২ মাসের মধ্যে ঘর ছাড়তে হবে বৃদ্ধ দম্পতিকে!

প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৬:২৩

মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্, হাজীগঞ্জ (চাঁদপুর) প্রতিনিধি

আগামী ২ মাসের মধ্যেই ঘর ছাড়তে হবে। এ চিন্তায় খাওয়া নেই, দাওয়া নেই। সারাক্ষণ গুন গুন করে কান্না। রোগে-শোকে কেমন যেন হয়ে গেছেন তারা। কথা-বার্তাও মাঝে মধ্যে এলোমেলো বলছেন। এ বয়সে কোথায় যাবেন তারা? কে আশ্রয় দেবে, কে খাওয়াবে, কে নেবে ভরণ-পোষনের দায়িত্ব?

বলছি বৃদ্ধ আ. রহমান (৮০) ও হজুনী বেগম (৬৮) দম্পতির কথা। আব্দুর রহমান চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার গর্ন্ধব্যপুর উত্তর ইউনিয়নের স্থানীয় মৈশামূড়া গ্রামের বড় বাড়ির মৃত আকমত আলীর ছেলে। আর হজুনী বেগম আব্দুর রহমানের স্ত্রী। দুজনেই জীবন যুদ্ধে হারমানা পরাজিত সৈনিক।
 
বয়সের ভারে কাজ করতে পারেন না বৃদ্ধ আব্দুর রহমান। তাই গত কয়েক বছর ধরে ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু বার্ধক্যজনিত কারনে এবং রোগাক্রান্ত হয়ে এখন ভিক্ষা করাও সম্ভব হয়না। তাই বাড়ির লোকজন এবং প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় খেয়ে, না খেয়ে বেচেঁ আছেন।

এ বেঁচে থাকাটাও এখন দুঃস্বপ্নে পরিনত হয়েছে। কারন আগামি ডিসেম্বর (২০১৮) মাসের মধ্যে ঘর ছাড়তে হবে বৃদ্ধ আব্দুর রহমান দম্পতিকে। এই চিন্তায় তারা এখন প্রাগল প্রায়। মাঝে মধ্যে অসংলগ্ন কথা-বার্তা বলছেন। কারন আব্দুর রহমান দম্পত্তি যে ঘরে বসবাস করছেন, এই ঘরটি তাদের নয়।

জানা যায়, আ. রহমান দম্পতি যে ঘরে বসবাস করছেন, সেই ঘরের লোকজন চট্টগ্রামে থাকেন। সেই সুবাদে গত কয়েক বছর যাবৎ আ. রহমান স্ত্রীসহ ওই ঘরেই থাকছেন। আগামি জানুয়ারী (২০১৯) মাসে ওই ঘরের লোকজন চট্টগ্রাম থেকে বাড়িতে চলে আসবেন। তাই আব্দুর রহমান দম্পতিকে ডিসেম্বরের মধ্যেই ঘরটি ছেড়ে দিতে হবে। এখন তারা কোথায় থাকবেন। এই চিন্তায় সারাদিন গুন গুন করে কাঁদছেন এই দম্পতি। কাঁদতে কাঁদতে তারা পাগল প্রায়। ফলে মাঝে মধ্যে এলোমেলো কথা বলছেন।

কথা হয় আ. রহমান ও হজুনী বেগমের সাথে। তারা জানান, সম্পত্তি না থাকায় অন্যের ঘরে থাকেন। বাড়ির লোকজন এবং প্রতিবেশীরা যা দেন, তা খেয়ে বেঁচে আছেন। খোকন (৫০) ও হাকিম (৪৫) নামে তাদের দুই ছেলে সন্তান রয়েছে। তারা এসকেরাফের (ভাংগারি) কাজ করে। খোকন তার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে হাজীগঞ্জে এবং হাকিম তার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে শশুর বাড়ির এলাকায় থাকে। 

কান্নাজড়িত কন্ঠে তারা বলেন, নিজের ভিটে-মাটি না থাকায় গত কয়েক বছর ধরে ছেলেরা খোঁজ-খবর নেয়না। বেঁচে আছি, না মরে গেছি, একদিনের জন্য দেখতেও আসেনি দুই ছেলে। এক প্রশ্নের জবাবে আ. রহমান বলেন, একজনে দুই শতাংশ সম্পত্তি কিনে দিছে। টাকা-পয়সা না থাকায় সেখানে ঘর করতে পারছিনা।

এ বিষয়ে ওই বাড়ির আব্দুল কাদের (৬৫) জানান, বাড়ির লোকদের সহযোগিতায় তাদের (আ. রহমান ও হজুনী) খাওয়া, পরা (পোশাক) এবং চিকিৎসা চলছে। এলাকার মানুষও সহযোগিতা করে আসছে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন। এখন সবচে বড় সমস্যা থাকার। কেউ যদি একটি ঘর করে দেয়, তাহলে এই বুড়ো লোক দুইটার মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে।

একই বাড়ির শহীদুল্লাহ (৫৫) জানান, সরকার চালসহ (ভিজিএফের চাউল) কত কিছু দেয়। ভালো ভালো মানুষে পায়, অথচ এই বৃদ্ধ অসহায় লোকটি (আ. রহমান) পায় না। যারা চাউল দেয়, তাদের সাথে আমি ঝগড়া করেছি। তারপরও দেয়নি।

এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য রনজিৎ চৌধুরী বলেন, আ. রহমান বয়স্ক ভাতা পায়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সবাইকে তো চাউল দেয়া যায় না। কারন চাহিদা ২০০জন, বরাদ্দ পাই ৫০ জনের। তাই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সবাইকে দিতে হয়। তাছাড়া যারা বয়স্ক ভাতা পায়, তাদের চাউল দেয়া যায় না বলে তিনি জানান।
 
ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু জানিনা। ওই ওয়ার্ডের মেম্বার (ইউপি সদস্য) ভালো বলতে পারবেন। যা করার মেম্বার করবে। তিনি কি দিবেন, না দিবেন সেটা প্রস্তাব করতে হবে। তারপর পরিষদ থেকে সাধ্যমতো দেয়ার চেষ্টা করা হবে।

পিডিএসও/এআই