ইতিহাসের সাক্ষী অবিভক্ত বাংলার পঞ্চম গীর্জা

প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২০:৩৪ | আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২০:৩৮

ইমরান হোসেন সুজন, নবাবগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি

ঢাকার নবাবগঞ্জে বিভিন্ন ধর্মের লোকজন মিলেমিশে বসবাস করেন। প্রত্যেক ধর্মের মানুষের মধ্যে রয়েছে আত্মার মিল। জাতি, ধর্ম বা বর্ণ কোনো কিছুতেই নেই ভেদাভেদ। কোনো ঝামেলা ছাড়াই সকল ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালিত হয় মহা ধুমধামে। 

মুসলমানদের ঈদ, হিন্দুদের পূজা পার্বণ বা খ্রিষ্টানদের বড়দিন বা স্টার সানডেতে সকল ধর্মের মানুষই অংশগ্রহণ করে। নবাবগঞ্জ উপজেলায় মুসলমানদের যেমন রয়েছে ৪শ বছরের পুরানো ঐতিহ্যবাহী ভাঙা মসজিদসহ অসংখ্য মসজিদ, সনাতন ধর্মের দুই শতাধিকের উপরে মন্দির, তেমনি খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারিদের উপাসনা করার জন্য রয়েছে পাঁচটি দৃষ্টিনন্দন গীর্জা। নবাবগঞ্জ যে অসাম্প্রদায়িক একটি এলাকা তা বুঝার জন্য সেখানে বিভিন্ন ধর্মের বসবাসকারী লোকজনের মিল দেখেই সহজে অনুধাবন করা যায়। এখানেই অবস্থিত অবিভক্ত বাংলার পঞ্চম গীর্জা। যা নবাবগঞ্জের অন্যতম আকর্ষন। গীর্জাগুলো কালের সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

জানা যায়, নবাবগঞ্জের পাশ্ববর্তী দোহার উপজেলার মালিকান্দা ছিলো ঢাকা দক্ষিণে বসবাসকারী খ্রিষ্টানদের আদি বাসস্থান। পদ্মার ভাঙন ও অন্যান্য কারনে আনুমানিক ১৭৭০-৭৬ সালে মালিকান্দা থেকে নবাবগঞ্জের বান্দুরা ইউনিয়নের হাসনাবাদ গ্রামে এসে খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের লোকজন বসবাস করতে শুরু করেন। হাসনাবাদে ১৭৭৭ সালে ফাদার রাফায়েল গমেজ নামে এক যাজক এই অঞ্চলের প্রথম গীর্জা তৈরি করেন। 

যার নামকরন করা হয় ‘রানীর পবিত্র জপমালা গীর্জা বা “Queen’s Holy Rosary Church”। গীর্জাটিতে তখন পাঁকা ভবন ছিল না। ১৮৮৮ সালে প্রথমবারের গীর্জাটির সংস্কার করে পাঁকা ভবন তৈরি করা হয়। তখন গোল্লা, তুইতাল ও বক্সনগর ধর্মপল্লী হাসনাবাদের অধিনে ছিল। এটি অবিভক্ত বাংলা অঞ্চলের পঞ্চম গীর্জা বলে জানান স্থানীয়রা। যা নবাবগঞ্জের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে। ২০০২ সালে পূনরায় রানীর পবিত্র জপমালা গীর্জার সংস্কার করা হয়। 

প্রতি রবিবার স্থানীয় খ্রিষ্টান ধর্মভীরু লোকজন এখানে বিশেষ প্রার্থনায় জন্য একসাথে মিলিত হন। বর্তমান উপজেলায় আরো ৪টি গীর্জা নির্মিত হলেও যেকোন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এই গীর্জায় লোক সমাগম বেশি হয়। বড়দিন বা স্টার সানডে’র অনুষ্ঠান মহা ধুমধামে পালন করা হয় গীর্জাটিতে। দৃষ্টিনন্দিত এই গীর্জাটি ভ্রমন পিপাসুদের কাছে একটি আকর্ষনীয় স্থান। গীর্জা সংলগ্ন সুন্দর ও পরিপাটি করবস্থান। এর সামনে রয়েছে বিশাল খেলার মাঠ। যা গীর্জার সোন্দর্য্যকে আরো বিকশিত করেছে।

গীর্জার বর্তমান ধর্মযাজক ফাদার অমল বলেন, উপজেলার সবচেয়ে বড় এই পবিত্র গীর্জায় প্রতিদিনই ধর্মভিরুদের ভিড় থাকে। তবে রবিবার বিশেষ প্রার্থনা দিন বিপুল লোকের সমাগম ঘটে গীর্জাটিতে। এছাড়া গীর্জাটি এক নজর দেখতে প্রতিদিন দূরদূরান্তের লোকজন আসে। 

