মাজারে শপথ করে বিয়ের হিড়িক!

প্রকাশ : ১৩ মে ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৩ মে ২০১৮, ১১:৩৮

শরীফুল রুকন, চট্টগ্রাম

সাদিয়া ও আরমান (ছদ্মনাম)। তারা প্রথমে ছিলেন পোশাক কারখানায় সহকর্মী, তারপর মন দেওয়া-নেওয়া। একপর্যায়ে দুইজনে চট্টগ্রামের শাহ আমানত মাজারে গিয়ে ‘শপথ করে বিয়ে’ করে ফেললেন। মাস তিনেক ভালোই কাটল, তারপর মনোমালিন্য, কথা-কাটাকাটি। চূড়ান্ত পরিণতি মুখের কথায় ‘বিচ্ছেদ’। নিয়ম অনুযায়ী এভাবে বিয়ে ও বিচ্ছেদ সঠিক কিনা? আরমানের পাল্টা প্রশ্ন, এভাবে বিয়ে সঠিক হয়নি? ভুল হলে আমার কী করা উচিত? অন্যদিকে আরমানের প্রতি কোনো অভিযোগ নেই সাদিয়ারও।

মাজারে গিয়ে শপথ করে বিয়ে ও মুখের কথায় বিচ্ছেদ নিয়ে আইনি প্রতিকার চাওয়ার-পাওয়ার সুযোগ থাকলেও এ ব্যাপারে সাদিয়ার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। যেন বিষয়টিকে নিয়তি বলে মেনে নিয়েছেন। দুইজন একসঙ্গে বায়েজিদ এলাকায় একই প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিকভাবে কাজ করছেন এখন, থাকছেন শেরশাহ এলাকায়। ঘটনা কী? সাদিয়ার উত্তর, আমরা আর স্বামী-স্ত্রী নেই, যে যার মতো করে ভালো আছি। কোথায় অভিযোগ করব? সব খানে তো টাকা ছাড়া কিছু হয় না। সাদিয়া ও আরমানের মতো নিম্ন আয়ের অসংখ্য মানুষজন এভাবে বিভিন্ন মাজারে গিয়ে কথিত ‘বিয়ে’ করার দিকে ঝুঁকছেন। তাদের মধ্যে কিছুসংখ্যক আছেন, যারা মাজারকে ভক্তি-শ্রদ্ধা করে অজ্ঞতাবশত এভাবে সম্পর্কে জড়াচ্ছেন।

তবে পুলিশ বলছে, বেশিরভাগ ছেলেই প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে মাজারে গিয়ে মেয়েদের কথিত বিয়ে করছেন। তাদের কেউ কেউ মাজারে আল্লাহকে সাক্ষী রেখে শপথ করে বিয়ে করছেন। আর কেউ বিয়ে করছেন মাজারের নানা স্থাপনা ছুঁয়ে শপথ করে। মাজারে গিয়ে কোরআন ধরেও অনেকে ওয়াদা করেন। আবার ওয়াদা ভঙ্গ হয়েছে দাবি করাসহ নানা কারণ দেখিয়ে অনেকে কিছুদিন পর তালাকও দিয়ে দেন। নানা হয়রানির আশঙ্কায় ভুক্তভোগীরা বেশিরভাগ সময় পুলিশকে এসব বিষয়ে অভিযোগও করছেন না।

এদিকে এক তরুণীর অভিযোগের ভিত্তিতে গত বুধবার এক যুবককে আটক করে চট্টগ্রামের সদরঘাট থানার পুলিশ। তখন জিজ্ঞাসাবাদে ওই যুবক পুলিশকে জানান, তিনি তরুণীকে ফেলে যাননি। তারা শাহ আমানত মাজারে গিয়ে বিয়ে করেছেন এবং ওই তরুণী তার স্ত্রী, তারা একসঙ্গে আবারো সংসার করতে চান। এরপর পুলিশ বিয়ের কাগজপত্র দেখতে চাইলে ওই যুবক জানান, মাজারে শপথ করে বিয়ে করায় কোনো কাগজপত্র নেই। তখন পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে বলেন, মাজারে শপথ করে বিয়ের কোনো বৈধতা নেই। এরপর যুবকটি পুলিশকে জানায়, প্রয়োজনে সঠিকভাবে কাবিন করে বিয়ে করতে সে রাজি। তবে শেষ পর্যন্ত সেই বিয়ে আর হয়নি, তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ।

এ প্রসঙ্গে সদরঘাট থানার ওসি নেজাম উদ্দিন বলেন, এক তরুণী তার অভিভাবকসহ থানায় এসে অভিযোগ করেছিল, বিয়ের দুই মাস পর স্বামী তাকে ফেলে চলে গেছে, যোগাযোগ রাখছে না। তখন ওই ছেলেটিকে আটক করে থানায় নিয়ে আসা হলে সে জানায়, তারা মাজারে শপথ করে বিয়ে করেছে। প্রকৃত পক্ষে সে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েটির সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তাই তাকে বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের অভিযোগের মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠিয়েছি।

তিনি বলেন, বিভিন্ন মাজারে এ রকম হাজার হাজার বিয়ে হচ্ছে। নিম্ন আয়ের লোকজনই এসব করছে। মূলত প্রতারণা করতেই এসব করছে। সেখানে শপথ করে বলছে, আজকে থেকে আমরা স্বামী-স্ত্রী। এতটুকুই। কিন্তু আইন অনুযায়ী এভাবে তো বিয়ে হয় না, বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ হচ্ছে।

মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন ১৯৭৪ অনুযায়ী, কার সঙ্গে কার কত তারিখে কোথায়, কত দেনমোহর ধার্য, কী কী শর্তে বিয়ে সম্পন্ন হলো, সাক্ষী ও উকিলের নাম প্রভৃতির একটি হিসাব সরকারি নথিতে লিখে রাখাই হলো নিবন্ধন। বিয়ে নিবন্ধন করা না হলে আইনগত কোনো ভিত্তি থাকে না। ধারা ৫(২) অনুযায়ী, বিয়ে নিবন্ধন করার দায়িত্ব মূলত স্বামীর। মুসলিম বিবাহ ও তালাক বিধিমালা-২০০৯ এর ২১ বিধি অনুযায়ী বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন ফি বাবদ একজন রেজিস্ট্রার ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত দেনমোহরের ক্ষেত্রে প্রতি ১ হাজার টাকায় ১২ টাকা ৫০ পয়সা হারে বিবাহ নিবন্ধন ফি আদায় করতে পারবেন। দেনমোহরের পরিমাণ ৪ লক্ষাধিক হলে পরবর্তী প্রতি ১ লাখ টাকা দেনমোহরের জন্য ১০০ টাকা বিবাহ নিবন্ধন ফি আদায় করতে পারবেন।

চট্টগ্রাম ফাইট ফর উইমেন রাইটসের সভাপতি, নারীনেত্রী অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু বলেন, নিবন্ধন বা কাবিননামা যদি না থাকে তবে আইনগত অধিকার আদায় করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এছাড়া উপযুক্ত সাক্ষীর উপস্থিতি ছাড়া কখনোই বিয়ে সম্পন্ন হবে না। মাজারে কাবিন ছাড়া বিয়েগুলো আগে বেশি হতো। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগী হচ্ছে শুধু মেয়েরা। এখন মেয়েরা কিছুটা সচেতন হয়েছে। তবে এ বিষয়ে আরো সচেতন করতে বিশেষ করে পোশাক কারখানা ও বস্তি এলাকাগুলোতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কর্মসূচি নেয়া দরকার।

পিডিএসও/তাজ