অবৈধ পণ্যে জমজমাট চট্টগ্রামের ঈদবাজার

পাচার হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা

প্রকাশ : ২০ মে ২০১৯, ১৪:৫৭

তাজুল ইসলাম পলাশ, চট্টগ্রাম ব্যুরো

শুল্ক ফাঁকি দিয়ে চোরাই পথে আসা অবৈধ পণ্যে জমজমাট এখন চট্টগ্রামের ঈদবাজার। নগরীর নামিদামি শপিংমল এখন ভারতীয় পণ্যের দখলে। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে নিয়ে আসা এসব পণ্যের আগ্রাসনে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশীয় শিল্প। সরকার হারাচ্ছে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব। ভারতীয় কাপড়ের উপর ক্রেতাদের চাহিদা বেশি থাকার কারণে ব্যবসায়ীরাও মওকা বুঝে আমাদানি করছে কোটি টাকার পণ্য। এসব পোশাকের চাহিদা ও লাভ অনেক বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা এসব পণ্য মজুদ ও বিক্রিতে বেশি আগ্রহী।

লাখ টাকা দামের শাড়ি, লেহেঙ্গা, থ্রিপিস, শার্ট, প্যান্ট, পাঞ্জাবি, জুতা, সেন্ডেল প্রকাশ্যে বিক্রি হলেও প্রশাসেনর পক্ষ থেকে নেওয়া হচ্ছে না কোনো ব্যবস্থা। গত বছর কয়েকবার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। অনেক নামিদামি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানাও করা হয়। কিন্তু এ বছর এখনো পর্যন্ত কোনো অভিযান হয়নি। ফলে চোরাইপথে ব্যবসায়ীরা দেদারছে আমদানি করছে বিদেশি পণ্য।

অভিযোগ রয়েছে, অনেক সময় চোরাকারবারিরাই উদ্যোগী হয়ে একটা দুইটা চালান ধরিয়ে দেয়। আর তার ফাঁক ফুকড় দিয়ে গলে চলে আসছে বড় চালানগুলো। দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকায়, বাসে, ট্রাকে বিভিন্ন পরিবহনে নগরী হয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাচার হচ্ছে এসব কাপড়। নগরীর বিভিন্ন শপিং মল ও মার্কেটের ব্যবসায়ীদের সাথে কথা হলে তারা জানান, ভারতীয় কাপড়ের প্রতি ক্রেতাদের চাহিদা বেশি। আর এ ব্যবসায় লাভজনকও বেশি।

দেখা গেছে, সব দোকানের ৮০ ভাগই কাপড় ভারতের। কোন কাস্টমার দোকানে গেলেই তারা প্রথমে ভারতীয় কাপড়ের বান্ডেল বের করে দেয়। আর ক্রেতারাও প্রথমে দোকানিদের ইন্ডিয়ান কাপড় আছে কিনা জনতে চায়। এ চিত্র বিরাজ করছে এখন চট্টগ্রাম শহরের শপিং মলগুলোতে। খোদ ব্যবাসায়ীরা অকপটে স্বীকার করলেন, অবৈধ পথে আসা কাপড়ের কথা, তারা জানান, ইন্টারনেটের মাধ্যমে কাপড় পছন্দ করা হয়। তারপর অর্ডার। এসব টাকা পরিশোধ করা হচ্ছে হুন্ডিতে। এভাবে দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। তারা বলছেন, চোরাই পণ্য বিক্রিতে লাভ বেশি। শুল্ক ছাড়া এসব পণ্যের বাজার মূল্য অনেক কম থাকে। এ কারণে ভারতীয় পণ্যের কাছে মূল্য ও মানে অনেক দেশীয় পণ্য মার খাচ্ছে। এ ছাড়া বৈধ পথে আমদানিকারকরাও এতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। বেশি লাভজনক হওয়ায় বৈধ আমদানির চেয়ে অবৈধ আমদানির দিকেই ঝুঁকছেন তারা।

