ইলিশের স্বত্ব বাংলাদেশের

খুলে গেল রুপালি দুয়ার

প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০১৭, ১০:৫০

প্রতীক ইজাজ

গত কয়েক বছর ধরেই দেশে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে। আগে নির্দিষ্ট কিছু নদী বা জলসীমায় ইলিশ উৎপাদন হলেও এখন অনেক ছোট ছোট নদী ও হাওরেও ইলিশ ডিম পারছে ও ইলিশ হচ্ছে। উপযুক্ত প্রজনন পরিবেশ ও চক্র (সমুদ্র-নদী-সমুদ্র) পাওয়ায় বাড়ছে ইলিশের আকারও। এমনকি হালনাগাদ গবেষণায় ইলিশের উৎপাদন ‘ইনক্রিজিং লেভেল’ মাত্রায় রয়েছে বলেও জানিয়েছেন ইলিশ বিজ্ঞানী ও গবেষকরা।

একইসঙ্গে বিশ্বে দেশে ইলিশের নতুন বাজার তৈরির সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে। ইলিশ উৎপাদনে নতুন রেকর্ড তো বটেই, বাংলাদেশ হতে যাচ্ছে আধুনিক উৎপাদন পদ্ধতিতেও অনুসরণকারী অন্যতম দেশ। কেননা ইলিশ পাওয়া যায় বিশ্বের এমন ১১টি দেশের মধ্যে ১০টিতেই যেখানে ইলিশের উৎপাদন কমছে, সেখানে একমাত্র বাংলাদেশেই ইলিশের উৎপাদন প্রতি বছর ৮-১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। এমনকি দেশের মোট মৎস্য সম্পদের ১২ শতাংশ ও মোট জিডিপির ১ দশমিক ১৫ শতাংশ আসছে ইলিশ থেকেই।

এমন পরিস্থিতিতে ইলিশ মাছ বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় বিশ্বজুড়ে খুলে গেল রুপালি ইলিশের সম্ভাবনার দ্বার। জামদানির পর ইলিশ বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য হিসেবে সারা বিশ্বে স্বীকৃতি পেল। যুক্ত হলো দেশের আরেকটি নতুন ঐতিহ্য। গত সোমবার এই স্বত্ব পাওয়ার খবর দেয় মৎস্য অধিদফতর। পেটেন্ট ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদফতর বলছে, ভৌগোলিক নির্দেশক (জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিকেশন) পণ্য হিসেবে ইলিশ নিবন্ধনের সব প্রক্রিয়া শেষ। এক সপ্তাহের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে মৎস্য অধিদফতরের হাতে ইলিশের জিআই নিবন্ধনের সনদ তুলে দেওয়া হবে।

ইলিশ দেশের নিজস্ব পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় আনন্দে উদ্বেলিত দেশের মানুষ। এর পেছনে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অবদান রয়েছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ প্রসঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ ছায়েদুল হক বলেন, ইলিশ জাতীয় সম্পদ। এ সম্পদ রক্ষায় সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রয়োজনে আরো পদক্ষেপ নেওয়া হবে। জাটকা নিধন রোধে সরকার কাঠোর অবস্থানে থাকবে। যেকোনো মূল্যে সরকার নদী থেকে জাটকা ধরা বন্ধ করবে। এ ক্ষেত্রে সরকার সবার সহযোগিতা চায়। মৎস্য অধিদফতরের মহাপরিচালক সৈয়দ আরিফ আজাদ বলেন, এই স্বত্ব পাওয়ার অবদান আমাদের একার নয়, গোটা জাতির অর্জন। এখন সম্মিলিতভাবে আমাদের পণ্যটি আমাদের সংরক্ষণ করতে হবে।

স্বত্ব পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ইলিশ উৎপাদন ও সংরক্ষণ, বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ও সংকট নিয়ে গতকাল দেশের ইলিশ বিশেষজ্ঞ ও মৎস্যবিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা হয়। তারা কেবল আত্মতৃপ্তিতে না থেকে ইলিশের উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর জোর দেন। তারা বলেন, যেকোনো উপায়ে ইলিশের উৎপাদন ধরে রাখতে হবে। প্রজনন পরিবেশ ও চক্র নির্বিঘ্ন রাখতে হবে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. ইনামুল হক বলেন, স্বত্ব পাওয়ার মধ্য দিয়ে আরেকটি নতুন জাতীয় ঐতিহ্যের অধিকারী হলাম আমরা। তবে এই স্বত্ব পাওয়ার আত্মতৃপ্তি নিয়ে থাকলেই হবে না, ইলিশের উৎপাদন ও সংরক্ষণে নজর রাখতে হবে।

