খোলা আকাশের নিচে ক্ষৌরকর্ম

দিন বদল হয়নি নরসুন্দর কালামের

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০১৮, ১১:৪৮ | আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০১৮, ১৩:৫৯

রাকিবুল ইসলাম রাকিব

বড়সড় আমগাছটার বুকে দুটো পেরেক গাঁথা। পেরেকে সুতো বেঁধে টানানো হয়েছে ভাঙা আয়না। তার বিপরীতে পাতা একটি কাঠের চেয়ারে বসে এক ব্যক্তি তাকিয়ে আছেন আয়নায়। এক তরুণ হাতে চিরুনী ও কেচি নিয়ে সেই ব্যক্তির চুল কেটে যাচ্ছেন। একসময় গ্রাম-গঞ্জের সাধারণ চিত্র ছিল এটি। কিন্তু আধুনিক যুগের সেলুন/জেন্টস পার্লারের দাপটে খোলা আকাশের নিচে নরসুন্দরদের ক্ষৌরকর্মের এই দৃশ্য এখন অনেকটাই বিরল। তবে ময়মনসিংহের গৌরীপুর রেলওয়ে জংশনে এমন দৃশ্য ধরা পড়লো।

কাছে গিয়ে কথা হয় নরসুন্দরের সঙ্গে। জানায়, তার নাম মো. কালাম (৩৫)। বাড়ি রেলওয়ে স্টেশনসংলগ্ন চকপাড়া মহল্লায়। বাবার নাম আবদুল হাকিম। মায়ের নাম ফাতেমা খাতুন। তিন ভাই তিন বোনের মধ্যে সে বড়। অভাব-অনটনের কারণে তিন বেলা পেটে ভাত জুটতো না। তাই জীবিকার তাগিদে বাবার সূত্র ধরে এই পেশায় এসেছে।

কথা বলতে বলতেই এক ট্রেনযাত্রীর চুল কেটে চলেছে কালাম। চিরুনী ও কেচিতে ঘ্যাচাং ঘ্যাচাং শব্দ তুলে কাজটি করছে খুব সহজভাবে। চুলকাটা শেষে শেভ করার প্রস্তুতি নিতেই স্টেশনে প্রবেশ করলো ভৈরবগামী একটি ট্রেন। তাই শেভ না করে কালামের হাতে টাকা দিয়ে ওই লোক উঠে পড়লো ট্রেনে। মুচকি হেসে কালাম বলে উঠে—বুঝলেন ভাই, আমার কিছু কাস্টমারই থাকে দৌড়ের ওপর।

এরইমধ্যে মেঘাচ্ছন আবহাওয়ায় কালো হয়ে গেছে চারদিক। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে স্টেশনে। গা বাঁচাতে অপেক্ষমান ট্রেন যাত্রীরাও ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ে। কিন্তু ক্ষৌরকর্মের সামগ্রী পুটলিতে ভরে কালাম দাঁড়িয়ে আছে আমগাছটার নিচেই। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে এ প্রতিনিধির সঙ্গে জীবনের গল্প জুড়ে দেয় সে। কালাম বলেন, ছোটবেলায় পড়াশোনার জন্য বাবা আমাকে স্কুলে ভর্তি করে দেয়। কিন্তু আমি স্কুলে না গিয়ে খেলাধূলা করে বাড়ি ফিরতাম। তখন বাবা আক্ষেপ করে বলতেন—পড়ালেহা না করলে খাইবি কি? আমার তো জমি-বাড়ি কিছুই নাই, যে বেইচ্যা বেইচ্যা খাইবি। আমার লগে থাইক্যা এই কামডা শিইখ্যা রাখ। একটা কিছু কইর‌্যা তো তোর খাওন লাগবো। এরপর বাবার সঙ্গে থেকে ক্ষুর-কেচির কাজটা রপ্ত করে ফেলি।

কথা প্রসঙ্গে কালাম বলেন, বার্ধক্যজনিত রোগে বাবা বিছানায় পড়েছে বহু বছর আগে। কিন্তু জীবিকার তাগিদে আমি এই পেশা নিয়ে স্টেশনে পড়ে আছি একযুগ ধরে। ইতোমধ্যে আমিসহ দুই ভাই জুয়েল, সোহেল ও তিন বোন হাসিনা, মৌসুমী ও খালেদা বিয়ে করে আলাদা হয়েছি। তবে বাবা, মা ও স্কুলপড়ুয়া ছোট ভাই সোহেল রয়ে গেছে আমার সংসারেই। কিন্তু সংসারের হাল ধরতে এখনো বৃদ্ধ মাকে কাজ করতে হয় পরের বাড়িতে।

সময়ের বিবর্তনে গত একযুগে স্টেশনে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে। আন্তঃনগর ট্রেন চালুর পাশাপাশি গড়ে উঠছে স্টেশনের নতুন ভবন। কিন্তু দিনবদল হয়নি নরসুন্দর কালামের। রোদ ও ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত স্টেশনের আমগাছ তলায় ক্ষৌরকর্মের কাজ করে কালাম। পোশাকশ্রমিক, ফেরিওয়ালা, রিকশাচালক, দিনমজুর, ট্রেনযাত্রীসহ নিম্ন আয়ের লোকজন তার কাস্টমার। তার এখানে চুল কাটা ২৫ টাকা, দাড়ি শেভ ১০ টাকা। সারাদিন তার কাজ করে আয় হয় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। এই টাকায় চলে সংসার, বাবার চিকিৎসাসহ অন্যান্য খরচ।

দাম্পত্য জীবনে কালামের জয় নামে এক ছেলে আছে। অভাবের কারণে ছেলেকে ভালো স্কুলে ভর্তি করতে পারেনি। ছেলেটি এখন স্থানীয় হাফেজি মাদরাসায় পড়ছে। কিন্তু সেখানেও আছে স্বপ্নভাঙার শঙ্কা। কিন্তু কালাম অনড়। যেভাবেই হোক ছেলেকে মানুষ করবে। কালাম বলেন, ছোটবেলায় স্কুল ফাঁকি না দিয়ে নিজে পড়ালেখা করিনি। তাই আমাকে নাপিত হতে হয়েছে। আমি চাই না ছেলে এই পেশায় আসুক।

এরই মাঝে বৃষ্টি থেমে গেছে। চট্টগাম থেকে ছেড়ে আসা আন্তঃনগর ট্রেন বিজয় এক্সপ্রেস প্রবেশ করেছে স্টেশনে। এক বৃদ্ধ লোক তড়িঘড়ি করে গাছতলায় পাতা চেয়ারটায় বসে বলে উঠে—ওই মিয়া, তাড়াতাড়ি দাড়িডি শেভ কইর‌্যা দেও। ট্রেন ছাইর‌্যা দিবো। দ্রুত পুটলিতে রাখা চাদর বের করে বৃদ্ধের শরীর মুড়ে দেয় কালাম। মুখে শেভিং ক্রীম মেখে ক্ষুর টান দিতেই কালামকে বাঁধা দিয়ে বৃদ্ধ বলে—আরে মিয়া, ক্ষুরের পুরান ব্লেডটা বদলাইয়া লও।

পিডিএসও/প্রতিনিধি/হেলাল