ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি

ছয় বছরেও হয়নি অর্গানোগ্রাম : ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০১৭, ১৫:৫৮

হাসান ইমন

ঢাকা সিটি করপোরেশন (উত্তর ও দক্ষিণ) ভাগ হয়েছে ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর। এরই মধ্যে দুই সিটি করপোরেশন পাঁচ বছর নয় মাস অতিবাহিত হলেও তৈরি করতে পারেনি নতুন অর্গানোগ্রাম (জনবল কাঠামো)। এখনো চলছে ১৯৮৯-৯০ অর্গানোগ্রামের আইনানুযায়ী। উপরন্তু পুরনো জনবল কাঠামো তাতেও এক হাজার ২০৭টি পদ এখনো শূন্য আছে। এই অর্গানোগ্রামে জনবল কাঠামোর সংখ্যা কম থাকায় কাজ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে দুই সিটির কর্মকর্তারা। এ ছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি না থাকায় ক্ষুব্ধ তারা। তবে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন যোগ হওয়া ১৬ ওয়ার্ড এবং প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে আছে নতুন অর্গানোগ্রাম।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন চলছে ১৯৮৯-৯০-এর অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী। এতে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিবসহ অনুমোদিত বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা রয়েছে চার হাজার ২৮০ জন। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) লোকবল রয়েছে এক হাজার ৮৫৮ জন।

ডিএনসিসির জনবল সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণির অনুমোদিত পদ রয়েছে ১৮৩টি। যার মধ্যে এখনো ৭২টি শূন্য পদ। দ্বিতীয় শ্রেণির ৯৫টি অনুমোদিত পদের সংখ্যার মধ্যে ২৩টি শূন্য। এ ছাড়া তৃতীয় শ্রেণির এক হাজার ২৭টি অনুমোদিত পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে ৫২১টি ও চতুর্থ শ্রেণির ৫৫৩টি পদের মধ্যে শূন্য ৩৭৪টি। আর ঢাকা দক্ষিণের অনুমোদিত দুই হাজার ৪২২টি পদের মধ্যে ২২০টি শূন্য।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুই সিটির জনবল সংকট দীর্ঘদিনের। রাজধানীতে সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খেলার মাঠ ও পার্কের উন্নয়ন, নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাসহ অনেক কাজ করে থাকে সংস্থাগুলো। এর মধ্যে নতুন করে আরো ৩২টি ওয়ার্ড যোগ হয়েছে। কাজের পরিধি বাড়লেও লোকবলের সংখ্যা দিন দিন কমছে। এ অবস্থায় জনবল সংকটের কারণে এসব কার্যক্রম প্রায়ই দুর্বল হয়ে পড়ছে। কমসংখ্যক জনবল দিয়ে কিছু কাজ করলেও মান ভালো হচ্ছে না বলেও জানান তারা। ফলে এত কমসংখ্যক জনবল দিয়ে সংস্থাগুলো পরিচালনা করতে হিমশিম খাচ্ছে। এ ছাড়া পুরনো জনবল কাঠামোতে নেই পদোন্নতি। যে যে পদে আছে, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সে পদেই বহাল থাকবে। এ জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে রয়েছে চাপা ক্ষোভ।

ডিএনসিসির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রকৌশলী বলেন, দুই সিটি করপোরেশন ভাগ হয়েছে প্রায় ছয় বছর। এখনো তৈরি করতে পারেনি অর্গানোগ্রাম। অথচ গত ছয় বছরে কাজের মান বেড়েছে। নতুন করে আরো ডিএনসিসিতে ১৬ ওয়ার্ড যোগ হয়ে বেড়েছে সীমানাও।

অভিযোগ করে এই কর্মকর্তা বলেন, প্রতিনিয়তই আমাদের কাজ বাড়ছে। নতুন নতুন রাস্তা নির্মাণ হচ্ছে। পুরনো রাস্তা সংস্কার করতে হচ্ছে। জনবল কাঠামো না থাকায় লোক নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না। পুরনো সীমানার কাজগুলোই ভালোভাবে কাজ করা যাচ্ছে না। আর নতুন যোগ হওয়া ১৬ ওয়ার্ডের কাজ করব কীভাবে?

