আজমীরা টি স্টল...

প্রকাশ : ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ২২:০২

সবুজ হোসেন, নওগাঁ প্রতিনিধি

রেল গেইটের পরিত্যাক্ত দুইটি ইটের ঘর। এক সময় এই ঘরে রেলের গেইটম্যান থাকতেন। তবে এখন ওই ঘরে আর গেইটম্যান থাকেন না। পরিত্যাক্ত ঘরের একপাশে টিনের বেড়া। অপর পাশে পলিথিনে ঘেরা। নওগাঁর রানীনগর উপজেলা সদর-আবাদপুকুর সড়কের রেল গেইটের পরিত্যাক্ত এ দুটো ঘরে বসবাস করেন আজমীরারা। তাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা সাতজন।

জীবন যুদ্ধে টিকে থাকতে চা ব্যবসাকে বেছে নিয়েছেন আজমীরা। তার নামেই রাখা হয়েছে ‘আজমীরা টি স্টল’। পরিত্যাক্ত দুটো ঘরের একটিতে তাদের সবার বসবাস। যেটি একটু বড়। আর অপরটি একটু ছোট। এ ছোট ঘরেই চায়ের স্টল। চায়ের দোকানটি রেল লাইনের একে বারেই নিকটে। প্রায় ১০ ফুট দুরত্বে। রেল লাইন পার হয়ে উপজেলা সদরে প্রবেশ পথের ডান দিকে ও আবাদপুকুর সড়কের মুখে বাম পাশে চায়ের দোকানটি হওয়ায় চোখে পড়ার মতো। 

আজমীরার গ্রামের বাড়ি উপজেলার বিষ্ণপুর দিঘীর পাড়ে। ভূমিহীন দরিদ্র এ পরিবারটি গত ২০ বছর হলো রেল গেইটের পরিত্যাক্ত রুমে উঠেছেন। চার বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে আজমীরা দ্বিতীয়। সবার বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। বাবা আজিজার রহমান আকন্দ প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে একটি বাজারে চায়ের দোকান করেন।

অভাবের সংসার হওয়ায় পড়াশুনার তেমন সুযোগ হয়ে উঠেনি তার। নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করেছেন। সংসারে অভাব অনটনের কারণে বন্ধ করে দিতে হয়েছে পড়াশুনা। এরপর সংসারের হাল ধরেছেন। তবে বিয়ের পিড়িতে এখনও বসা হয়নি তার। গত ১০/১২ বছর থেকে তিনি ওই চায়ের দোকান করছেন। চায়ের সঙ্গে রয়েছে বিভিন্ন বিস্কিট, কেক, রুটি, কলা ও বিড়ি-সিগারেট। প্রতিদিন প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মতো বেচা-কেনা হয়। লাভের অংশটা পরিবারের কাজেই খরচ করতে হয়।

আজমীরার চায়ের দোকান রেলগেইটের পাশেই, অর্থাৎ দোকানের সামনেই রেল লাইন। রেল লাইনের পাশে দোকান হওয়ায় ভোর থেকে শুরু হয়ে চলে রাত ১১ টা পর্যন্ত। এ সুবাধে ট্রেনের আসা-যাওয়া বুঝতে পারেন আজমীরা। এ কারণেই রেল লাইন পার হওয়া মানুষদের সর্তক করতে পারেন। তার কারণে দূর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে কয়েকটি জীবন। স্বাক্ষীও হয়ে আছেন কয়েকটি দূর্ঘটনার। আর এ রেল লাইন দিয়ে ঢাকা থেকে দিনাজপুরগামী ট্রেনের আসা-যাওয়া। রানীনগর উপজেলা সদরের ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া রেলে লাইনের উপর দিয়ে প্রতিদিন ট্রাক, ট্রাক্টর, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল, ভটভটি, অটোভ্যান, সাইকেলসহ লাখো মানুষের পারাপার।

জানা গেছে, প্রায় ৫/৬ মাস আগে রেলগেইটটি বন্ধ ছিল। প্রায় ৩ মাস বন্ধ থাকার পর গেটম্যান নিয়োগ দেয় রেল কর্তৃপক্ষ।

আজমীরার মা রেনুকা বিবি বলেন, এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। রেলের পুরনো ঘরে সবাইকে নিয়ে গাদাগাদি করে বসবাস করি। নওগাঁ-নাটোর সড়ক হবে শুনছি। রাস্তা হলেতো এ ঘরটিও ভাঙা হতে পারে। তখন আর এখানে থাকতে পারবো না। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছি। কোথায় থাকব এখনো ঠিক হয়নি। তবে রাস্তা হলে এখানে আর থাকা হবেনা এটাই জানি।

আজমীরা বলেন, গেইটম্যান হয়ত ব্যস্ততার কারণে আসতে পারেনা। এসময় ট্রেন চলে আসলে লোকজনকে সর্তক করি। অনেক সময় নিজেরাই গেট নামিয়ে দেই। অনেকে আবার ট্রেন কাছাকাছি আসলেও পার হওয়ার চেষ্টা করেন। তখন হাত উচিয়ে এবং হাক/ডাক দিয়ে লোকজনকে সতর্ক করে থামিয়ে দিই।

চায়ের দোকানের নিয়মিত ক্রেতা ভ্যান চালক ময়নুল হক বলেন, এরা অনেক মানুষকে দুর্ঘটনার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। মানুষদের সচেতন করেন। গেইটম্যান আসতে দেরি করলে নিজেরাই গেইট নামিয়ে দেয়।

উপজেলার মালশন গ্রামের মিজানুর সরদার বলেন, নিয়মিত রেল লাইন পার হয়ে উপজেলায় আসা-যাওয়া করতে হয়। মাস কয়েক আগে একদিন বিকেলে একটা কাজের জন্য তড়িঘড়ি করে উপজেলা বাজারের দিকে আসছিলাম। রেইলগেট পড়ে আছে। পার হওয়ার চেষ্টা করতেই চায়ের স্টলের ওই মহিলা (আজমীরা) হাঁক দিয়ে থামিয়ে দিলেন। দেখি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ট্রেন চলে আসছে। ভাগ্যক্রমে সেদিন বেঁচে গিয়েছি।

পিডিএসও/অপূর্ব