পত্রিকাপ্রেমী মোসলেমের দুঃখগাঁথা

প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০১৯, ১৬:০৫

রাকিবুল ইসলাম রাকিব, গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি

ছোট একটা উঠানে বিছানো আছে পলিথিন। রাখা আছে শতশত পুরানো পত্রিকা। তার ওপরে জমেছে ধুলো-বালির প্রলেপ। সূর্যের আলোর তাপে পত্রিকা থেকে বেরিয়ে আসছে ছোট পোকা-মাকড়। আর এক বৃদ্ধ লোক তা পরিস্কার করছেন খুব যত্ন করে। 

সম্প্রতি এই দৃশ্য ধরা পড়ে গৌরীপুর উপজেলার বেকারকান্দা গ্রামে। ওই বৃদ্ধের নাম মোসলেহ উদ্দিন মোসলেম (৭২)। বাবা মৃত রহিম উদ্দিন। মা মৃত আমেনা খাতুন। চার ভাই তিন বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। পেশায় শিক্ষক হলেও গ্রামবাসী তাকে চেনেন একজন পত্রিকাপ্রেমী হিসেবে।

কাছে গিয়ে পরিচয় দিলে এ প্রতিনিধির সঙ্গে গল্প জুড়ে দেন মোসলেম। তিনি বলেন, অভাবী পরিবারের সন্তান হলেও আমার পত্রিকা পড়ার খুব নেশা ছিলো। আমার সংগ্রহশালায় আছে-১৯৫৬ সালে পাকিস্তানে সংসদে দেওয়া হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভাষণ, শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাক-ভারত যুদ্ধকালীন পত্রিকা, বাকশাল কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম মিটিংয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ (২১ জুন, ১৯৭৫), কাশ্মীর ও ফিলিস্তিন, বাঙালি জাতীয়তাবাদ বনাম বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, আদিবাসী কারা, শেখ হাসিনার বিভিন্ন কথা ও ট্রানজিট- এমন তথ্যসমৃদ্ধ দৈনিক। 

আরও রয়েছে- চার্লস-ডায়না, ক্লিনটন-মনিকা, এরশাদ-মেরীর বিষয়ে লেখা পত্রিকাগুলো। এছাড়া সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ষাঁট ও সত্তর দশকে দশকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ইংরেজি ‘মস্কো নিউজ’ ও মার্কিন পরিক্রমা পত্রিকা, মাসিক কারেন্ট ওয়ার্ল্ডয়ের সব সংখ্যা। সেইসঙ্গে সযত্নে তার সংগ্রহে আছে- পুরাতন পঞ্জিকা, ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চিঠিপত্র। 

‘১৯৬৯ সালের জুলাইয়ে মার্কিন নভোচারীদের চাঁদে অবতরণ বিষয়ে লেখা তৎকালীন দৈনিক ইত্তেফাক ও পাকিস্তান আমলের কয়েকটি দৈনিক দেশপত্রিকা আমার ভান্ডারে আছে। কিন্তু আলমারি কিংবা সেলফ না থাকায় এই তথ্য ভান্ডারে পোকা-মাকড়ের আক্রমণ শুরু হয়েছে। তাই বাড়ির উঠানে পলিথিন বিছিয়ে এগুলো পরিস্কার করছি।’

পত্রিকার তথ্য ভান্ডার সমৃদ্ধ হলেও জীবনযুদ্ধে মোসলেম এক পরাজিত সৈনিক। ১৯৬৭ সালে এসএসসি পাশ করে অভাবে পড়ে ৫ বছর পড়াশোনা বন্ধ থাকে। পরে ১৯৭২ সালে ৩৪ টাকায় একটি ছাগল বিক্রি করে কলেজে ভর্তি হয়ে এইচএসসি পাশ করেন ১৯৭৪ সালে। ১৯৮৪ সালে স্কুলে চাকরির জন্য ১৭ শতাংশ জমি বিক্রি করে ৫ হাজার দক্ষিণা দেন। কিন্তু ভগ্নিপতি সাদত আলী ও ভাগ্নে নজরুল কাল হয়ে দাঁড়ান জমিটা তাদের কাছে বিক্রি করা হয়নি বলে। এ নিয়ে জটিলতা দেখা দিলে তার পাওয়া চাকরিটাও হারাতে হয়। ঘুঁরে দাড়ানোর জন্য ১৯৯৩ সালে তিনি স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করলেও তার চাকরি হয়নি। করতে পারেননি বিয়েও। স্কুলে খন্ডকালীন ইংরেজির শিক্ষকতা করলেও ঠকানো হতো তাকে।

আক্ষেপ নিয়ে মোসলেম বলেন, ‘আমি কষ্ট করে কুঁড়েঘরে থাকি। বয়স্ক ভাতা পাইনা। ইউএনও’র কাছে সরকারি ঘর চেয়েও পাইনি। অভাবের কারণে ৫টাকা দামের একটা পত্রিকা দুই জনে মিলে কিনে পড়ি। কিন্তু সেই পত্রিকাটা পড়ার জন্য আমাকে প্রতিদিন ৩ মাইল পথ হেঁটে শহরে যেতে হয়।’

এরই মাঝে বিকেলের রোদ মিলিয়ে পশ্চিমে হেলেছে সূর্য। বেকারকান্দা গ্রামে অন্ধকার নেমে আসছে একটু একটু করে। এমন সময় গল্পে এসে যোগ দেন মোসলেমের বড় ভাই আবুল হাসিম। 

তার কাছে জানতে চাওয়া হয় মোসলেম বিয়ে করেনি কেনো, বিয়ে করলে তো এই বয়সে স্ত্রী-সন্তানরা তার সেবা করতো। জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা তো বলি মোসলেম তুই বিয়ে কর কিন্তু সে রাজি হয়না।’ কথার মাঝে মুচকি হেসে মোসলেম বলেন, ‘বুড়ো মানুষের কাছে মেয়ে বিয়ে দেবে কে?, পারলে একটা ঘর ও আলমারি কেনার ব্যবস্থা করে দিন যেনো পত্রিকাগুলো সংগ্রহ করে রাখতে পারি।’

পিডিএসও/অপূর্ব