সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার আসমা সিদ্দিকা মিলি

রাজবাড়ীতে ৪ নারী খুনের রহস্য উদঘাটন

প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১:৪১

রাজবাড়ী প্রতিনিধি

রাজবাড়ীতে আগস্ট মাসে সদর উপজেলার পাশাপাশি ৩টি ইউয়িনে ১৪দিনের ব্যবধানে শিশুসহ ৪ নারীকে গলাকেটে হত্যার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। সর্বশেষ ১৬ আগস্ট রাতে ঘটে যাওয়া আলিপুর ইউনিয়নের বারেবাকপুর গ্রামে মধ্যবয়সী নারী হাজেরা বেগম হত্যার ঘটনায় পুত্রবধূসহ ৩জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্ধী দিয়েছেন পুত্রবধূ। 

রোববার দুপুরে এই চার হত্যার বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন রাজবাড়ী পুলিশ সুপার আসমা সিদ্দিকা মিলি।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার বলেন, আগস্ট মাসে রাজবাড়ী সদর উপজেলার পাশাপাশি তিনটি ইউনিয়ন (মুলঘর, বানীবহ ও আলীপুর) ১৪ দিনের ব্যবধানে তিন নারী ও এক শিশুকে গলাকেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এরপর থেকে ওইসব এলাকায় নানা ধরণের গুজব ছড়িয়ে পরে। ৩টি ইউনিয়নেই গলাকাটা আতঙ্কে এলাকায় নিজেরাই পাহারা দিতে শুরু করে। অবশেষে আমরা হত্যাগুলোর রহস্য উদঘাটন করতে পেরেছি।

তিনি বলেন, গত ১৬ আগস্ট দিবাগত রাতে সদর উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের বারবাকপুর গ্রামে হাজেরা বেগম (৫০) নামে এক নারীকে গলাকেটে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের স্বামী তমিজউদ্দিন বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামি করে রাজবাড়ী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। একমাস ধরে এই হত্যা মামলা তদন্ত শুরু করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। অবশেষে তদন্তে আমরা জানতে পারি ওই গৃহবধূর ছেলে হাফিজুল প্রবাসে থাকেন। হাফিজুলের স্ত্রী স্বপ্না বেগমকে (২৫) অনেক ভালোবাসতেন তার মা হাজেরা বেগম। এ কারণে হাজেরা মাঝেমধ্যেই ছেলের বউয়ের কাছে ঘুমাতেন।

কিন্তু, ছেলের বউ স্বপ্নার পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো পাসের কমড়পাড়া গ্রামের সোহেল মিয়া নামে এক যুবকের সাথে। ঘটনার দিন রাতে সোহেল তার সহযোগী কবির হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে স্বপ্নার সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত হতে আসে। এসময় স্বপ্না ও তার চার বছর বয়সী ছেলে সানী এবং শ্বাশুড়ি হাজেরা এক সাথে শুয়ে ছিলেন। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে ছেলের বউয়ের পরকীয়া সম্পর্ক দেখে ফেলেন হাজেরা। আর এতেই সোহেল, কবির ও স্বপ্না মিলে গলাকেটে হাজেরাকে হত্যা করে। শুধু তাই নয়, কেউ যাতে স্বপ্নাকে সন্দেহ করতে না পারে এ জন্য সোহেল স্বপ্নার দুই হাত ও পিঠে কোপ দিয়ে জখম করে। 

পুলিশ সুপার বলেন, হত্যাকাণ্ডের পরদিন সকালে হাজেরার মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি তার ছেলের বউ স্বপ্নাকে আটক করে থানায় নিয়ে আসা হয়। ওইসময় মিথ্যা নাটক সাজিয়ে স্বপ্না জানান, ওইদিন রাতে খাবার খেয়ে সে তার ছেলেসহ শাশুড়ি একই ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে তিনি দেখতে পান ঘরের আলো নেভানো এবং তার শাশুড়ির শরীরে রক্ত। এসময় তিনি চিৎকার দিলে পাশের শ্বশুড়সহ অন্যরা ছুটে এসে দেখেন হাজেরা বেগমের গলাকাটা লাশটি খাটের উপর পড়ে আছে। কিন্তু, গত ৭ সেপ্টেম্বর হত্যার মূল হোতা সোহেল ও তার সহযোগী কবিরকে গ্রেফতার এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধার করা হয়। পরে শনিবার নিজের শ্বাশুড়িকে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন স্বপ্না।

এর আগে ৭ আগস্ট দিনগত রাতে সদর উপজেলার বানীবহ ইউনিয়নের আটদাপুনিয়া গ্রামে নিজ বসতঘরে দুই সন্তানের জননী গৃহবধু আদুরী আক্তার লিমাকে (২৫) গলাকেটে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার পরদিন গত ৮ আগস্ট নিহতের স্বামী রড মিস্ত্রি মিজানুর রহমান বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামি করে রাজবাড়ী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

এ হত্যার বিষয়ে পুলিশ সুপার আসমা সিদ্দিকা মিলি বলেন, পিলার থেকে ম্যাগনেট সংগ্রহ চক্রের সদস্য ছিলেন আদুরী বেগম। তার আপন দুই দেবর এবং এক ফুফাতো দেবরও এই চক্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এই ম্যাগনেট ব্যবসার ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের কারণেই তিন দেবর মিলে গলাকেটে হত্যা করে আদুরীকে। আদুরীর তিন দেবর বর্তমানে জেল হাজতে রয়েছে। তারা পুলিশের কাছে হত্যার দায় স্বীকার করেছে।

তাছাড়াও গত ২ আগস্ট দিনগত রাতে সদর উপজেলার মূলঘর ইউনিয়নের পশ্চিম মুলঘর গ্রামে ৪৫ বছর বয়সী দাদী শাহিদা বেগম ও তার ৭বছর বয়সী নাতনী লামিয়াকে নৃশংসভাবে গলাকেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। জোড়া হত্যাকান্ডের ঘটনায় ৩ আগস্ট নিহত শিশু লামিয়ার বাবা গার্মেন্টসকর্মী শহিদুল ইসলাম বাদী হয়ে রাজবাড়ী সদর থানায় অজ্ঞাত আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন।

জোড়া হত্যা কাণ্ডের বিষয়ে পুলিশ সুপার বলেন, দাদি-নাতনি হত্যার ঘটনায় আসামি গ্রেফতার রয়েছে। এ হত্যার রহস্যটিও আমরা ইতোমধ্যে উদঘাটন করেছি। কিন্তু, আমাদের কিছু টেকনিক্যাল বিষয় আছে। আশা করছি ওই বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করে শিগগিরই এ হত্যার বিষয়ে আপনাদের জানাতে পারবো।

সাংবাদিক সম্মেলনে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রাকিব খাঁন, সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (পাংশা সার্কেল) ফজলুল করিম, জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামাল হোসেন ভূইয়া ও পরিদর্শক জিয়ারুল ইসলাম প্রমুখ।

পিডিএসও/এআই