির সাথে যুক্ত হন পুটিমারী ইউনিয়নের ব্যবসায়ী আনিসুর রহমান এবং বড়ভিটা ইউনিয়নের স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা চাকুরি প্রত্যাশী মাসুদ আলম। তিনজনের সহযোগীতায় হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে এগিয়ে চলছে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অসহায় দরিদ্র বাবা-মাদের জন্য প্রতিষ্ঠিত জেলার একমাত্র বৃদ্ধাশ্রমটি। 

এটি পরিদর্শন করেছেন নীলফামারী-৪ আসনের প্রাক্তন সংসদ সদস্য শওকত চৌধুরী, নীলফামারীর সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক বেগম নাজিয়া শিরিন, প্রাক্তন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রশিদুল আলম চৌধুরী এবং বর্তমান উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শাহ আবুল কালাম বারী পাইলট, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ। 

সরেজমিনে দেখা গেছে, ১০শতাংশ জমির উপর টিনশেড বাড়ির চারটি কক্ষে বসবাস করছেন ১১জন অসহায় বাবা। কিশোরগঞ্জ উপজেলার দশজন হলেও একজন পার্শ্ববর্তী উপজেলা সৈয়দপুরের। 

এখানে যারা নিবাসী হয়েছেন তারা সবাই অতিদরিদ্র সহায় সম্বলহীন এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। ছেলে বা সন্তানরাও খোঁজ রাখেন না তাদের।
বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে রয়েছেন বড়ভিটা ইউনিয়নের উত্তর বড়ভিটা এমপি পাড়ার আব্দুল কাফি। বয়স ৭৮। ১ ছেলে ১ মেয়ে রয়েছে তার। মেয়ের বিয়ে হলেও ছেলে জীবীকা নির্বাহ করে রিকসা চালিয়ে। 

ছেলে খবর রাখেন না বাবা কাফির। কি ভাবে খান, কি করেন কোথায় বা থাকেন তারও খোঁজ নেন না ছেলে কিংবা ছেলের পরিবার। এর ওর বাড়িতে গিয়ে দু’বেলা খেয়ে বেচেঁ ছিলেন তিনি। 

এরই মধ্যে পরিচয় হয় সাজেদুর রহমান সাজুর সাথে। কষ্টের কথা শুনে তার ঠাঁই হয় ‘নিরাপদ বৃদ্ধাশ্রম’ এ। 

আব্দুল কাফি বলেন, অভাবের সংসার ছিলো আমার। ছেলেকে মানুষ করে উপার্জন করা শিখালাম। খবর রাখে না কিভাবে খাচ্ছি, কোথায় থাকি। কিছু খোঁজ নেয় না। এখানে ঠাঁই হয়ে অনেক ভালো হয়েছে। ভালোভাবে দিন কাটাতে পারছি। তিন বেলা খেতে পারছি।

একই এলাকার সুলতান আলী(৮০)। বড়ভিটা ইউনিয়নের জহুরহাজী পাড়ার বাসিন্দা। দিনমজুর দুই ছেলে উপার্জন করলেও পিতাকে নিয়ে থাকেন না। অন্যের জমিতে বাস করেন ছেলেরা। 

নিজের ঠিকানা খুঁজে নিয়েছেন সুলতান বৃদ্ধাশ্রমে। তিনি বলেন, এখানে আসার এক বছর হলো কেউ খবর নেয়নি আমার। কি ছেলে কি মেয়ে। 
ছেলে মেয়ের জন্মদাতা বাবা আমি। আজ বৃদ্ধাশ্রমে আমার বসবাস। বাকি জীবনটা যেন এখানে ভালোভাবে থাকতে পারি। 

অপর নিবাসী মতিয়ার রহমান বলেন, সারাদিনে আমরা বিভিন্ন কাজ করে থাকি এখানে। কেউবা শাকসবজির পরিচর্যা, কেউবা কবুতরের খেয়াল রাখা, কেউবা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় সহযোগীতা করে থাকি। 

