ক্ষমতাসীনদের সুবিধা দিতে গোপনে পশুর হাটের ইজারা

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৭, ২০:৫৭

হাসান ইমন

অনেকটা গোপনীয়তার মধ্যেই খোলা হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অস্থায়ী পশুর হাটের টেন্ডার বাক্স। বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের না জানিয়েই সম্পন্ন করা হয়েছে প্রথম দফার টেন্ডার প্রক্রিয়া। পছন্দের প্রার্থীকে হাট ইজারা দিতে ও নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিতেই এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। পশুর হাটের ইজারার সর্বোচ্চ দর দাতাদের মধ্যে অধিকাংশই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীরা। এ বছরও ক্ষমতাসীন দলের সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৩টি কোরবানির পশুরহাট। আর এ সিন্ডিকেটের সঙ্গে রয়েছে সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও। 

অভিযোগ উঠেছে, সিন্ডিকেটের বাইরে কারো পক্ষে শিডিউল সংগ্রহ ও জমা দেওয়া সম্ভব নয়। হাটগুলোর ইজারা সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রাখতে নেওয়া হয়েছে নানা কৌশল। এর মধ্যে একই ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন নামে-বেনামে দরপত্র জমা দেয়। যে কারণে নিজেদের কাঙ্খিত দামে ইজারা পেতে সহজ হয়ে যায়। এতে সিটি করপোরেশন কোটি টাকার রাজস্ব হারাতে যাচ্ছে। 

বৃহস্পতিবার ডিএসসিসি জন সংযোগ বিভাগ থেকে এক প্রেসবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পশুর হাটের প্রথম দফার ইজারার তথ্য পাঠান। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এ বছর ডিএসসিসি’র আওতাধীন ১৩টি কোরবানির পশুরহাটের জমা পড়া শিডিউলগুলোর মধ্যে- রহমতগঞ্জ খেলার মাঠ ইজারার সর্বোচ্চ দরদাতা হলেন রহমতগঞ্জ মুসলিম সোসাইটির সহ-সভাপতি হাজী শরিফ মাহমুদ। তিনি মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের নেতা। যার দরপত্রের মূল্য ১০ লাখ ৬ হাজার ৫০০ টাকা। যা গত বছর ছিল ৯ লাখ ১৫ হাজার টাকা। খিলগাঁওয়ের মেরাদিয়া বাজারের সর্বোচ্চ দরদাতা মো. শরিফ। তিনি ৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা। যার দরপত্রের মূল্য এক কোটি এক লাখ ৫৫ হাজার টাকা। যা গত বছর ছিল ৫১ লাখ ৩০ হাজার ৫০০ টাকা।

সাদেক হোসেন খোকা খেলার মাঠ ইজারার কোনো দরপত্র পাওয়া যায়নি। উত্তর শাহজাহানপুর খিলগাঁও রেলগেট বাজার সংলগ্ন মৈত্রীসংঘের মাঠ ইজারার সর্বোচ্চ দরদাতা হলেন আবদুল লতিফ। তিনি ১১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি। যার দরপত্রের মূল্য আট লাখ এক হাজার টাকা। যা গত বছর ছিল সাত লাখ ২০ হাজার টাকা।

ধুপখোলার ইস্ট অ্যান্ড ক্লাব মাঠ ইজারার সর্বোচ্চ দরদাতা হলেন মো. শামসুজ্জোহা। তার সর্ম্পকে কিছু জানা যায়নি। যার দরপত্রের মূল্য ৬১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। যা গত বছর ছিল ৯৩ লাখ টাকা। পোস্তগোলা শশ্মানঘাট সংলগ্ন খালি জায়গা ইজারার সর্বোচ্চ দরদাতা হলেন শ্যামপুর থানা আওয়ামী লীগ নেতা মঈন উদ্দিন চিশতী। তিনি এ হাটের ইজারা দর দিয়েছেন ৩৫ লাখ ১৫ হাজার টাকা। যা গত বছর ছিল ১৫ লাখ ২০ হাজার টাকা।

