মেঘনা ও গোমতী সেতু : কিছুতেই কাটছে না যানজট

টোল আদায়ে ধীরগতি ও অবহেলা | অতিরিক্ত ওজনে টাকা আদায় নিয়ে বাকবিতণ্ডা | হাইওয়ে পুলিশের কর্তব্যে অবহেলা

প্রকাশ : ২২ মার্চ ২০১৮, ১৫:৩৫

হাসান ইমন, মেঘনা ও গোমতী সেতু ঘুরে এসে
মেঘনা ও গোমতী সেতুতে যানজট লেগেই থাকে। মেঘনা সেতুর সংযোগ সড়ক থেকে তোলা

কুমিল্লার দাউদকান্দি ও মেঘনা এলাকার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজট নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিনই এই সড়কের গোমতী ও মেঘনা সেতুর দুই পাশে লেগেই থাকছে ৫-১০ কিলোমিটার জুড়ে যানজট। চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের। নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা। পুড়ছে যানবাহনের অতিরিক্ত জ্বালানি। পরিবহন মালিকদের ব্যয় হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ। নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা দেখা দিচ্ছে সবার। ঘটছে চুরি ছিনতাইয়ের ঘটনা।

এই যানজট নতুন নয়। কয়েক বছরের পুরনো। দেখার কেউ নেই— এমন অভিযোগ ওই সড়কে নিয়মিত চলাচলকারীদের। কিন্তু কেন? জানতে চাইলে চালক, যাত্রী ও হাইওয়ে পুলিশ বলে, মূলত সেতু কর্তৃপক্ষের টোল আদায়ের ধীরগতির কারণেই এমন যানজট লেগে থাকে। যানজটের জন্য পরিবহন চালকরাও দায়ী। কারণ চালকরা টোলের হার জানেন। তারপরও নির্দিষ্ট পরিমাণ ভাংতি টাকা না রেখে ৫০০ অথবা এক হাজার টাকার নোট দেন। সেক্ষেত্রে টোল আদায়কারীদের নির্দিষ্ট টোল রেখে বাকি টাকা ফেরত দিতে সময় লেগে যায়। এতে পেছনে গাড়ির সারি দীর্ঘ হতে থাকে।

এমনকি নির্ধারিত ওজনের চেয়ে বেশি মালামাল নেওয়া ট্রাকগুলোও যানজটের অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া টোল আদায়ে কর্তৃপক্ষের অবহেলা, হাইওয়ে পুলিশের কাজে ধীরগতি, চালকদের একগুঁয়েমি ও উল্টো পথে গাড়ি চালানোকেও যানজটের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন তারা।

এই দুই সেতুর যানজট নিরসনে বিশেষজ্ঞরা উন্নত টোল ব্যবস্থাপনার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, সেতু কর্তৃপক্ষের উচিত টোল বক্স দূরে সরিয়ে নেওয়া। ওজন স্কেলও সেতু থেকে দূরে বসানো। তাছাড়া যেহেতু ওজন স্কেলে কেবল ট্রাক পরিমাপ করতে হয়, তাই ট্রাকের জন্য আলাদা লাইন বা স্থান নির্ধারণ করা যেতে পারে। ট্রাকের কারণে অন্য যাত্রীদের যানজটের মুখে পড়া কাম্য নয়। এছাড়া চালকরা যাতে করে টোল আদায়ে ভাংতি টাকা দেয় সে বিষয়ে কঠোর হওয়া ও হাইওয়ে পুলিশের কর্মতৎপরতা আরো বাড়াতে হবে। কর্তৃপক্ষ চাইলে দ্রুতই এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, যাতায়াত অব্যবস্থাপনার জন্য চালক, পুলিশ ও টোল কর্তৃপক্ষ দায়ী। চালকদের সচেতন না হওয়া, পুলিশের কাজের ধীরগতি ও টোল প্লাজা কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে দুই সেতুতে যানজট হচ্ছে। এদের সবাই যদি একটু সচেতন হয়, তাহলে যানজট অনেকটা কমবে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।

তিনি আরো বলেন, উন্নয়ন করতে হলে আগে মূল সমস্যা সমাধান করতে হবে। কিন্তু আমরা আগে রাস্তা করেছি, এখন সেতু নির্মাণ করছি। এতে যানজট কমবে কিভাবে? বিশ্বের অন্যান্য দেশের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, তারা আগে সমস্যা চিহ্নিত করে, পরে মূল সমস্যাকে প্রধান করে সমাধানের উদ্যোগ নেয়। কারিগরি দৈন্যতার কারণে মানুষের ভোগান্তি কমছেই না।

