ইউনুস কবিরাজের চ্যালেঞ্জ

শান্তি কোহিনূর সালশায় সারবে বহু রোগ!

প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০১৯, ১৩:২৪

রাকিবুল ইসলাম রাকিব, গৌরীপুর

ফুটপাতে রাখা ছোট একটি টেবিল। তার উপর সাজানো শান্তি কোহিনূর সালশার ছোট-বড় বোতল। এক বৃদ্ধ কবিরাজ চেয়ারে বসে যৌন রোগসহ বিভিন্ন রোগ প্রতিকারে সালশার গুণাগুণ তুলে ধরছেন ক্রেতাদের কাছে। চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলছেন, দুইশ টাকা মূল্যের তিনটি ফাইলেই (বোতল) সারবে বহু রোগ। রেকর্ডকৃত এই গুণাগুণ মাইকেও বাজানো হচ্ছে। কবিরাজের কথার ফাঁদে পড়ে বুঝে না বুঝে সালশার বোতল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন অনেকে।

শনিবার বিকালে ময়মনসিংহের গৌরীপুর পৌর শহরের হারুন পার্ক মোড়ে এই চিত্র ধরা পড়ে। স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, মানহীন এসব ওষুধ বিক্রি করে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলা হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। সালশার নামে বাজারে ছাড়া হচ্ছে প্রাণঘাতি ক্যামিকেলযুক্ত যৌন উত্তেজক ওষুধ। রোগ নিরাময়ের পরিবর্তে এসব ওষুধ হয়ে উঠছে প্রাণঘাতি।

কবিরাজের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল তার নাম সৈয়দ মো. ইউনুস (৬০)। বাড়ি নেত্রকোনা। তার বাবা গাছ, লতাপাতা সংগ্রহ করে সালশা তৈরি করতেন। বাবার সূত্রেই তিনি এই পেশায় আছেন ৪০ বছর। তবে তাদের কোনো ড্রাগ লাইসেন্স নেই। নেত্রকোনা জেলা প্রশাসন থেকে রেজিস্ট্রেশন করে এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।

হঠাৎ সালশার বোতলে লেখা গুণাগুণ চোখে পড়ে। গুণাগুণের ভাষা ঠিক এই রকম—রক্ত পরিষ্কার, বল ও বীর্য বর্ধক অদ্বিতীয় মহাঔষধ। ইহা সেবনে স্ত্রী-পুরুষের সকল প্রকার গোপনীয় যৌন ব্যাধি, ধাতু দুর্বল, মেহ প্রমেহ, বহুমূত্র, গনোরিয়া, সিফলিশ, সর্ববিধ চর্মরোগ, কফ, কাশ, হাঁপানি, নতুন ও পুরাতন জ্বর, পুরাতন আমাশয়, লিভার দোষ, গ্যাস্ট্রিক, আলছার, যাবতীয় বাত, স্ত্রী লোকের ঋতু দোষ, স্বেত ও রক্ত প্রদর, সুতিকা দোষ। প্রশবান্তে সেবনে আর্শ্চয ফল। এমনকি স্ত্রী সহবাসে শক্তি ডবল করে তোলে।

সালশা সেবনে স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে কিনা জানতে চাইলে মোবাইল দেখতে দেখতে চেম্বার ছেড়ে বাইরে চলে যায় ইউনুস। পরক্ষণেই ফিরে এসে এ প্রতিনিধিকে বলেন, আপনি কেন আমার পিছে লাগছেন। নিউজ করে গরিবের পেটে লাত্তি দিয়েন না।

এমন সময় চেম্বারে কয়েকজন রোগী আসেন। তাদেরই একজন বীরপুর গ্রামের আবদুল হামিদ। তিনি বলেন, মেয়েলি রোগের জন্য সালশা নিছিলাম। খালি বোতল জমা দিতে আইছি। কবিরাজ কইছে ফুল কোর্স শেষ না করলে ফল পাওয়া যাইবো না। পূর্ব দাপুনিয়া গ্রামের আরেক রোগী ফাতেমা খাতুন বলেন, গ্যাস্ট্রিকের জন্য নিছিলাম, কিছুডা ফল পাইছি।

রোগীদের কথা শোনে প্রাণবন্ত হয়ে উঠের ইউনুস। তিনি বলেন, ওষুধ যে কাজ করে রোগীরাই সাক্ষী দিলো। আমি কমবেশি সব রোগের ওষুধ বিক্রি করি। ৩০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ দুইশ টাকা পর্যন্ত ফাইল আছে। তবে স্পেশাল রোগের স্পেশাল ফাইলও আছে। দাম বেশি লাগে।

তবে ভিন্ন কথা জানালেন প্রাবন্ধিক রণজিৎ কর। তিনি বলেন, প্রতি হাট বাজারে ইউনুস কবিরাজ বিকট শব্দে মাইক বাজিয়ে সালশার প্রচারণা চালান। মাইকের শব্দ দূষণে এলাকার মানুষ অতিষ্ঠ। আর নিম্ন আয়ের মানুষ বুঝে না বুঝে এই সালশা সেবন করে অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছেন। কিন্তু প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। আমরা তাকে বহুবার উচ্ছেদের চেষ্টা করেছি। কিন্তু ধূর্ত ইউনুছ প্রভাবশালীদের মাধ্যমে হস্তক্ষেপ করিয়ে রক্ষা পেয়ে যেতেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. রবিউল ইসলাম বলেন, ফুটপাতে বিক্রি করা নিম্নমানের ওষুধ সেবন করা উচিত নয়। এগুলোতে দেহের ক্ষতিকারক কেমিক্যাল থাকে। শান্তি কোহিনূর সালশাতে ক্ষতিকর কেমিক্যাল আছে কিনা সেটা পরীক্ষা ছাড়া বলা সম্ভব নয়। তবে যেকোনো ওষুধ সেবনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

পিডিএসও/হেলাল