পাবনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০১৮, ২০:১৭ | আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০১৮, ২০:৫৫

পাবনা প্রতিনিধি

১৯৫৩ থেকে ১৯৭৩ সাল। এই ২০ বছরে প্রায় ১০ বার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাবনায় জেলায় এসেছেন। কখনো সাংগঠনিক সফরে, কখনো নির্বাচনী সফরে। কখনো এসেছেন রাষ্ট্রীয় সফরে। কখনো এসেছেন আনন্দ নিয়ে। একাধিক বার এসেছেন ব্যথা আর বেদনা নিয়ে। বঙ্গবন্ধু পাবনাকে ভালবাসতেন  ভালবাসতেন পাবনার মানুষকে। পাবনায় তাঁর একমাত্র ছোট ভাই শেখ নাসের এর শশুর বাড়ী। পাবনায় একাধিক জন ছিলেন, তাঁর শিক্ষা জীবনের সহপাঠী, বাল্যবন্ধু এবং রাজনৈতিক সহযোদ্ধা। ছাত্র নেতা থেকে শ্রমিক নেতা, যুব নেতা, জননেতা সহ শতাধিক নেতাকে নাম ধরে ডাকতেন। নিজ দল আওয়ামী লীগ ছাড়াও ন্যাপ, কমিউনিষ্ট পার্টি সহ বিভিন্ন দলের নেতাদের সাথে ছিল তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং ঘনিষ্ঠতা। পাবনার সাংবাদিক, সাহিত্যিক, শিল্পী, গুনীজন কেউ বঙ্গবন্ধুর ভালবাসা থেকে বাদ পড়েন নাই। যা তাঁর কথায়, লেখায় এবং বক্তৃতায় উঠে এসেছে।

১৯৫৩ সালে তরুন আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম পাবনায় এলেন সাংগঠনিক সফরে। সাথে প্রবীন আওয়ামী লীগ নেতা আতাউর রহমান খান । পাবনায় সংগঠনকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষের সাথে মত বিনিময় করেন। অনেকে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিপক্ষে আওয়ামী লীগে যোগ দেবার প্রস্তাবে মত বা সাড়া দিলেন না। আবার অনেকেই মত এবং সাড়া দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিলেন। যোগ দিলেন পাবনা উকিল বারের তরুন আইনজীবি ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, সৈয়দ ফজলে এলাহী আব্দুর রব বগা মিয়া, তৎকালীন এডওয়ার্ড কলেজের ভিপি আব্দুল মমিন তালুকদার প্রমূখ। শুরু হলো পাবনায় আওয়ামী লীগের নব যাত্রা।

১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২য় বার পাবনা সফরে এলেন। সেই সফরে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শেরে বাংলা আবুল কাসেম ফজলুল হক প্রমুখ নেতৃবৃন্দ পাবনায় এসেছিলেন। উল্লেখ্য সেই নির্বাচনে পাবনা সদর থেকে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সেলিনা বানু প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। উক্ত নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট প্রার্থীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে তাঁরা সরকার গঠন করেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মন্ত্রী হয়েছিলেন।

১৯৬২ সালে ১৫ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাবনার ঈশ্বরদীতে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনের প্রচারনা সভায় এসেছিলেন। সেই সভায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হোসেন সরকার, শাহ আজিজুর রহমান সহ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ এসেছিলেন। সেই নির্বাচনে পাবনা থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোঃ আমজাদ হোসেন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ সদস্য ( এম,এন,এ) নির্বাচিত হয়েছিলেন। ঐ একই বছরের ৭ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু আবার পাবনা সফরে এসেছিলেন। সেবার পাবনা স্টেডিয়ামে বিশাল জনসভায় ভাষন দিয়েছিলেন। ১৯৬৪ সালের ৯ মে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আবার পাবনায় এসেছিলেন। সেবার প্রধান অতিথি হিসেবে পাবনা টাউন হল মাঠে জনসভায় ভাষন দিয়েছিলেন।

১৯৬৬ সালের মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের লাহোরে গোলটেবিল বৈঠকে পুর্ব পাকিস্তানে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার দাবীতে ৬ দফা পেশ করেন। বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা ঘোষনার সাথে সাথে তৎকালীন সামরিক শাসক আইয়ুব খান এবং তাঁর সরকারের টনক নড়ে উঠে। পুর্ব পাকিস্তানে ছাত্রলীগ ১১ দফা ঘোষনা করে। তৎকালীন আওয়ামী লীগের ৬ দফা এবং ছাত্রলীগের ১১ দফা ঘোষনার পর পুর্ব বাঙলার ছাত্র, শ্রমিক এবং সাধারন মহলে ব্যাপক সাড়া পড়ে। এরপর ১৯৬৬ সালের ৭ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাবনা সফরে আসেন। ঐদিন নগরবাড়ী ঘাটে হাজার হাজার জনতা বঙ্গবন্ধুকে সংবর্ধনা প্রদান করে পাবনা শহরে নিয়ে আসেন। বিকালে পাবনা টাউন হল মাঠে বিশাল জনসভা। পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোঃ আমজাদ হোসেন এর সভাপতিত্বে এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক আব্দুর রব বগা মিয়ার পরিচালনায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন, তাজউদ্দিন আহমেদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, মিজানুর রহমান চৌধুরী প্রমুখ। সেদিন বঙ্গবন্ধু হাজার হাজার জনতার সামনে প্রথম ৬ দফা ঘোষনা করেন। পাবনার মানুষ মুহুমুহু করতালির মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা ঘোষনার প্রতি হাত তুলে সমর্থন জানিয়েছিলেন। পাবনায় ৬ দফা ঘোষনার কয়েকদিন পরই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়।

১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাগারে আটক রাখা হয়েছিল । পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান তাঁর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগ এনে বিচার শুরু করেছিলেন। পাকিস্তানী শাসকরা চেয়েছিল দ্রুত বিচার কাজ সম্পন্ন করে বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করবেন। কিন্তু সেটা তারা সফল হতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করার পর থেকে দেশে বিদেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। দেশেও শুরু হয় তীব্র গন আন্দোলন। অবশেষে ৬৯ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে আইয়ুব খানের ১০ বছর শাসনের পতন ঘটে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জেলখানা থেকে মুক্তি লাভ করেন।

উল্লেখ্য যে, মুক্তিলাভের পরই ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে ছাত্র জনতার সংবর্ধনা প্রদান অনুষ্ঠানে তাঁকে বঙ্গবন্ধু উপাধীতে ভূষিত করা হয়।

পিডিএসও/রানা