দেশের প্রথম লোহার খনি আবিষ্কার

প্রকাশ : ১৮ জুন ২০১৯, ১৯:৪৬ | আপডেট : ১৯ জুন ২০১৯, ১৯:০৫

মো. নূর ইসলাম নয়ন, দিনাজপুর

এক লোহার খনিতেই পাল্টে যেতে চলেছে দিনাজপুরের অজপাড়াগাঁয়ের বাসিন্দাদের জীবনমান। দেশের উত্তরাঞ্চলের এই জেলার হাকিমপুরের এক গ্রাম ইসবপুর। এই গ্রামেই খোঁজ মিলল লোহার আকরিকের (ম্যাগনেটাইট) খনি। এটি আবিষ্কার করেছে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর (জিএসবি)। দুই মাসের খনন শেষে অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এই সুখবর এলো।

এদিকে নিজেদের গ্রামে লোহার খনি আবিষ্কারে আশার আলো ফুটে উঠেছে ইসবপুরের বাসিন্দাদের চোখেমুখে। তারা বলছেন, এখান থেকে লোহা উত্তোলন করা হলে মানুষের জীবনমান পাল্টে যাবে। কর্মসংস্থান হবে।

খনির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে গত ১৯ এপ্রিল দিনাজপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য শিবলী সাদিক খনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরের ২২ সদস্যের একটি দল এই খনন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মঙ্গলবার এসব তথ্য সাংবাদিকদের জানালেন জিএসবির কর্মকর্তারা।

তারা জানান, ভূপৃষ্ঠের এত কাছে লোহার খনি আবিষ্কার দেশে এটাই প্রথম এবং বিশ্বের মধ্যেও প্রথম ১০টির একটি। প্রথম পর্যায়ে এখান থেকে লোহা ও চুম্বকজাতীয় পদার্থ পাওয়া গেছে, যা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য জয়পুরহাট পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে।

এলাকাবাসী মনে করছেন, সীমান্ত এলাকায় কারখানা না থাকায় এখানকার বেশির ভাগ মানুষ বেকার। খনন কাজ শুরু হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। পাশাপাশি দেশও অনেকটা এগিয়ে যাবে বলে মনে করছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। দেশে এ-ই প্রথম লোহার খনির সন্ধান পাওয়ায় এর মাধ্যমে দেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনেরা।

দিনাজপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য শিবলী সাদিক বলেন, আমাদের মাটির নিচে যে সম্পদটুকু রয়েছে সেটাকে যথাযথ ব্যবহারের জন্য আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারা দেশে জরিপের নির্দেশনা দিয়েছেন। তারই নির্দেশনায় গ্যাস, কয়লা ও পাথরসহ বিভিন্ন সম্পদের জন্য খনন চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর ইসবপুর গ্রামে খনন চালায়।

তিনি আরো বলেন, এরই মধ্যে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ ও হাকিমপুর উপজেলার এক অংশ নিয়ে আমরা দিঘিপাড়া কয়লার খনি পেয়েছি। আশা করছি, এখানে খনি হলে দেশের অগ্রগতির পাশাপাশি এলাকাবাসীর জীবনমানেরও উন্নয়ন হবে।

সম্প্রতি খনন কাজ পরিদর্শন করে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরের মহাপরিচালক জিল্লুর রহমান চৌধুরী জানান, এর আগে হাকিমপুরের মুর্শিদপুর গ্রামে কিছু কাজ করা হয়েছিল। সেই কাজের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে আবারও খনন করা হয়।

তিনি আরো বলেন, এ পর্যন্ত খনন করে এখানে যা পেয়েছি সেগুলো আমরা ল্যাবরেটরিতে বিশ্লেষণ করছি। জয়পুরহাটে বিসিএসআইআরের একটি প্রতিষ্ঠান আছে, সেখানে আমরা প্রাথমিক পর্যায়ে যে নমুনাগুলো পেয়েছিলাম সেগুলো টেস্ট করেছি। সেই ফল আমাদের কাছে এখনো আসেনি। এর নিচে গিয়ে আমরা যা পেয়েছি, তা আপাতদৃষ্টিতে অনেক ভালো। এখানে আরো ভালো কিছু পাওয়ার আশা করছি।

ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরের পরিচালক সাইদুল হোসেন জানান, গত ১৯ এপ্রিল এই কাজ শুরু হয়েছে, এটি তিন-চার মাস ধরে চলবে। আমরা এখানে খনন কার্যক্রমে নিচ থেকে কাদা, বালি বা আদি শিলার সব নমুনা সংগ্রহ করছি। সেগুলো সংগ্রহ করে আমরা আমাদের পেশাগত জ্ঞান দিয়ে অ্যানালাইসিস করছি। এ পর্যন্ত আমরা ১ হাজার ৫০৩ ফুট নিচ পর্যন্ত খনন চালিয়েছি ও এখনো চলছে। সবকিছু মিলিয়ে এখানে এখন পর্যন্ত আমরা যা পেয়েছি তাতে এখানে ভালো কিছু পাওয়া যাবে বলে সংকেত পাচ্ছি।

জিএসবির উপ-পরিচালক মোহাম্মদ মাসুম জানান, বিশ্বের যে কয়েকটি দেশে লোহার খনি আবিষ্কার করা হয়েছে, সেসব খনির লোহার মান ৫০ শতাংশের নিচে। আর বাংলাদেশের লোহার ৬৫ শতাংশের ওপরে। ইসবপুরে লোহার খনি আবিষ্কার দেশে এটিই প্রথম। যার ব্যাপ্তি রয়েছে ৬ থেকে ১০ স্কয়ার কিলোমিটার পর্যন্ত।

এখানে কপার, নিকেল ও ক্রনিয়ামেরও উপস্থিতি রয়েছে। ১ হাজার ১৫০ ফুট গভীরতায় চুনাপাথরের সন্ধানও মিলেছে। আর ১ হাজার ৫০৩ ফুট খনন করে লোহার খনির খোঁজ মিলেছে। সেখানে প্রায় ৪০০ ফুট পুরুত্বের লোহার আকরিকের স্তরটি পাওয়া গেছে। এ অঞ্চলে ৬০ কোটি বছর আগে সমুদ্র ছিল। সেই কারণে এখানে জমাট বাঁধা আদি শিলার ভেতরে লোহার আকরিকের সন্ধান পাওয়া গেছে।

পিডিএসও/তাজ