উল্লেখ্য, গোমতী ও মেঘনা সেতু দিয়ে কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলার যানবাহন ঢাকায় চলাচল করে। দক্ষিণাঞ্চলে যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ এই দুই সেতু দিয়ে যাত্রীবাহী ও মালবাহী যানসহ সব ধরনের যানবাহন চলাচল করে। চলে বড় বড় ট্রেইলার। ফলে এই সড়ক ও সেতু দুটি কেবল চলাচলের জন্যই নয়; অর্থনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগের একমাত্র সড়ক পথ এটি। এই দুই সেতু দিয়েই সাধারণ মানুষের পাশাপাশি প্রতিদিন পারাপার হতে হয় ব্যবসায়ী, রাজনীতিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের।

যানজটের কারণ কি— জানতে চাইলে হাইওয়ে পুলিশ, যানচালক ও মালিক এবং যাত্রীরা বলেন, গোমতী সেতুর ওজন পরিমাপক স্কেল ও টোল প্লাজায় টিকিট দিতে ধীরগতি, টাকা আদায় নিয়ে চালকের সঙ্গে দালালের বাগ্?বিতন্ডা, দুই সেতুর ওপর দিয়ে অতিরিক্ত মালবাহী যানের ধীরগতিতে চলাচল, সেতুর ওপর বিকল হয়ে পড়া এবং ট্রাফিক আইন না মানা— এই যানজটের কারণ।

এছাড়া টোল প্লাজার আগে সড়কে স্থাপিত ট্রাকসহ মালবাহী বিভিন্ন যানের ওজন মাপার জন্য ওজন পরিমাপক স্কেলে ত্রুটি দেখা গেছে। ফলে সঠিক ওজন নিয়ে চালকদের সঙ্গে টোল আদায় কর্তৃপক্ষের বাক-বিতন্ডা লেগেই থাকে। এর ফলেও যানজট দেখা দেয়।

সরজমিনে গিয়ে টোল প্লাজায় এক ধরনের দালালের দৌরাত্ম্য দেখা গেছে। বিশেষ করে রাতে এসব দালালের দৌরাত্ম্য সীমাহীন হয়ে ওঠে। কিন্তু এসব দালাল কেন- জানতে চাইলে এক টোল আদায়কর্মী বলেন, সাধারণত ট্রাকগুলো নির্দিষ্ট ওজনের চেয়ে অতিরিক্তি মাল বহন করে। ওজন স্কেলে সেটি ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট চালককে জরিমানা গুনতে হয়। এই জরিমানা কমাতে এই দালালদের শরণাপন্ন হন চালকরা। এটার জন্য অনেক সময় লেগে যায়। কখনো এসব ট্রাক বা লরিকে রাস্তার পাশে রাখা হয়। কখনো রাস্তায় রেখেই দরকষাকষি চলে। এমনকি ওজন মাপার পরও চালকরা তা মানতে নারাজ হন। তখন টোল কর্তৃপক্ষ চালকদের পুনরায় ওজন মাপতে বাধ্য করেন। এটাও যানজটের অন্যতম একটি কারণ।

সংশ্লিষ্টরা আরো জানান, একটু দ্রুত যাওয়ায় আশায় কিছু প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও বাসের উল্টো পথে চলার কারণেও টোল প্লাজার আশাপাশে গাড়ির তীব্র জট দেখা দেয়। তা ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের মহাসড়কে। প্রায়ই সে যানজট ৫-১০ কিলোমিটার এলাকাও ছাড়িয়ে যায়।

গত সপ্তাহে সরজমিনে ঘুরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে প্রায় প্রতিদিনই গড়ে ৫-৬ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে যানজট দেখা গেছে। একই সময় ঢাকা থেকে কুমিল্লা-চট্টগ্রামগামী অনেকেই মেঘনা সেতুর পশ্চিম পাড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা যানজটে আটকে ছিলেন। অনেকে কুমিল্লা থেকে সকাল ৭টায় যাত্রা করে ১০টায় গোমতী সেতু পর্যন্ত পৌঁছান। অথচ এখানে বড় জোর ১ ঘণ্টা লাগার কথা। যানজটে আটকে থাকা যাত্রীরা জানান, এ চিত্র নিত্যদিনের, সব সময়ের। মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করলেও টোল বক্সের কারণে এখানকার যানজট থেকে নিষ্কৃতি পাচ্ছেন না যাত্রীরা।

