হারিয়ে যাচ্ছে নড়িয়া

প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১:৩৭ | আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৪:০৮

নিজস্ব প্রতিবেদক

এবার বর্ষার পর পদ্মা হয়ে উঠেছে আরো ভয়ংকর। ভয়াবহ ভাঙনের কবলে পড়েছে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার একটি বৃহৎ জনপদ। হতদরিদ্রদের পাশাপাশি সচ্ছল পরিবারগুলোও তাদের আবাসস্থল হারিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে অন্যের জমি বা বাড়িতে।

গত এক মাসে পদ্মার আগ্রাসী ছোবলে বিলীন হয়েছে ৬ হাজারেরও বেশি মানুষের বসতবাড়ি, ফসলি জমি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি হাসপাতাল, বেসরকারি ক্লিনিক, মসজিদ-মন্দির, পাকা সড়ক, বিদ্যুৎ লাইন, সামাজিক প্রতিষ্ঠানসহ মানুষের স্থাবর-অস্থাবর বহু সম্পদ। নদী যেভাবে ভাঙছে তাতে নড়িয়া সদরের অস্তিত্ব আগামী এক মাসের মধ্যে বিলীন হয়ে যাবে। ক্রমেই মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে নড়িয়া।

গত দুই মাসে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার অন্তত দুই বর্গকিলোমিটার এলাকা চলে গেছে নদীগর্ভে। অব্যাহত ভাঙনে মুক্তারের চর, কেদারপুর ইউনিয়ন ও নড়িয়া পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড এখন অস্তিত্বহীন প্রায়। নড়িয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজিদা ইয়াসমিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব এলাকার পাঁচ হাজারের মতো পরিবার ভাঙনের কারণে বাস্তুহারা হয়ে পড়েছে। গত এক সপ্তাহে সাধুরবাজার, ওয়াপদাবাজার, মুলফৎবাজার, চর জুজিরগাঁও, দাসপাড়া, উত্তর কেদারপুর এলাকার বহু ঘরবাড়ি, রাস্তা, সেতু, কালভার্ট ও চার শতাধিক দোকানসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চলে গেছে পদ্মার পেটে। আতঙ্কিত এলাকাবাসী ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নিচ্ছেন।

চার মাস আগেই ছিল ভাঙনের পূর্বাভাস : পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (সিইজিআইএস) হিসাবে গত সাত বছরে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার প্রায় সোয়া ১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা নদীতে তলিয়ে গেছে। ২০১৫-১৬ সময়কালে বিলীন হয়েছে ১ দশমিক ৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা। অবশ্য সিইজিআইএস এ বছর পদ্মার নড়িয়াতে ভাঙনের পূর্বাভাস চার মাস আগেই দিয়েছিল। তারপরও সরকারের পক্ষ থেকে ওইসব জনপদ রক্ষায় কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কোনো ধরনের সমীক্ষা ছাড়াই দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে ভাঙন রোধে মোট ৪২ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। তাতে ভাঙন থামেনি।

নদী ও পানি বিশেষজ্ঞরা ভাঙনের জন্য নড়িয়ার ভূমির গঠন ও পদ্মা নদীর গতি-প্রকৃতিকে দায়ী করছেন। আর স্থানীয় কারো কারো ধারণা, ২০১৫ সালে পদ্মা সেতুর জন্য নদীশাসনের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে নড়িয়ায় ভাঙন বেড়েছে। তবে এমন ধারণার বিষয়টি আরো খতিয়ে দেখার প্রয়োজন বলে মনে করেন নদী বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে সিইজিআইএসের উপনির্বাহী পরিচালক ও ভাঙন পূর্বাভাস গবেষণার প্রধান সমন্বয়কারী মমিনুল হক সরকার বলেন, এই ভাঙন আগামী মাস পর্যন্ত চলতে পারে। সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আরো দেড় বর্গকিলোমিটার ভাঙনের কবলে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নড়িয়ার মাটিতে বালুর পরিমাণ বেশি উল্লেখ করে মমিনুল হক সরকার বলেন, এক থেকে দেড় শ’ বছরের পুরোনো ওই ভূমির গঠনও শক্তিশালী নয়। ফলে পদ্মার স্রোতের তীব্রতায় সেখানে ভাঙন বেড়ে গেছে। সাধারণভাবে বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন রোধের যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাতে কাজ না-ও হতে পারে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও নদী বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত মনে করেন, শরীয়তপুরের নড়িয়ায় এতদিন ধরে ভাঙন রোধে জোড়াতালির সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে। পদ্মার মতো একটি ভয়ংকর আগ্রাসী নদীর হাত থেকে নড়িয়াকে রক্ষা করতে হলে ভাঙনটি ঠিক কী কারণে হচ্ছে, নদীর কত গভীর পর্যন্ত মাটি সরে গেছে, এসব তথ্যসহ সামগ্রিক একটি সমীক্ষা করতে হবে। তারপর ভাঙন রোধে উদ্যোগ নিতে হবে। নয়তো আগের মতো নতুন প্রকল্পের টাকাও জলে যাবে।

