‘খাবার চাইনা, মাথা গোঁজার ঠাঁই চাই’

প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৭:১৯

শরীয়তপুর প্রতিনিধি

এখন চাল, ডাল আর তেল নয়। আশ্রয় ও পুনর্বাসনের দাবি ভাঙ্গন কবলিতদের। অব্যাহত পদ্মার ভাঙ্গনে প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। নড়িয়ার বাঁশতলা এলাকা এক সপ্তাহ বিরতির পর নতুন করে ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে। 
বুধবার দুপুর থেকে ২শ বসতঘর সরিয়ে নিয়েছে ভাঙ্গন কবলিতরা। ৪০টি পাকা ঘরসহ কয়েক হাজার গাছপালা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। দিশেহারা হয়ে পড়েছে ভাঙ্গন কবলিতরা। পুনর্বাসনের নেই কোন ব্যবস্থা। খোলা আকাশের নিছে খাওয়া দাওয়াও করতে হচ্ছে ভাঙ্গন কবলিতদের। প্রস্তুত করা হচ্ছে আশ্রয়ণ ও গুচ্ছগ্রাম।  

জানা যায়, গত এক সপ্তাহে সরকারি-বেসরকারি ভবনসহ মূলফতগঞ্জ বাজারের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বহু লোকের সাজানো গোছানো ঘরবাড়ী ভেঙেছে পদ্মা। সোমবার রাতে নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নতুন ভবনটির বেশিরভাগ অংশই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। হাসপাতাল ক্যাম্পাসের একটি আবাসিক ভবনে জরুরী বিভাগ ও বহিঃ বিভাগ চালু রাখা হলেও হাসপাতালে প্রবেশের সড়কটি বিলীন হয়ে যাওয়ায় ভয়ে কোন রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসছে না। হাসপাতালের আরো ১১টি ভবন ঝুঁকিতে রয়েছে। ফাটল দেখা দিয়েছে আরো একটি ভবনে।

হাসপাতালের সামনে দিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড বালুভর্তি জিও টেক্সটাইল ব্যাগ ফেলার কাজ অব্যাহত রেখেছে। ভাঙ্গন কবলিত ক্ষতিগ্রস্থরা বসত বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জিনিসপত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। বাজারগুলোর পাকা দোকানগুলো নিজেদের উদ্যোগে ভেঙ্গে ইট ও রড সরিয়ে নিচ্ছে। ভাঙ্গন কবলিতদের মিলেনি এখনও পূর্নবাসনের কোন ব্যবস্থা। আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটে বেড়াচ্ছে ভাঙ্গন কবলিত হাজার হাজার মানুষ। অনেকেই না খেয়ে পায়ের নিচে মাটি খুঁজে বেড়াচ্ছেন। খোলা আকাশের নিচে বাস করছেন অনেক পরিবার। 

ভাঙ্গন কবলিত মানুষ অভিযোগ করে বলেন, ‘শুনেছি মন্ত্রী এমপিরা এসেছে। তারা আমাদের কোন খোঁজ খবর নিলনা। আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে গেল না, এরা ভোটের সময় আসে তারপর তাদের দেখা যায়না। আমরা খাবার চাইনা, আমরা মাথা গোঁজার ঠাঁই চাই।’

কেদারপুর গ্রামে চোখের জল আর সব হারানোর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুফিয়া বেগম জানান, ২০ শতক জায়গার ওপর বড় বাড়ি ছিলো। মূলফতগঞ্জ বাজারে দোকান ছিল স্বামী সোহেল মিয়ার। সবই কেড়ে নিয়েছে পদ্মা। দুই মাসের ব্যবধানে ভালো অবস্থান থেকে আজ আমরা ঠিকানাহীন হয়ে পড়েছি।

নড়িয়া বাঁশতলা এলাকার মায়া বেগম বলেন, সর্বনাশা পদ্মা আমাদের সবাইকে এখন এক কাতারে দাঁড় করিয়েছে। স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, রাস্তা সবই চলে গেছে পদ্মায়। ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের থাকারও যায়গা নেই। 

কলেজ শিক্ষার্থী শোভন আহমেদসহ অনেকেই জানান, বাংলাদেশের মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদা। তার মধ্যে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা। আমরা মৌলিক চাহিদার চারটি থেকে বঞ্চিত। শুধু রয়েছে বস্ত্র। এমনভাবে নদী ভাঙতে থাকলে সব হারাতে হবে। আমরা শুধু খাবার চাইনা, আমরা মাথা গোঁজানোর ঠাঁই চাই। চাই দ্রুত বেড়ি বাঁধ।

শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, নদীর পানি না কমা পর্যন্ত তীর রক্ষা প্রকল্পের কাজ শুরু করা সম্ভব না। এ মূহুর্তে ভাঙন রোধ সম্ভব না হলেও বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে তীব্রতা কমানোর চেষ্টা চলছে। পানি কমলেই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে।

জেলা প্রশাসক (ডিসি) কাজী আবু তাহের বলেন, ইতোমধ্যে আশ্রয়কেন্দ্র ভাঙন কবলিতদের আশ্রয়ের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। ভাঙন কবলিত সব ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা হিসেবে চাল ও শুকনা খাবার দেয়া হয়েছে। আর পূর্নবাসন সহায়তা হিসেবে টিন ও নগদ টাকা দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

পিডিএসও/এআই