এদিকে সিটি করপোরেশনে চাকরি করলেও একপর্যায়ে পদোন্নতি পাবেন না। শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে যিনি আসবেন, তিনি ডেপুটেশনে বাইরে থেকে আসবেন। এ বিষয়টি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না দুই সিটি করপোশেনের কর্মকর্তারা। নতুন জনবল কাঠামোতে বিভাগীয় পদগুলোতে পদোন্নতির সুযোগ বন্ধ করে দেওয়াতেই সৃষ্টি হয়েছে এ ক্ষোভ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পদোন্নতির সুযোগ না থাকায় কর্মকর্তাদের মনোবল থাকে না। কাজের স্পৃহা থাকে না। এ ছাড়া যত যোগ্য হই না কেন, আমি বিভাগীয় প্রধান হতে পারব নাÑসারাক্ষণ এমন চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খায়। তা ছাড়া ডেপুটেশনে বাইরের লোকজন নিয়োগ পাওয়ায় তারা সিটি করপোরেশনের প্রতি তেমন আন্তরিকও হবেন না। একরকম ‘ঔপনিবেশিক মনোভাব’ লক্ষ করা যায় তাদের মধ্যে। এটি করপোরেশনের অগ্রগতিতেও প্রভাব ফেলে। এসব কারণে কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে। যে কোনো সময় এ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জানা যায়, ১৯৯০ সালে প্রথম অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) জনবল কাঠামো (অর্গানোগ্রাম) অনুমোদন করা হয়। এতে প্রধান প্রকৌশলী, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা, প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা, প্রধান ভান্ডার এবং ক্রয় কর্মকর্তাসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদে ডেপুটেশনে ও সরাসরি নিয়োগের পাশাপাশি পদোন্নতির মাধ্যমে সিটি করপোরেশনের নিজস্ব লোকবল নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়। সে অনুযায়ী সিটি করপোরেশনের নিজস্ব অনেক কর্মকর্তা এসব পদে কর্মরত থেকে চাকরি জীবন শেষ করেন। কিন্তু ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসার পর এসব পদে শুধু ডেপুটেশনে নিয়োগ দেওয়া হয়। সে প্রক্রিয়া এখনো চলমান। নানা আনুষ্ঠানিকতার পর গত বছরের মাঝামাঝিতে নতুন জনবল কাঠামো অনুমোদন করা হয়। এতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বিভাগীয় প্রধানের পদসহ শতাধিক পদে পদোন্নতির সুযোগ বন্ধ করে শুধু ডেপুটেশনে নিয়োগের বিধান রাখা হয়। ফলে এসব পদে শুধু সরকারি আমলারা নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। সিটি করপোরেশনের নিজস্ব কর্মকর্তারা পদোন্নতি পেয়ে এসব পদে যেতে পারবেন না। এ রকম পদ রয়েছে শতাধিক।

দুই সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকেই মন্ত্রণালয়ের কাছে এ ব্যাপারে সম্প্রতি আপত্তিপত্র দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। জনবল কাঠামোর পাশাপাশি নিয়োগ বিধিমালা তৈরিতে কমিটিও করা হয়েছে। নিয়োগ বিধিমালা তৈরি হলে এ সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে ডিএনসিসির সচিব দুলাল কৃষ্ণ সাহা বলেন, আমাদের নতুন অর্গানোগ্রাম মন্ত্রণালয়ে আছে। যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। এ ছাড়া নতুন করে ১৬ ওয়ার্ড যোগ হওয়ায় জনবল কাঠামোতে পরিবর্তন আনা হবে। সে জন্য একটু দেরি হচ্ছে।

পুরনো জনবল কাঠামো দিয়ে কাজ করার বিষয়ে তিনি বলেন, অনুমোদিত পদ যা আছে তা-ও নেই। দিন দিন সে পদের লোক সংখ্যাও কমছে। পুরো সিটি করপোরেশনের কাজ করতে অনেকটা হিমশিম খেতে হচ্ছে।

এ ব্যাপারে ডিএসসিসির সচিব খান সাহাবুদ্দিন খান বলেন, নতুন জনবল কাঠামোতে এতগুলো পদে ডেপুটেশনে নিয়োগের ব্যবস্থা থাকায় আমরাও অবাক হয়েছি। নিয়োগ বিধিমালা হলে এমন সমস্যার সমাধান হতে পারে বলে আশা করছি।

প্রসঙ্গত, বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যাপক আপত্তি সত্ত্বেও বিগত মহাজোট সরকার ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুই ভাগ করে। ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর জাতীয় সংসদে বিল আকারে এ-সংক্রান্ত আইনটি পাস হয়। এর আগে একই বছরের ৩১ অক্টোবর আইনটি চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। তারও আগে ১৭ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার বৈঠকে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।

পিডিএসও/মুস্তাফিজ

"