সিলেট মহানগর

দেড়শ বছরের শতাধিক ভবন এখন মৃত্যুকূপ

প্রকাশ : ১৩ মে ২০১৮, ১০:২৪

এম এ রউফ, সিলেট

সিলেটে ঝুঁকিপূর্ণ দেড়শ বছরের শতাধিক ভবন এখন মৃত্যুকূপ! সিলেট অঞ্চলে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত জরাজীর্ণ ভবনের সংখ্যা কত— তার হিসাব নেই সিলেট সিটি করপোরেশন ও গণপূর্ত বিভাগে। তবে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব উদ্যোগে ২০০৬ সালে পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, সিলেটে ১০০ থেকে ১৫০ বছরের প্রাচীন শতাধিক ভবন রয়েছে। শুধু সিলেট মহানগরেই এ ধরনের স্থাপনা রয়েছে শতাধিক। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এসব স্থাপনায়।

সিলেট মহানগরে ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনাগুলো হচ্ছে— সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার, জেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তার কার্যালয়, কাস্টমস অফিস, সিলেট সাব-পোস্ট অফিসের ফরেন রেমিট্যান্স ভবন ও সিটি মার্কেট। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এসব জরাজীর্ণ ভবন এখন অনেকটা মৃত্যুকূপ। প্রায় ৪ বছর আগে সিলেট সুরমা মার্কেট ভবন জিন্দাবাজার রাজাম্যানশন ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের একটি ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মহানগর ভবনের পাশেই সিলেট সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন সিটি মার্কেট ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয় আট বছর আগে।

২৪ বছর আগে ১৯৮৬ সালে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের অধিকাংশ স্থাপনাই ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষিত হয়। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত জরাজীর্ণ দোতলা ভবনে জেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়, জিন্দাবাজারে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা ও কাস্টমস অফিসের কার্যক্রম চলছে। মহানগরের দক্ষিণ সুরমার বঙ্গবীর রোডে জরাজীর্ণ ভবনে চলছে সিলেট সাব-পোস্ট অফিসের ফরেন রেমিট্যান্স শাখার কার্যক্রম।

২০১৭ সালের প্রথম দিকে মেয়াদোত্তীর্ণ ভবনগুলোর ওপর আইনি নোটিশ জারি করলেও এখন পর্যন্ত সিসিকের কোনো জোরালো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সিটি করপোরেশনের অবহেলায় বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা সিলেটে ভবনধসে মারাত্মক প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে।

এদিকে সিলেট মহানগর ও তৎপার্শ্ববর্তী এলাকার ২৪ হাজার ভবনে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে বিশাল জনগোষ্ঠী। রিখটার স্কেলে ৬ থেকে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলেই এসব ভবন ধসে পড়বে। পরিস্থিতি হবে ভয়াবহ। জনমানবশূন্য বিরানভূমিতে পরিণত হতে পারে সিলেট মহানগরসহ বেশ কিছু এলাকা। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ভবন কোড না মেনে সুউচ্চ স্থাপনা নির্মাণের ফলে মাঝারি মাত্রার ভূকম্পন হলেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে সিলেট মহানগর।

২০০৯ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি (সিডিএমপি) পরিচালিত জরিপে উল্লেখ করা হয়, সিলেট অঞ্চলে ৫২ হাজার ভবন রয়েছে। এর মধ্যে ২৪ হাজার ভবনই ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ। সে সময় ওই জরিপের ফলাফল আশঙ্কাজনক বলে মন্তব্য করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বিল্ডিং কোড অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিলেও আজও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এজন্য ভূমিকম্পকে ‘স্ট্যান্ডিং অর্ডার অব ডিজাস্টার’ (এসওডি)-এর অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছিলেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ রোধে ভবন নির্মাণবিধি কার্যকর হয়নি। সর্বোচ্চ আদালত নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও এই বিধি (ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড) বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এ ব্যাপারে আইন হয়েছে প্রায় এক যুগ আগে। কিন্তু আইনটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেই। ফলে শহর এবং গ্রামে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে ভবন। বাড়ছে নানা ধরনের ঝুঁকি।

১৯৯৬ সালে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানে বিল্ডিং কোড অনুসরণ করার নির্দেশনা প্রদান করে। তবে তার কোনো বাস্তবায়ন নেই। পরে ২০০৬ সালে সরকার এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি গেজেট আকারে প্রকাশ করে। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিল্ডিং কোডটি বাস্তবায়ন করা হয়নি। এদিকে বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের অনুমতি নেওয়া হলেও নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ হয় না অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। দ্বিতল ভবনের অনুমতি নিয়ে ৫ তলা ভবন নির্মাণ করলেও তা তদারকির কেউ নেই। তাছাড়া মহানগরের অধিকাংশ ভবন নির্মিত হয়েছে ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুসরণ না করেই। সয়েল টেস্ট ছাড়া এসব ভবন নির্মাণের কারণে ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সিভিল ডিফেন্স অ্যান্ড ফায়ার সার্ভিস সিলেটের সহকারী পরিচালক তনয় বিশ্বাস জানান, সিলেট মহানগরের তেলিহাওরের ফায়ার স্টেশনে কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা মাত্র ৩৫ জন। এ ছাড়া নগর পার্শ্ববর্তী দুটি উপজেলায় এ বিভাগের আরো ৪৯ জন কর্মরত রয়েছেন। ভূমিকম্পের মতো ভয়াবহ দুর্যোগ ও পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথেষ্ট লোকবল বা সরঞ্জামাদি নেই। তবে আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য গত ৩ বছরে প্রায় ২ হাজার স্বেচ্ছাসেবক তৈরি করা হয়েছে।

পিডিএসও/তাজ