এদিকে, পদ্মা তীরের কৃষিজমি ভাঙতে ভাঙতে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার দিকে এগোতে থাকায় কয়েক বছর ধরেই ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিল এলাকাবাসী। সরকারের পক্ষ থেকে গত জানুয়ারিতে হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্পও অনুমোদন করা হয়েছিল। কিন্তু সেই কাজ শুরুর আগেই জুলাই মাসে পদ্মায় নতুন করে ভাঙন শুরু হয়। শরীয়তপুরের পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, জরুরি ব্যবস্থা হিসেবে এক লাখ ১০ হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে নদীতে। তাতে নদী তীরে স্রোতের তীব্রতা কিছুটা কমলেও ভাঙন থামেনি। আর বর্ষার পানি না কমা পর্যন্ত তীর রক্ষা প্রকল্পের কাজও করা সম্ভব নয়।

হাজার হাজার বাস্তুহারা মানুষের মাথা গোজার ঠাঁই না হওয়ায় আর প্রয়োজনীয় ত্রাণসহায়তা না পাওয়ায় তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্রয়হীন মানুষদের জন্য কোনো আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়নি।

প্রশাসনের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারা বলেন, নড়িয়া উপজেলায় ২৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। প্রয়োজনে সেখানে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্তরা আশ্রয় নিবেন। উত্তর কেদারপুর জেলেপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে আরেক করুণ চিত্র। ওই গ্রামের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আবাস। বেশির ভাগ লোকই মৎস্যজীবী। গ্রামে ছিল শত বছরের পুরনো সত্য নারায়ণ সেবা মন্দির। চোখের সামনেই বিলীন হলো শত ফুট উঁচু মন্দিরের মঠসহ উপসনালয়ের সবগুলো চিহ্ন।

ভাঙনকবলিত চার কিলোমিটার এলাকায় জরুরি প্রতিরক্ষামূলক কাজ করার জন্য ২০ কোটি টাকার আবেদন করা হলে অনুমোদন পাওয়া গেছে মাত্র তিন দফায় ৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। এ টাকা খরচ করেও ফল আসেনি। ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে নড়িয়াবাজার, উপজেলা পরিষদ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, খাদ্য গুদাম, পৌরসভা ভবন, নড়িয়া বালিকা বিদ্যালয়, নড়িয়া বিহারীলাল উচ্চবিদ্যালয়, নড়িয়া সরকারি কলেজ ও ডজনখানেক সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক, মুলফৎগঞ্জবাজার, বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ হাজার হাজার জনবসতি।

কেদারপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছানাউল হক জানান, এই ইউনিয়নের অন্তত তিন হাজার পরিবারের সব ধরনের সম্পদ নদীতে ভেঙে গেছে। দুটি ওয়ার্ড সম্পূর্ণ বিলীন হয়েছে। আরো ৪টি ওয়ার্ডের ৬টি গ্রামের ৮০ শতাংশ ভেঙেছে গত এক সপ্তাহে। ক্ষতিগ্রস্তদের ৩০ কেজি করে চাল ছাড়া কোনো সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়নি।

ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দা শরীয়তপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন কমিটির আহবায়ক অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ বলেন, জানুয়ারীর ২ তারিখে বছরের প্রথম বৈঠকে একনেকের সভায় পদ্মার ডানতীর রক্ষার জন্য ১ হাজার ৯৭ কোটি টাকা অনুমোদন দেওয়া হলেও একটি মহলের অবহেলার কারণে গত শুষ্ক মৌসুমে বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।

নড়িয়া পৌরসভার মেয়র শহিদুল ইসলাম বাবু বলেন, এ বছরের ভাঙনে আমার পৌরসভার ২ ও ৪ নং ওয়ার্ডের ৮০ শতাংশ পরবিারের ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। এ পর্যন্ত ১ হাজার ৭০০টি পরিবারের বাড়ি নদীতে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতি আর রাজনৈতিক নেতাদের সমন্বয়হীনতার কারণে আজ আমরা আমাদের অস্তিত্ব হারাতে বসেছি। শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ভাঙনকবলিত এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলে জরুরি প্রতিরক্ষার কাজ চলছে। ৭ কোটি ২০ লাখ টাকার ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। প্রয়োজনে আরো বরাদ্দ বাড়ানো হবে।

৮ দশমিক ৯ কিলোমিটার এলাকার স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য গত ২৬ আগস্ট বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান খুলনা শিপইয়ার্ড দরপত্র দাখিল করেছে। দরপত্র মূল্যায়নের পর ক্যাবিনেট কমিটিতে দরপত্র অনুমোদন দেওয়া হলে কার্যাদেশ প্রদান করা সম্ভব হবে। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে আগামী শুষ্ক মৌসুমে অর্থাৎ ডিসেম্বর মাস নাগাদ স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মানের কাজ শুরু করা যেতে পারে।

কেদারপুরের নাজমা বেগমের ঘর গেছে সাত দিন আগে। প্রতিবেশীর উঠোনে একটুকু জায়গায় খোলা আকাশের নিচে সন্তানদের নিয়ে অস্থায়ী আশ্রয় পেয়েছেন তিনি। কিন্তু এ জায়গাটিও আছে ভাঙনের হুমকিতে। নাজমা আক্ষেপ করে বলেন, ‘বিদেশি রোহিঙ্গাদের জন্য এত সাহায্যের কথা শুনি, কিন্তু এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে কেউ আসল না।’

পিডিএসও/তাজ