কামরাঙ্গীরচর ইসলাম চেয়ারম্যানের বাড়ির মোড় হতে দক্ষিণ দিকে বুড়িগঙ্গা নদীর বাঁধ সংলগ্ন জায়গা ইজারার সর্বোচ্চ দরদাতা হাজি মোহাম্মদ আবুল হোসেন সরকার। তিনি থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। যার দরপত্রের মূল্য ৫ লাখ ২০ হাজার টাকা। যা গত বছর ছিল ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এ বছর বিগত বছরের চেয়ে ৩০ হাজার টাকা কম।

আরমানিটোলা খেলার মাঠ ও ও আশপাশের খালি জায়গার (গুলিস্তান- মাওয়া মহাসড়ক ও গুলিস্তান-সদরঘাট সড়ক ব্যতীত) ইজারার সর্বোচ্চ দরদাতা আশিকুর রহমান। তিনিও মহানগর আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি এ হাটের দর দিয়েছেন এক কোটি ৩৩ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। যা গত বছর ছিল এক কোটি ৪০ লাখ টাকা। ঝিগাতলা হাজারীবাগ মাঠের জন্য সর্বোচ্চ দরদাতা হলেন থানা আওয়ামী লীগের নেতা অহিদুর রহমান ওয়াকিব। তিনি দর দিয়েছেন ৯০ লাখ টাকা । যা গত বছর ছিল ৬৬ লাখ ১৭ হাজার টাকা।

ব্রাদার্স ইউনিয়ন সংলগ্ন বালুর মাঠ, (গোপীবাগ, কমলাপুর) ইজারার সর্বোচ্চ দরদাতা সৈয়দ মাসুম। তার সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি। তিনি এ হাটের দর দিয়েছেন ৬২ লাখ টাকা। যা গত বছর চেয়ে আট লাখ টাকা কম।

কমলাপুর স্টেডিয়ামের আশপাশে খালি জায়গা রাস্তার পূর্ব পাশ ইজারার সর্বোচ্চ দরদাতা হলেন আমের খান। তার সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি। যার দরপত্রের মূল্য ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। যা গত বছর ছিল ২০ লাখ টাকা। 

দনিয়া কলেজ মাঠ সংলগ্ন খালি জায়গার সর্বোচ্চ দরদাতা হলেন, আবুল কালাম আজাদ। তিনি ইজারা নিয়েছেন দুই কোটি ২০ লাখ টাকায়। এ ছাড়া কদমতলীর শ্যামপুর বালুর মাঠ সর্বোচ্চ ইজারা দিয়েছেন মাসুক রহমান। তিনি এ হাটের দর দিয়েছেন এক কোটি ৩৩ লাখ টাকা। দনিয়া কলেজ মাঠ সংলগ্ন খালি জায়গার ইজারা পেয়েছেন আবুল কালাম আজাদ। শ্যামপুর বালুর মাঠ পেয়েছেন শেখ মাসুক রহমান। তারাও ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত বলে জানা যায়।

এই বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, কয়েকটি পশুর হাট সরকারি দরের চেয়ে কম মূল্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া সাদেক হোসেন খোকা মাঠের কোনো দরপত্র পাওয়া যায়নি। এগুলোর জন্য আমরা আবার দরপত্র আহ্বান করব। ২১ আগস্টের মধ্যে ইজারা সম্পূর্ণ করা হবে বলে জানান তিনি।
সাদেক হোসেন মাঠের দরপত্র প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কি কারণে দরপত্র জমা পড়েনি সেটা বলতে পারি না। তবে দর বেশি হওয়ার জন্য দরপত্র পড়েনি ধারণা করা হচ্ছে। 

দরপত্র কিনতে বাধা, জমা দিতে না দেওয়াসহ এসব অনিয়মের কথা অস্বীকার করেন এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, নিয়মের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। নিয়ম মেনে যদি সব হাট আওয়ামী লীগের লোক পেয়ে যায়, তাহলেও কিছু করার নেই।

পিডিএসও/রিহাব