এছাড়া পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ একসাথে আদায় করে থাকি এখানেই। বাকিটা সময় ইবাদত বন্দেগি করে কাটে। 

উদ্যোক্তা আনিসুর রহমান বলেন, নিবাসীদের তিনবেলা খাওয়ার জন্য একজন মহিলা নিয়োজিত রয়েছেন। তিনিও অসহায়, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। থাকেন প্রক্রিয়াধীন নারী ইউনিটে দু’জন মিলে। রান্নার কাজটি তিনিই সারেন স্ব-ইচ্ছায়।  

তিনি বলেন, দৈনিক এখানে খরচ এক হাজার টাকারও বেশি। স্থানীয়ভাবে কেউবা চাল, কেউবা ডাল, কেউবা তেল দিয়ে সহযোগীতা করছেন নিবাসীদের খাওয়ার জন্য। 

একটি উন্নয়ন সংস্থা বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য দুটি টিউবওয়েল এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর একটি স্যানিটারি ল্যাট্রিন করে দিয়েছে।
উদ্যোক্তা সাজেদুর রহমান সাজু বলেন, ভারতের সংগীত শিল্পী নচিকেতার সেই বিখ্যাত গাণ ‘বৃদ্ধাশ্রম’ এ অনুপ্রাণিত হয়ে প্রতিষ্ঠানটি গড়ার পরিকল্পনা নিই। 
শুরুও করলাম গেল বছর। আমাকে সাহস ও শক্তি জুগিয়েছেন অনেকে। বিশেষ করে ইউএনও আবুল কালাম আজাদ মহোদয়। তার পরামর্শ আমাকে এগিয়ে নিচ্ছে তিল তিল করে। 

ইতোমধ্যে সরকারীভাবে চাল দেয়া হয়েছে, বিদায়ী জেলা প্রশাসক পরিদর্শন করে কম্বল, শাড়ি আর নগদ টাকা দিয়েছেন নিবাসীদের। 
প্রতিষ্ঠানটি আমি দাঁড় করাতে চাই। সবার সহযোগীতা চাই যেন অসহায় দরিদ্র সন্তান পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষদের এখানে ঠাঁই হয়। তাদের যেন আমি সেবা করতে পারি। 

তিনি বলেন, নারীদের জন্য একটি ইউনিট করার উদ্যোগ নিয়েছি। দু’জন মহিলাকে পেয়েছি। তারা থাকতে চান। সহযোগীতাও করছেন। 
পার্শ্ববর্তী একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে সেখানে মহিলা ইউনিট করার প্রক্রিয়া করছি। 

উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শাহ আবুল কালাম বারী পাইলট বলেন, মহৎ একটি উদ্যোগ নিয়েছেন স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি। আমি এটির সফলতা কামনা করি। এখানে যারা থাকবেন তাদের সাধ্য অনুযায়ী সহযোগীতার জন্য হাত বাড়াবো। প্রতিষ্ঠানটি যাতে সুনামের সাথে চলতে পারে এদিকেও খেয়াল রাখবো। 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা(ইউএনও) আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করেছে কিছুদিন হলো। সেখানে যারা রয়েছেন সবাই অসহায় হতদরিদ্র মানুষ। সহায় সম্বলহীন। 

সরকারের সহযোগীতা এবং উপজেলা প্রশাসন থেকে সার্বিকভাবে সহযোগীতা করা হবে ‘নিরাপদ বৃদ্ধাশ্রম’ কে। ইতোমধ্যে কিছু করাও হয়েছে সেখানে। 

সমাজ সেবা অধিদপ্তর নীলফামারী জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক ইমাম হাসিম বলেন, এটি একটি মহতী উদ্যোগ হয়েছে। যারা করেছেন তাদেরকে স্বাধুবাদ জানাই। সমাজ সেবা বিভাগের যতটুকু সহযোগীতা রয়েছে সেখানে করবো নিশ্চয়ই। 

পিডিএসও/রি.মা