দৃশ্যমান হচ্ছে কক্সবাজার রেল যোগাযোগ

প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৭:০৯ | আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৭:৫১

তাজুল ইসলাম পলাশ, চট্টগ্রাম
ama ami

বিশ্বের দীর্ঘতম ও সমুদ্রকন্যা নামে খ্যাত অন্যতম পর্যটন নগরী কক্সবাজার। নয়নাভিরাম দৃশ্য, সাগরের গর্জন এবং সূর্যাস্ত দেখতে প্রতিবছর শীত মৌসুম এলেই দেশি বিদেশি পর্যটকে ভরপুর থাকে এই স্থানটি। বিশ্বের দীর্ঘতম সমূদ্র সৈকত হিসেবে বিশ্বের খাতায় নাম থাকলেও এই পর্যটন এলাকায় নেই রেল যোগাযোগের ব্যবস্থা। দেশের ভ্রমণপিপাসু মানুষের দীর্ঘদিনের চাওয়া ছিল ঢাকা থেকে সরাসরি কক্সবাজারে রেল সংযোগ। দীর্ঘদিন থেকে শুনে আসা রেলযোগাযোগ এবার বাস্তবে রুপ নিচ্ছে। 

চট্টগ্রামের দোহাজারী হতে কক্সবাজারের ঘুমধুম পর্যন্ত ১২৮ কিমি রেললাইন বসবে। কাজও চলছে জোরালোভাবে। এর মধ্যে ৩৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। পুরো কাজ শেষ হলে ২০২২ সালেই চালু হবে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজারের সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা। শুরুতে ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য ছিল। পরবর্তী সময়ে নকশায় পরিবর্তন এনে বাস্তবায়নের নতুন মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২২ সাল পর্যন্ত। এই মেগা প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজারে তৈরি হবে ঝিনুকের আদলে দৃষ্টিনন্দন রেলস্টেশন। আর এটি ঘিরে গড়ে তোলা হবে আকর্ষণীয় হোটেল, বাণিজ্যিক ভবন, বিপণি বিতান ও বহুতলবিশিষ্ট আবাসিক ভবন।

এডিবি ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ে দোহাজারী-কক্সবাজার-ঘুমধুম পর্যন্ত ১২৮ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ রেলপথের এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। ইতোমধ্য ভূমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ দিতে ২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসনকে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন সম্ভব না হলে প্রকল্প ব্যয় বাড়তে পারে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এ প্রকল্পে অর্থের জোগান দিচ্ছে।

রেলের প্রকৌশলীরা জানান, প্রকল্পের আওতাধীন চারটি বড় সেতুসহ ২৫টি সেতুর নির্মাণকাজও দ্রুতগতিতে চলছে। তাছাড়া বড় সেতুগুলো নির্মিত হচ্ছে মাতামুহুরী নদী, মাতামুহুরী শাখানদী, খরস্রোতা শঙ্খ এবং বাঁকখালী নদীর ওপর।

জানতে চাইলে রেলের প্রকল্প পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া দেরি হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজও দেরিতে শুরু হয়। তাছাড়া ৩৯টি সেতুর মধ্যে ২৮টির কাজ শুরু হয়েছে। মাঠি ভরাটের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এখন রেল লাইনের কাজ শুরু হবে। আশা করি ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময় মানুষ রেলপথে কক্সবাজার যেতে পারবে। 

সরেজমিন গেলে দেখা যায়, দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া এলাকায় রেল পথ নির্ধারনের স্থানের মধ্য মাঠি ভরাটের কাজ চলছে। একসাথে অনেক শ্রমিক কাজ করছে। রাতেও চলছে কাজ।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এই প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে রামু পর্যন্ত ৮৮ কিলোমিটার, রামু থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার এবং রামু থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত ২৮ কিলোমিটার রেলপথ নির্মিত হবে। ১২৮ কিলোমিটার রেলপথের মধ্যে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া, কক্সবাজারের চকরিয়া, ডুলাহাজারা, ঈদগাহ, রামু, সদর ও উখিয়া এবং নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম স্টেশন নির্মাণকাজও শুরু হচ্ছে। কিন্তু রামুতে নতুন সেনানিবাস হওয়ায় রামু-ঘুমধুম রেলপথ নির্মাণকাজ আপাতত থেমে গেছে। 

রেলওয়ে সূত্র জানায়, এই প্রকল্পকে পৃথক দুটি লটে ভাগ করা হয়েছে। একটি হচ্ছে চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজারের চকরিয়া পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটার এবং দ্বিতীয় লট হচ্ছে চকরিয়া থেকে কক্সবাজার সদর পর্যন্ত। চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (সিআরইসি) ও দেশীয় তমা কনস্ট্রাকশন কোম্পানি এবং চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি) ও দেশীয় ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড পৃথক দুই লটের কার্যাদেশ পায়। কাজ শুরুর তিন বছরের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা। কিন্তু বাস্তবায়ন কাজ দেরিতে শুরু হওয়ায় ২০২২ সালের আগে নতুন লাইনের ওপর রেলের চাকা ঘোরার সম্ভাবনা কম বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা। 

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকার প্রকল্পটি প্রথম অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই প্রকল্পে সিঙ্গেল লাইন মিটারগেজ রেলপথ নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু ট্রান্স এশীয় রেলপথের সঙ্গে সংযুক্ত হতে ব্রডগেজ রেলপথ লাগবে। তাই প্রকল্প সংশোধন করে ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল পাস করা হয়। জমি অধিগ্রহণসহ প্রকল্পের বিভিন্ন অনুষঙ্গে ব্যয় বেড়েছে ১৬ হাজার ১৮২ কোটি টাকা। চট্টগ্রামে দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার এবং রামু হতে মিয়ানমারের নিকট গুনদুম সীমান্ত পর্যন্ত আরও ২৮ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এ রেলপথে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ দুই ধরনে ট্রেন চলতে পারবে।

পিডিএসও/রি.মা