গত বৃহস্পতিবার দাউদকান্দি ও মেঘনা সেতুর মাঝামাঝিতে কথা হয় সৌদি আরবগামী যাত্রী ইলিয়াছ আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, সন্ধ্যা ৭টায় বিমানের ফ্লাইট। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছতে হবে দুপুর ২টার ভেতর। অথচ সকাল ৮টায় কুমিল্লা থেকে বাসে উঠেছি। এখন ঘড়িতে সময় বেলা ১২টা। চার ঘণ্টা পার হলেও এখনও দুই সেতুর মাঝখানে পড়ে আছি। জানিনা সময়মতো পৌঁছতে পারব কি না। না জানি ফ্লাইট বাতিল হয়ে যায়।

শুধু ইলিয়াছ আলী নন, তার মতো শ শ যাত্রী প্রতিদিন এরকম ভোগান্তির স্বীকার হচ্ছে। একইদিন সকাল ৯টায় মহাসড়কের দাউদকান্দি এলাকায় কথা হয় যানজটে আটকে থাকা ঢাকাগামী কাভার্ডভ্যানের চালক কামরুল হাসান, রাজু মিয়া, সালাহ উদ্দিন ও মামুন মিয়ার সঙ্গে। তারা বলেন, এই মহাসড়কে যানজটের মূল কারণ হচ্ছে টোল প্লাজায় ওজন স্কেলের অব্যবস্থাপনা। রাতে দালালরা টাকা আদায়ের জন্য ওজন কম এমন গাড়িও স্কেলে ঢোকাতে বাধ্য করে। এ নিয়ে চালকের সঙ্গে তাদের বাগ-বিতন্ডায় স্বাভাবিকভাবেই যানজট তৈরি হয়। দালালদের ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা দিলে নিস্তার পাওয়া যায়। টাকা না দিলে দালালরা চালকদের মারধরও করেন এবং গাড়িতে আঘাত করে। রাতে মালবাহী যানবাহনের চাপ বেশি থাকায় দালালদের অত্যাচারও বেড়ে যায়। এ কারণে ওজন স্কেল এলাকায় যানজট স্থায়ী রূপ নিয়েছে।

একইভাবে কুমিল্লাগামী তিশা পরিবহনের যাত্রী বদরুল আলম মজুমদার এই প্রতিবেদককে বলেন, টোল আদায় পদ্ধতি যানজটের অন্যতম কারণ। তবে হাইওয়ে পুলিশ সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করলে যানজট অনেকাংশেই নিরসন করা যায়। সড়কের দুই পাশের যত্রতত্র হাট-বাজার ও ইচ্ছেমতো গাড়ি পার্কিংয়ের কারণেও যানজট লেগে যায়। এত গাড়ি যে পাঁচ মিনিটও কোনো গাড়ি থামলে পেছনে দীর্ঘ লাইন পড়ে যায়। ফলে টোল আদায় থেকে শুরু করে কর্তব্যরত সবাইকে খুবই সতর্কতার সঙ্গে দ্রুত কাজ করতে হবে।

তবে সেতু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যানজটের জন্য টোল আদায়ে ধীরগতিকে মানতে নারাজ। এ বিষয়ে টোল আদায়কারী সিএনএস কোম্পানি লিমিটেডের সহকারী ব্যবস্থাপক শওকত আলী বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনের। কিন্তু মেঘনা-গোমতী ও মেঘনা সেতু দুই লেনের। এতে চার লেনের মহাসড়কে যে গতিতে ও যে পরিমাণ যান চলে, স্বাভাবিকভাবেই সেতুর টোল প্লাজার সামনে এসে সেগুলোর গতি কমে যায়। টোল থেকে যানবাহন চলাচল দ্রুত করতে ডিজিটাল বুথ (টাচ এন্ড গো) চালু করেছি। এখানে ২০০ টাকা সার্ভিস চার্জ দিয়ে চালকরা একাউন্ট খুলে এটিএম কার্ড নিতে পারেন। এই কার্ড বুথে শো করলেই অটোমেটিক নির্ধারিত টাকা কেটে যাবে। ফলে টোল আদায় আরো সহজ হবে বলে মনে করেন এই কর্মকর্তা।

দাউদকান্দি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল প্লাজায় টোল আদায়ে অনেক সময় লেগে যায়। এই ধীরগতির সমাধান হলে বাকি বিষয়গুলো হাইওয়ে পুলিশের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব।

পিডিএসও/তাজ