‘যেনোই রাইত, হেনোই কাইত’

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৯, ১৫:৪৩ | আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০১৯, ১৬:১৭

রাকিবুল ইসলাম রাকিব, গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি

‘ও খালা, ও চাচী। বেইল গেছেগা যাইয়াম গা। যাই কিছু বেছোইন লইয়্যাইন। মেশিন ভাঙা, সাইকেল ভাঙা, বই-খাতা, পুরান লোহা, নষ্ট ব্যাটারি, টিন ভাঙা, ছিঁড়া জুতা, পেলাস্টিকের মাল যা আছে লইয়্যা আইন। বাড়ি ঘর পরিস্কার করোইন, আনাচে-কানাচে কত কিছু পইড়্যা রইছে। লইয়্যা আইন সব নগদ টেকা দিয়া কিনবাম, বাকি নাই।’

আঞ্চলিক ভাষায় রেকর্ডকৃত এই ছন্দগুলো ভ্যানগাড়িতে মাইক বসিয়ে বাজানো হচ্ছে। আর চালকের আসনে বসে থাকা চল্লিশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি ভ্যানগাড়ি নিয়ে ছুটে চলছেন সড়ক ধরে। বৃহস্পতিবার বিকেলে পৌর শহরের ইসলামাবাদা এলাকায় এই দৃশ্য ধরা পড়ে।

হাতে ইশারা দিলে ভ্যানচালক গাড়ি থামায়। পরিচয় দিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। প্রতিনিধিকে সে জানায়, তার নাম সাহাব উদ্দিন (৪৮)। বাড়ি জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জের মইন্যাপাড়া গ্রামে। বাবা- মৃত সিদ্দিক আকন্দ। পেশায় তিনি একজন ভাঙারি (পরিত্যাক্ত জিনিস) ব্যবসায়ী। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ভ্যানগাড়ি নিয়ে ঘুরে ঘুরে ভাঙারির মালামাল সংগ্রহ করেন। 

গাড়ি নিয়েই হাঁটতে হাঁটতে কথা বলা শুরু করেন সাহাব। তিনি জানান- তার বাবা ছিলেন একজন দরিদ্র বর্গাচাষী। অভাবের কারণে পড়াশোনা হয়নি। তাই জীবিকার তাগিদে ১৫ বছর বয়সেই রিকশা চালানো শুরু করেন সাহাব। কিন্তু এখন বয়স হয়ে যাওয়ায় রিকশা চালাতে খুব কষ্ট তাই এই পেশায় এসেছেন।

সাহাব উদ্দিন বলেন, ‘আমগোর এদিকে অনেক মাইনষ্যে ভাঙারির ব্যবসা করতো। হেগোর সাথে কথা কইয়্যা জানবার পারি ব্যবসাডায় লাভ মন্দ না। তাই রিকশা চালানি বাদ দিয়া আমিও এই ব্যবসায় নাইম্যা পড়ছি। পরথম পরথম মাল কিনার সময় মুখে চিৎকার কইর‌্যা ডাকতে গলার মইধ্যে বেদনা করতো। তাই আমি ও গেরামের এক পোলা বুদ্ধি কইর‌্যা নিজেরাই ছন্দ মিলাইয়্যা কথা মোবাইলে রেকর্ড কইর‌্যা মাইকে বাজানো শুরু করি। এহন আর কষ্ট হয়না। মাইকের আওয়াজও যায় মেলা দূর লাগাত।’

কথা প্রসঙ্গে জানা যায়, সাহাব একবার বাড়ি থেকে ভ্যানগাড়ি নিয়ে বের হলে দুই সপ্তাহের আগে বাড়ি ফেরেনা। এই সময়টা সে দেশের বিভিন্ন জায়গায় একা ঘুরে ঘুরে ভাঙারির মালামাল কেনে। পরে ময়মনসিংহ শহরে এনে বিক্রি করে। ঘুরতে ঘুরতে যেখানে রাত হয় সেখানেই ভ্যানগাড়ি রেখে ঘুমিয়ে পড়ে। ক্ষুধা লাগলে অল্প টাকায় খাবার কিনে খেয়ে নেয়।

সাহাব উদ্দিন বলেন, ‘দুই/তিন দিন হইলো দেশ থেকে আপনেগোর এলাকায় আইছি। লোহা, টিন ভাঙা মাল বিশ টেকা, পেলাস্টিকের মাল দশ টাকা কেজিতে কিনতিছি। পুরান বইখাতাও প্রতি কেজি দশ/ পনেরো টাকায় কিনি। হারাদিন ভ্যানগাড়িত কইর‌্যা গেরামে-গঞ্জে ঘুইর‌্যা দুই হাজার টেকার মাল কিনবার পাড়ি। সদরে (ময়মনসিংহ শহর) বেইচ্যা লাভ হয় ৩/৪শ টেকা। হেইডা দিয়াই সংসার চালাই।’

দাম্পত্য জীবনে সাহাবের মা-স্ত্রী ছাড়াও দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। বড় ছেলে শরীয় হাফেজ হয়েছে কিছুদিন আগে। মেজো মেয়ে শিমুলের বিয়ে হয়েছে। ছোট মেয়ে শাপলা স্থানীয় মাদরাসায় আরবি পড়ে।

এরইমধ্যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। সাহাব হাঁটতে হাঁটতে চলে আসেন হাতেম আলী রোড এলাকায়। মাইকের ডাক শোনে ব্যাগ ভর্তি প্লাস্টিকের পরিত্যাক্ত জিনিস নিয়ে ভ্যানগাড়ির সামনে আসেন স্থানীয় রইছ উদ্দিন। জিনিসগুলো পাল্লায় ওজন করে সাহাব বলেন, ভাই দুই কেজি মাল হইছে, এই লন দাম বিশ টাকা। রইছ উদ্দিন বলেন, টাকা লাগবে না। এগুলো আপনাকে ফ্রি দেয়া হলো। আপনার ব্যাতিক্রমী মাইকিং শুনে আমি এখানে এসেছি। জবাবে সাহাব বলে উঠে- ‘আমরা অভাবী মানুষ, জীবনে ব্যতিক্রমী বলে কিচ্ছু নাই। যেনোই রাইত, হেনোই কাইত। ’

এই বলেই মাইক বাজিয়ে ভ্যানগাড়ি নিয়ে ছুটে চলে সাহাব। অন্ধকার সড়কে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে থাকে তার মাইকিংয়ের শব্দ।

পিডিএসও/অপূর্ব