অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, ১০ দিনের নবজাতককে ফেলে গেলেন মা!

প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০১৮, ১৩:৪৩

বালিয়াডাঙ্গী(ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি

ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীতে স্বামীর কাছ থেকে ভরণ-পোষণের খরচ আদায়ের জন্য ১০ দিনের কন্যা শিশুকে এক গ্রাম পুলিশের বাড়ির পার্শ্বে বাঁশঝাড়ে রেখে চলে গেছেন মা। রোববার সকাল ১০টায় উপজেলা ভানোর ইউনিয়নের বাঙ্গাটুলি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। সোমবার দুপুরে এ সংবাদ লেখা পর্যন্ত নবজাতক কন্যা শিশুটি গ্রাম পুলিশের বাড়িতেই রয়েছে। 

উপজেলার ভানোর ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ জাহাঙ্গীর আলমের ২য় স্ত্রী দাবি করছেন ওই নবজাতকের মা রেহেনা বেগম । কিন্ত গ্রাম পুলিশ জাহাঙ্গীর আলম বিষয়টি অস্বীকার করে বলছেন রেহেনা বেগমের সাথে বিয়ে হয়েছিল কিন্তু সে নিজেই তাকে তালাক দিয়েছেন। এখন রেহেনা বেগম আমার স্ত্রী নয়, শিশুটি আমার নয়, অন্য কেউ এ শিশুর বাবা বলে দাবি করছেন গ্রাম পুলিশ জাহাঙ্গীর আলম।  

সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় লোকজনদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গ্রাম পুলিশ জাহাঙ্গীর আলমের সাথে ওই এলাকার মৃত খলিপউদ্দীনের মেয়ে রেহেনা বেগমের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। স্থানীয় লোকজন তাদের দুজনকে গভীর রাতে অসামাজিক অবস্থায় আটক করলেও জাহাঙ্গীর আলমের পুর্বের স্ত্রী ও ২ সন্তানের কথা বিবেচনা করে তাকে ছেড়ে দেয়। 

কিন্তু জাহাঙ্গীর তার দুদিন পরেই তার প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে ২০১৮ সালের ০৬ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁও নোটারী পাবলিক এফিডেভিট মুলে বিবাহ করে। বিবাহের পর তিন মাস স্বামীর বাড়িতে এবং তিন মাস রেহেনার নিজ বাবার বাড়িতে জাহাঙ্গীরের দেয়া ভরণ-পোষণে সংসার করেছেন রেহেনা বেগম। গত ২ মাস ধরে ভরণ পোষণ দেয়া বন্ধ করেন জাহাঙ্গীর। গত ১০ আগস্ট বাচ্চা প্রসবের পর কোনও খোঁজ খবর নেয়নি রেহেনার স্বামী। তাই বাধ্য হয়ে নিজ স্বামীর বাড়ীতে বাচ্চা নিয়ে স্ত্রী অধিকার আদায় করতে গেলে তাকে মারপিট করে বের করে দেয় জাহাঙ্গীর ও তার পরিবারের লোকজন। এ সময় রেহেনা তার ১০ দিনের কন্যা সন্তানকে বাড়ির পার্শ্বে বাঁশঝাড়ে ফেলে দিয়ে আসেন। 

রেহেনা বেগম বলেন, দীর্ঘ এক বছর রাত্রে ডিউটি করার ফাঁকে আমার সাথে রাত কাটায় জাহাঙ্গীর। আমি অন্তঃস্বত্তা হয়ে পড়লে তার স্ত্রীসহ আমাকে নিয়ে গিয়ে জোর করে বিয়ে করে জাহাঙ্গীর। এরপর সুখেই ছিলাম আমি। কিন্তু গত ২ মাস ধরে আমার ভরণ-পোষণ খরচ এমনকি আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় সে। গত ১০ দিন আগে আমার বাচ্চা প্রসবের পর আমি একবারে অসহায় হয়ে পড়ি। এতে বাধ্য হয়ে আমি বাচ্চাসহ আমার স্বামীর বাড়িতে থাকার চেষ্টা করলে আমাকে মারপিট করে তাড়িয়ে দেয় আমার স্বামী ও তার ১ম স্ত্রী। এ সময় শারীরিক অসুস্থ্ হয়ে পড়লে বাচ্চা ফেলে চলে আসি। 

রেহেনা বেগম আরও বলেন, আমি বালিয়াডাঙ্গী হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর স্থানীয় থানায় এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট গিয়েছিলাম। তারা বিষয়টি সমাধান করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। 

রেহেনা বেগমের প্রতিবেশী খাদেমুল ইসলাম জানান, গ্রাম পুলিশ দীর্ঘদিন রেহেনার সাথে রাত্রিযাপন করেছেন। স্থানীয় লোকজন বিষয়টি নিষেধ করলে জাহাঙ্গীর রেহেনাকে বিয়ে করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। সে সময় বিয়ে করতে না পারায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করবে এমন হুমকিও দিয়েছিল জাহাঙ্গীর। 

গ্রাম পুলিশ জাহাঙ্গীর আলম বিয়ের কথা স্বীকার করে বলেন, বিয়ের পর স্বামীর কথা মানতেন না রেহেনা বেগম। এমনকি ১৫ মে আমাকে এফিডেভিট মুলে নিজে তালাক দিয়েছে। ডাকযোগে তালাকের কাগজপত্র পাওয়ার পর ভরণ-পোষণের খরচ বন্ধ করে দেই আমি। 

তিনি আরও বলেন, আজকে স্থানীয় কিছু লোকের বুদ্ধিতে আমার বাড়ির পার্শ্বে বাঁশঝাড়ে তার ১০ দিনের শিশু রেখে যায় রেহেনা। 

খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, তালাকের বিষয়টি জানেন না রেহেনা বেগম। তার কাছ থেকে অন্য একটি জমি সংক্রান্ত মামলার আপোষ মীমাংসার কথা বলে স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েছেন গ্রাম পুলিশ জাহাঙ্গীর আলম। পরে সেটি তালাক নামা হিসেবে প্রমাণ করতে চাইছেন। 

এ জটিলতা নিরসনের জন্য রেহেনা বেগম বাদী হয়ে গ্রাম পুলিশ জাহাঙ্গীর ও তার পরিবারের লোকজনকে আসামিকে বিজ্ঞ আদালতে একটি নারী ও শিশু নির্যাতন এবং একটি ১০৭ ধারার মামলাও করেছেন। যাহা বিজ্ঞ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। ভানোর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ওহাব সরকার বলেন, বাচ্চা ফেলে যাওয়ার বিষয়টি তিনি জানেন না। তবে এ আগে সমস্যাগুলোর সমাধাণের চেষ্টা করেছেন তিনি, কিন্ত লাভ হয়নি বলে জানান। 

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা নির্বাহী অফিসার আ: মান্নান বলেন, বাচ্চাটি নিয়ে গ্রাম পুলিশ জাহাঙ্গীর আমার দপ্তরে এসেছিল। উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার মাধ্যমে বর্তমানে বাচ্চাটির একটি সু-ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সেই সাথে বিষয়টি দ্রুত মীমাংসা করার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।  

পিডিএসও/রিহাব