৪৭ বছরেও খোঁজ নেয়নি কেউ

প্রকাশ : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৯:৪১

পাবনা প্রতিনিধি

স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও পাবনা সদর উপজেলার দোগাছি ইউনিয়নের চর আশুতোষপুর গ্রামে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নির্মম হত্যার শিকার ১১ শহীদের পরিবার আজও সরকারি কোনও সুযোগ সুবিধার আওতায় আসেনি। এমনকি তাদের খোঁজ খবর নেয়নি কেউ। বঞ্চিত হয়েছে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা থেকে। নিহতদের পরিবারের অনেকেই বর্তমানে মানুষের বাড়িতে ঝিঁয়ের ও ইটভাটায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। 

জানা গেছে, ১৩৭৯ বঙ্গাব্দের (১৯৭১ সালের) ৭ আশ্বিন মাঝ নদীতে নিয়ে এ ১১ জনকে একসঙ্গে গুলি করে হত্যা করে পাক বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা। এদের অপরাধ ছিল তাদের বাড়িতে মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্প করা।

মুক্তিযোদ্ধা মকসেদ আলী ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা জানায়, ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় আমাদের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ক্যাম্প করা হয়। এলাকার রাজাকার বাহিনীরা পাকবাহিনীদের কাছে খবর দেয় যে, মাহাম শেখের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প করা হয়েছে। 

ঘটনার দিন আশুতোষপুর গ্রাম থেকে বেলা ১১ টায় ১৩ জন নৌকাযোগে পাবনা শহরতলীর পাশে হাজির হাটে যায়। এসময় মুক্তিযোদ্ধারা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আলী আকন্দকে পাবনা হাজির হাট এলাকায় হত্যা করার জন্য অভিযান চালালে বন্দুকের গুলি না বের হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধারা অন্যদিকে চলে যায়। পরে রাজাকার বাহিনী প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের খুজতে শুরু করে। পরে রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে পাকসেনারা নদীর দিকে যায়। এদিকে হাটের কাজকর্ম শেষ করে ওই ১১ জন বিকেল ৩ টার দিকে বাড়ি ফেরার জন্য নৌকায় ওঠে। এ সময় রাজাকাররা ওই ১১ জনকে পাক বাহিনীকে দেখিয়ে দিলে তাদেরকে আটক করে। 

ওই দিনই পাক হানাদারেরা রাত ১২টার দিকে তাদের গুলি করে হত্যা করে হাজির হাটের দক্ষিণে (যেটাকে নদীর কোল বলা হয়) মাঝ নদীতে নিয়ে ফেলে দেয়। এসময় তাদের সঙ্গে থাকা ২ শিশুকে ছেড়ে দেয় পাক বাহিনী। পরদিন সকালে এলাকার লোকজন ১১ জনের লাশ উদ্ধার করে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করে। 

নিহতরা হলেন- কফেজ উদ্দিন শেখ, মাহাম শেখ, আজগর আলী শেখ, কুটু খাঁ, কুরান শেখ, কামাল মালিথা, গুলাই শেখ, আমোদ আলী মোল্লা, তাছের ব্যাপারি, নদু সরদার, হোসেন মন্ডল।

শহীদদের মধ্যে হোসেন মন্ডলের স্ত্রী খোদেজা খাতুন পার্শ্ববর্তী ইটভাটায় কাজ করছে। কালাম মালিথার স্ত্রী সাইমুন নেছার পেটে টিউমার হয়ে গতবছর চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন। 

শহীদ গুলাই ব্যাপারির মেয়ে জাহানারা আক্তার কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, আমার বাবা হানাদার বাহিনীর হাতে নিহত হওয়ার পর থেকে আমরা মানবেতর জীবন যাপন করছি, দেশের বর্তমান সরকার মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের যখন ব্যাপক সুযোগ সুবিধা প্রদান করছেন সেখানে আমরা আজ পর্যন্ত কোনো সরকারি সহযোগিতা পাওয়া তো দূরের কথা আমাদের খোঁজ খবর পর্যন্ত কেউ নেয়নি।

শহীদ কফেজের নাতি নবাব আলী ও অপর একজন শহীদের ছেলে মোহাম্মদ আলী বলেন, দেশের অনেক মুক্তিযোদ্ধার প্রজন্ম মুক্তিযোদ্ধা কোটায় সরকারি চাকরি পেলেও আমাদের পরিবারে অনেক শিক্ষিত ছেলে মেয়ে থাকার পরও আমরা তা পাইনি।

এসকল শহীদদের ব্যাপারে খোঁজ খবর নিয়ে তাদের পরিবারের সদস্যদের দুঃখ দূর্দশা লাঘবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন এলাকাবাসী ।

জানতে চাইলে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ’৭১ পাবনা শাখার সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আ স ম আব্দুর রহিম পাকন বলেন, যারা প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন তাদের পরিবারের খোজ খবর নেয়া প্রয়োজন। আগামীতে যদি মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকার ক্ষমতায় আসে তাহলে এদের খোঁজ খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পিডিএসও/অপূর্ব