নাম জানাতে অনিশ্চুক টেরিবাজারের একটি স্বনামধন্য শপিং মলের স্বত্ত্বাধিকারি জানান, ভারতে গিয়ে কাপড় পছন্দ করে অগ্রিম দিয়ে চলে আসি। আসার দুই তিন দিনের মধ্যে আমাদের কাছে চলে আসছে কাপড়গুলো। এক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা ব্যবসায়ী, ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী কাপড় তুলতে হচ্ছে। ক্রেতাদের ভারতীয় কাপড়ের চাহিদা বেশি। তাছাড়া এসব কাপড়ের ব্যবসা অনেক লাভজনক।

সরেজমিনে গিয়ে নগরীর বিপণি বিতানগুলো ঘুরে দেখা গেছে, সব দোকানের কর্মচারীদের মুখে ভারতীয় কাপড়ের কথা। চট্টগ্রামের নিউ মার্কেটের বিপণি বিতান, জিইস মোড়ের সানমার ওসান সিটি, সেন্ট্রাল প্লাজা, টেরিবাজারের, সানা, মনে রেখো, বৈঠক বাজার, মেগা মার্ট এবং রিয়াজ উদ্দিন বাজারের পরিচিত শো-রুমগুলোতে ভারতীয় কাপড়ে ঠাসা। ক্রেতাদের চাহিদাও ভারতীয় কাপড়ের প্রতি।

আশিকুর রহমান সুজন নামের একজন ক্রেতা জানান, মনে রেখ থেকে একটি ভারতীয় শাড়ি কিনেছি, দাম একটি বেশি হলেও ব্যতিক্রম। তেমনি অনেক ক্রেতাদের সাথে কথা হলে তারা জানান, ভারতীয় কাপড়ের মান আলাদা। একটা নতুনত্ত্ব থাকে। চাহিদামতো পাওয়া যায়। দাম একটু বেশি হলেও পছন্দ মতো পাওয়া যায়।

নাম জানাতে অনিশ্চুক শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের একজন রাজস্ব কর্মকর্তা জানান, অভিযোগ পেলে অভিযান পরিচালনা করা হবে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রামের বড় ব্যবসায়ীরা নিজেদের অবৈধ পথে আনা বড় চালানগুলো বাচানোর জন্য ছোটখাটো কিছু কাপড়ের চালান নিজেরাই ধরিয়ে দেয়। আর এসুযোগে বড় চালানগুলো পৌঁছে যায় নির্দিষ্ট গন্তব্যে। আর এসব চালানের পণ্যগুলো নিমিষেই হজম হয়ে যায় চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় কাপড়ের পাইকারি বাজার নামে খ্যাত রিয়াজ উদ্দিন বাজারে। যাদের রয়েছে বিশাল একটি সিন্ডিকেট। ঈদকে সামনে রেখে এ সিন্ডিকেট দুই তিন মাস আগে থেকে প্রশাসন ও থানার পদস্থ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে কোটি কোটি টাকার ভারতীয় শাড়ি নিয়ে আসছে চট্টগ্রামে। শুধু রিয়াজ উদ্দিন বাজার নয়, নগরীর তামাকুন্ডি লেইন, টেরি বাজারসহ নামিদামি বিপণি বিতানের একটি চক্রের মাধ্যমে সাপ্লাই হচ্ছে অবৈধ পথে আসা আমদানিকৃত এসব পণ্য।

এ প্রসঙ্গে নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আমেনা বেগম, জানান, ভারতীয় পণ্যের অবৈধ আমদানির কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশীয় শিল্পোৎপাদন। অবৈধ পথে আমদানিকারকদের শুল্ক পরিশোধ করতে হয় না। তিনি বলেন, বাংলাদেশি সিন্ডিকেটের সাথে ভারতীয় সিন্ডিকেটও জড়িত রয়েছে। আমরা প্রতিনিযত মনিটরিং করছি।

পিডিএসও/হেলাল