হালদায় ২ বছরে ২১ ডলফিনের মৃত্যু

প্রকাশ | ১৮ এপ্রিল ২০১৯, ১৩:০২

তাজুল ইসলাম পলাশ, চট্টগ্রাম

দক্ষিণ এশিয়ায় মাছের একমাত্র প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র হালদায় প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠা মিঠা পানির কাতল, রুই ও কার্পু জাতীয় মা মাছের পাশাপাশি ছিল ডলফিনের অবাধ বিচরণ। স্থানীয়রা বলছেন, এক সময় হালদায় ডলফিন দেখা যেত প্রচুর। অবাধে দল বেঁধে চলাচল করত। কিন্তু সেই অভয়ারণ্য আর থাকছে না, প্রতি বছর নদীতে মৃত অবস্থায় ভেসে উঠছে এই জলজ প্রাণীটি।

সবচেয়ে বেশি ডলফিনের মৃত্যু হয়েছে ২০১৭ সালে। ওই বছর চার মাসে ব্যবধানে ১৬ ডলফিনের মৃত্যু হয়েছিল। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার বিকেলে ভেসে উঠে একটি মরা ডলফিন। হালদায় গত দুই বছরে ২১টি ডলফিনের মৃত্যু হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে একের পর এক ডলফিন মারা গেলেও প্রশাসনিকভাবে নেওয়া হয়নি কোনো পদক্ষেপ। হুমকির মুখে পড়েছে হালদার জীববৈচিত্র্য।

হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরীয়া প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, আঘাতের ধরন দেখে মনে হয়েছে, ড্রেজারের আঘাতে ডলফিনটির মৃত্যু হয়েছে। হালদায় ড্রেজার চলাচল নিষিদ্ধ হলেও তা মানা হচ্ছে না। কারণ ডলফিনটির শরীরের মাঝ বরাবর প্রায় দ্বিখন্ডিত হয়ে গেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১০ সালে চট্টগ্রামের নজিরহাট থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত নদীর প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকাকে জলজ প্রাণীর অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সরকারের এই ঘোষণা অগ্রাহ্য করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও রাতের আঁধারে চলে মাছ ধরার প্রতিযোগিতা চলে।

মদুনাঘাট ব্রিজ থেকে উত্তরে এবং দক্ষিণে বিশাল এলাকাজুড়ে ভারি ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। আর সেই বালু ইঞ্জিনচালিত নৌযানে পরিবহন করায় ডলফিনের বিচরণ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে। শুধু ডলফিন নয় মারা পড়ছে রুই, কাতাল, মৃগেলসহ বিভিন্ন প্রজাতির মিঠা পানির মাছ। সর্বশেষ গত ৯ এপ্রিল মঙ্গলবার দুপুরে হাটহাজারী উপজেলার খলিফার ঘোনা এলাকায় হালদা নদীতে ৮ কেজি ওজনের একটি মৃগেল মাছ ভেসে উঠে।

অনুসন্ধান আরো বলছে, হালদা ও কর্ণফুলীর সংযোগে থাকা বন্দর কর্তৃপক্ষের মালিকানাধীন চর থেকে এখনো ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। এসব বালু পরিবহন করা হচ্ছে হালদার নদীর মুখ হয়ে কালুরঘাটের দিকে। মোহরা এলাকার জনসাধারণ জানাচ্ছে, হালদায় বালুবাহী নৌযানের উৎপাত বন্ধে এলাকার মানুষ সোচ্চার হচ্ছে। গত মঙ্গলবার কয়েকটি নৌযান তারা নদীর কিনারায় বালু নিয়ে ভিড়তে দেয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নীরবতার কারণে মৎস্য প্রজননের এই সময়েও বালুবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ হয়নি।

মৎস্যজীবী ও বিশেষজ্ঞদের মতে, হালদার ডলফিন হলো গাঙ্গেয় প্রজাতির। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) গাঙ্গেয় ডলফিনকে লাল তালিকায় রেখেছেন বিপন্ন হিসেবে। এই প্রজাতির ডলফিন বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের নদীতে দেখা যায়।

জানা যায়, ২০১৮ সালের ১ ফেরুয়ারি হাটহাজারি উপজেলার উত্তর মাদার্শা এলাকা থেকে একটি মৃত ডলফিন উদ্ধার করা হয়। এক সপ্তাহের ব্যবধানে আরো একটি মরা ডলফিন পাওয়া যায়। এর আগে ৩ জানুয়ারি গড়দুয়ার স্লুইস গেট এলাকা থেকে আরেকটি মৃত ডলফিন উদ্ধার করা হয়। ২০১৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে জানুয়ারি ২০ পর্যন্ত সাড়ে চার মাসে ১৬টি ডলফিন মারা গেছে। ওই বছরের জানুয়ারিতে মাত্র ২৫ দিনের ব্যবধানে চারটি ডলফিন মারা যায়। প্রতিটি ডলফিনের শরীরে ক্ষতের চিহ্ন ছিল। মৃত ডলফিনগুলো রাউজানের ছত্তার খালের মুখ থেকে হাটহাজারী উপজেলার মদুনাঘাট পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকার মধ্যেই পাওয়া গেছে।

ইঞ্জিনচালিত প্রপেলারের আঘাতে ডলফিনের মৃত্যুর কারণ বলেন মনজুরুল কিবরিয়া। তিনি বলেন, শুধু ডলফিন নয় ওই প্রপেলারের আঘাতে ছোট বড় অসংখ্য মাছ মারা পড়ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ডলফিন তো খাওয়ার মাছ নয়, স্বাভাবিকভাবে ধরে নিতে হতে আঘাতের কারণে মারা যাচ্ছে। মৎসজীবী ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলফিন মারা যাওয়ার এ চিত্র ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’।

এদিকে, হালদার ডলফিন মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে জেলা মৎস্য অফিসের কর্মকর্তারাও মাঠে নেমেছেন। হাটহাজারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আজহারুল ইসলাম জানান, যেসব ডলফিন মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে সেগুলোর ওজন ৮০ থেকে ১০০ কেজি। তবে মঙ্গলবার যে ডলফিনটি উদ্ধার করা হয়েছে সেটি অপ্রাপ্ত বয়স্ক।

এদিকে চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য অফিস সূত্র বলছে, পানি অপরিষ্করের কারণে, পর্যাপ্ত অক্সিজেনের কারণে ডলফিন মারা যাচ্ছে। ড্রেজারের মাধ্যমে ডলফিন মারা যাওয়ার বিষয়টি মানতে রাজি নন তারা। তারা বলছেন, ডলফিন চোখে দেখে না। তারা সাউন্ডের মাধ্যমে চলাচল করে। সেখানে ইঞ্জিনচালিত নৌযানের শব্দে ডলফিন সতর্ক হবে না, সেটা আমার বোধগম্য নয়।

চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মুমিনুল হক প্রতিদিনের সংবাদ বলেন, ডলফিন মৃত্যুর কোনো তথ্য আমার কাছে নেই। আপনি বন বিভাগকে ফোন করেন। সে ভালো বলতে পারবে।

পিডিএসও/তাজ