নতুন রঙের প্রলেপে নৌপথে মৃত্যুফাঁদ!

প্রকাশ : ২২ মে ২০১৯, ১৪:৩৮ | আপডেট : ২২ মে ২০১৯, ১৫:০৪

নিজস্ব প্রতিবেদক ও মো. লিটন খান, কেরানীগঞ্জ

রঙের প্রলেপ আর ওয়েল্ডিংয়ের আগুনের ফুলকি— এমন তাড়ায় ব্যস্ত ডকইয়ার্ডের শ্রমিকরা। আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে ঘরমুখো যাত্রী বহনে পুরোনো লঞ্চ মেরামতেই তাদের ব্যস্ততা।

ফিটনেসবিহীন লঞ্চে জোড়াতালি ও রঙের প্রলেপের আড়ালে লুকিয়ে আছে নৌপথে ভয়ঙ্কর মৃত্যুফাঁদ। এই চিত্র ঢাকার কেরানীগঞ্জের ডকইয়ার্ডগুলোতে। প্রতিদিন ঢাকার সদরঘাট থেকে দক্ষিণাঞ্চলের ৪৫ রুটে নিয়মিত কয়েক হাজার যাত্রী লঞ্চে যাতায়াত করেন। ঈদ এলে এই যাত্রীর সংখ্যা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। আর এই বাড়তি যাত্রীর চাপ সামলাতে লঞ্চ মালিকদের হিমশিম খেতে হয়। তাই তারা ফিটনেসহীন লক্কড় ঝক্কড় লঞ্চগুলোকে ধুয়ে মুছে রং করে যাতায়াতের উপযোগী করার চেষ্টা করে।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের চর মিরের বাগ, চর কালীগঞ্জ, তেলঘাট এলাকায় অবস্থিত লাকী ডকইয়ার্ড, পারজোয়ার ডকইয়ার্ড, শাকিলডকইয়ার্ড, সাগর ডকইয়ার্ড, সিটি ডকইয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, প্রায় লঞ্চ মেরামতে ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। বেশিরভাগ লঞ্চগুলোতেই চলছে রং ও মেরামতের কাজ। ঈদে যাত্রীদের বাড়তি চাপ সামলাতে ও বেশি লাভের আশায় অসাধু লঞ্চ মালিকরা চলাচলের অনুপযোগী লঞ্চগুলো সংস্কার করে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় যাত্রী পরিবহন করে। যার কারণে প্রায় সময়ই ঘটে নৌ দুর্ঘটনা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্তৃপক্ষের নজরদারি না থাকায় ঝুঁকির মুখে সাধারণের জীবন। তাই এখনই এদিকে নজরদারি বড়ানো প্রয়োজন। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের দাবি, ফিটনেসবিহীন লঞ্চ চলাচল এবং অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন তারা। এ বিষয়ে অকপটেই স্বীকার করে ডকইয়ার্ডের ঠিকাদাররা বলছেন, ঈদের সময় অসাধু ব্যবসায়ীরা অনিয়ম করে থাকলেও ডকইয়ার্ডের সংশ্লিষ্টরা সতর্ক থাকায় এর মাত্রা কমে এসেছে অনেকটা।

ঢাকা সি বিল্ডার্স গ্রুপের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আবদুল সোবহান বলেন, টুকিটাকি ২-১টা লঞ্চে মালিকরা সুযোগে সদ্ব্যবহার করে। কম পয়সা দিয়ে কাজ করাবে। অনুমোদন ছাড়া কাজ করাবে। সরকারি লোকজনের এসব দিক তদারকি করা উচিত। ঝড়ের মৌসুম হওয়ায় দুর্ঘটনার শঙ্কা রয়েছে, তাই কর্তৃপক্ষের কার্যকরী ভূমিকা খুব জরুরি বলে মনে করছেন নৌপথের দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টরা।

বুয়েটের এ আর আই প্রভাষক মো. ইমরান উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশে এত কম সংখ্যক সার্ভেয়ার আছে যা দিয়ে আসলে এত সংখ্যক নৌযানকে সার্টিফিকেট দেওয়া সম্ভব হয় না। অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ বলছে, যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে যেকোনো অনিয়মের বিপরীতে জিরো টলারেন্সে আছেন তারা।

বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান কমডোর এম মাহবুব উল ইসলাম বলেন, ফিটনেস ছাড়া আমরা কোনো লঞ্চ চলাচল করতে দেব না। এছাড়াও অতিরিক্ত যাত্রী যেন না হয় সেদিকেও আমাদের অন্য সংস্থা নজরদারি করবে। ঈদের সময় তাড়াহুড়ো করে অতিরিক্ত যাত্রী না হয়ে লঞ্চে না ওঠার পাশাপাশি যাত্রীদেরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এই কর্মকর্তা।

পারাবত-২ এর মাস্টার আক্তার হোসেন ও সুপারভাইজার মোখলেসুর রহমান জোর দাবি করে জানান, তাদের কোম্পানিতে ত্রুটিপূর্ণ লঞ্চ নেই। তবে অসাধু লঞ্চ ব্যবসায়ী ঈদ এলে ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চ নদীতে নামায়। ইয়াদ-১ লঞ্চের ম্যানেজার মনির জানান, যাত্রীরা সব সময়ই একটু নতুন লঞ্চে যাতায়াত করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তাই আমরা ঈদ এলে যাত্রীদের আকর্ষণের জন্য লঞ্চগুলো রং তুলি ও মেরামতের কাজ করাই।

বাংলাদেশ নৌ দুর্ঘটনা প্রতিরোধ কমিটির মহাসচিব ও সদরঘাট তেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জি এম সারোয়ার বলেন জাহাজের নকশা অনুমোদন, সার্ভে ও রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট প্রদান, লঞ্চে যাত্রী বোঝাই, যাত্রীবাহী নৌ যানের চলাচলের অনুমতি প্রদান ও চলাচল নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগের দুর্বলতার কারণে লক্কড়ঝক্কড় লঞ্চে রঙ-কালি করে অবৈধ ব্যবসায়ীরা পার পেয়ে যায়।

তিনি বলেন, একটি লঞ্চ সার্ভে করতে এক বছর সময় লাগে। সময় বাঁচানোর জন্য তড়িঘড়ি করে লক্কড়ঝক্কড় লঞ্চে মেরামত ও রং করে পুরোনো সার্ভে দেখিয়ে ঈদের সময় লঞ্চ চালু করে। প্রতি বছর শিপিং কর্তৃপক্ষ লঞ্চের ফিটনেস পরীক্ষা করে সার্ভে সনদ দিলে এবং নৌ ট্রাফিক পুলিশ যাত্রী ধারণক্ষমতা নির্ধারণ করে দিলে নৌ দুর্ঘটনা এড়ানো যায়।

পিডিএসও/তাজ