হাসনাবাদ সেন্ট ইউফ্রেজিস স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ সিস্টার মার্গ্রেট বলেন, নবাবগঞ্জ উপজেলা একটি অসম্প্রদায়িক এলাকা। এখানে সব ধর্মের মানুষই অত্যন্ত শান্তিতে বসবাস করছে। যেকোন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সব ধর্মের মানুষই সহযোগিতা করেন।   

এছাড়া আরো কয়েকটি গীর্জা রয়েছে নবাবগঞ্জে। ১৭৭৭ সালের পর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করতে থাকেন খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের লোকজন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৪৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে হাসনাবাদের পাশ্ববর্তী পুরাতন বান্দুরায় একটি গীর্জা তৈরি করা হয়। ১৮৪৫ সালে হাসনাবাদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পুরাতন বান্দুরায় নবনির্মিত্ত গীর্জায় যোগদান করে গোল্লা ও বক্সনগর ধর্মপল্লী। বেশ কয়েকবার স্থান বদল, পূনঃ নির্মাণ, একবার নাম বদলের পর ১৯৬৫ সালে বর্তমান গোল্লা গীর্জা ভবন তৈরি করা হয়। গীর্জার নামকরন করা হয় ‘সাধু ফ্রান্সিস জোভিয়ারের গীর্জা।’
 
১২০ বছর হাসনাবাদের অধীন থাকার পর ১৮৯৪ সালের ১৫ মে তুইতাল ধর্মপল্লী প্রতিষ্ঠিত হয়। তুইতাল ধর্মপল্লী প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত বকচরে আরেকটি গির্জা ছিল। কাল বৈশাখী ঝড়ে ধ্বংস হওয়ার ১৯২৪ সালে ‘পবিত্র আত্মার গীর্জা’ নামে একটি নতুন গির্জা নির্মিত হয়। প্রায় ৭০ বছর পর ১৯৯৩ সালে পুরানো গীর্জা ভেঙ্গে বর্তমানের গীর্জাটি নির্মাণ করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা এখন নতুন গীর্জায় ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করেন।

আঠারো গ্রামের গোল্লার অধীন আরেকটি ধর্মপল্লী বক্সনগর। ১৮৯৪ সালে বক্সনগরে নির্মাণ করা হয় ‘পাদুয়ার সাধু আন্তনীর গীর্জা’। এটি বক্সনগরের প্রথম গীর্জা। গীর্জা ভবনটি বর্তমানে বিদ্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। গীর্জার পাশেই রয়েছে কবরস্থান। পুরানো গীর্জা থেকে মিনিট তিনেক হাটলেই নতুন গীর্জা। ২০০৫ সালে পুরানো গীর্জার অনুকরনে নতুন গীর্জাটি তৈরি করা হয়। চারদিকের গাছপালার মাঝে সুন্দর গীর্জাটি দেখলে যে কারও মন ভালো হয়ে যাবে। 

সোনাবজু আঠারো গ্রামের খ্রিষ্টান অধ্যুষিত এলাকা থেকে বেশ পশ্চিমে একটি নিরিবিলি সুন্দর গ্রাম। এখানেই ১৯৪৫ সালে তুইতাল ধর্মপল্লীর অধীনে একটি গির্জা প্রতিষ্ঠিত হয়। পুরানো গীর্জাটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়লে ১৯৮১ সালে নতুন গীর্জা ভবন নির্মাণ করা হয়। বর্তমান এটি ‘ফাতেমা রানীর গির্জা’ নামে পরিচিত। এই গীর্জার প্রাকৃতিক পরিবেশ যে কাউকে মুগ্ধ করবে। গীর্জার ভিতরে বসেই আপনি শুনতে পাবেন পাখির কিচিমিচি ডাক। হাসনাবাদ ধর্মীপল্লীর অধিনে ইকরাশিতে হাসনাবাদের অধীনে ২০০৩ সালে ‘সাধু যোসেফ চ্যাপেল’ এর নামে একটি গীর্জা নির্মাণ করা হয়। এটি দোহারের একমাত্র গীর্জা।

বান্দুরা ইউপি চেয়ারম্যান হিল্লাল মিয়া বলেন, ‘রানীর পবিত্র জপমালা গীর্জা নবাবগঞ্জের একটি ঐহিত্য। আর এটি আমার ইউনিয়নে হওয়ায় আমি সব সময় চেষ্টা করি গীর্জার কর্তৃপক্ষকে সহযোগীতা করতে। বান্দুরা ইউনিয়নের মুসলিম, হিন্দু ও খ্রিষ্টান ধর্মাবলীর লোকজন অত্যন্ত শান্তিতে বাস করছে। সবার সাথে সবার রয়েছে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।


পিডিএসও/ এআই