এই মৎস্যবিজ্ঞানী বলেন, বর্তমানে দেশে ইলিশের উৎপাদন ভালো। বিশ্ব বাজারে ইলিশের চাহিদাও আছে। তাই রফতানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া যেতে পারে। ইলিশের মূল বাজার ভারত। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে বাঙালি থাকায় সেখানেও ইলিশের বাজার রয়েছে। এসব দেশের সঙ্গে দর-কষাকষি করে ইলিশ রফতানি করা যেতে পারে। কারণ কলকাতার বাজারে যে ইলিশ, সেটি আমাদের দেশ থেকেই অবৈধপথে সেখানে যায়। সুতরাং রফতানি করা গেলে অবৈধ পাচার বন্ধ হবে। অবশ্য সরকার এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিচ্ছে। ভারতও রফতানির অনুরোধ জানিয়েছে।

একই সঙ্গে এই বিজ্ঞানী অবৈধপথে ইলিশ পাচার বন্ধে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মূলত বরিশাল অঞ্চল থেকেই বোনাপোল দিয়ে ইলিশ পাচার হয়ে যাচ্ছে। এটি দীর্ঘ রুট। ফলে সরকার সতর্ক হলে পাচার রোধ করা সম্ভব।

ড. ইনামুল হক আরো বলেন, ইলিশের উৎপাদন বছর বছর বাড়ছে। এবার ইলিশের উৎপাদন চার লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যাবে। অথচ দুই বছর আগেও উৎপাদন ছিল তিন দশমিক ৮ মেট্রিক টন। গবেষণায় উৎপাদন বাড়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। ফলে আগামীতে আরো বাড়বে।

ইলিশের উৎপাদন অব্যাহত রাখতে এই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা নদীর প্রতিবেশ সংরক্ষণের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইলিশ প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদন হয়। কৃত্রিম উৎপাদনের সুযোগ নেই। মূলত পদ্মা ও মেঘনা প্রজনন স্থান। এরা সমুদ্র থেকে নদীতে এসে ডিম পেড়ে ও বাচ্চা করে আবার সমুদ্রে ফিরে যায়। এই যে মাইগ্রেশন রুট ও পরিবেশ ঠিক রাখতে হবে। তা হলে উৎপাদন আরো বাড়বে। কারণ ইলিশের জন্য পরিবেশ বড় সমস্যা। নদীর গুণগত অবস্থার পরিবর্তন হয়। ইলিশের প্রজনন পরিবেশও বদলায়। সুতরাং সার্বক্ষণিক গবেষণা দরকার। ইলিশের প্রজনন কেন্দ্রগুলোর দিকে সার্বক্ষণিক খেয়াল রাখতে হবে।

এই বিজ্ঞানী বলেন, স্বাভাবিকভাবেই ইলিশ উৎপাদন বেড়েছে। মূলত জাটকা নিধন ও মা ইলিশ ধরা বন্ধ এবং মাছের অভয়ারণ্য বাস্তবায়নের কারণেই ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে। মা ইলিশ ও ডিম বাড়ছে, মাছও বাড়ছে। ২০০৯ সালে সাগর-নদীবিধৌত উপকূলীয় এলাকা চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, ভোলা ও পটুয়াখালীর ২১ উপজেলায় জাটকা নিধন বন্ধ, মা ইলিশ রক্ষা ও ইলিশের বংশবিস্তারের জন্য ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। পরবর্তী সময়ে এ কর্মসূচি ছড়িয়ে দেওয়া হয় দেশের ২৫ জেলার ১৩৬টি উপজেলায়। তার সুফল এখন আমাদের হাতে।

এই মৎস্যবিজ্ঞানী ইলিশের দাম বেশি হওয়ার পেছনে ইলিশ সংরক্ষণ ব্যবস্থা ভালো নয় বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, উৎপাদন স্থানগুলোতে (বরিশাল, পটুয়াখালী ইত্যাদি) ইলিশ সংরক্ষণ করে রাখার বরফ পাওয়া যায় না। বিদ্যুৎ সরবরাহ ভালো না। সব মিলে সংরক্ষণ ব্যবস্থা ভালো না। অথচ ইলিশের স্বাদ ও গুণাগুণ ধরে রাখতে হলে ধরার সঙ্গে সঙ্গে সংরক্ষণ করতে হবে। তা না হলে স্বাদ থাকে না। এ সংরক্ষণ ব্যয়বহুল হওয়ায় বাজারে ইলিশের দাম বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের চাঁদপুর নদীকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিছুর রহমান। তার মতে, স্বত্ব পাওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের দায়িত্ব বেড়ে গেল। তিনি বলেন, এখন ইলিশ সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও উৎপাদন বাড়াতে হবে। বিশ্ববাজারে ইলিশের জোগান ও চাহিদা বাড়াতে হবে।

এই ইলিশ বিজ্ঞানী বলেন, দেশে ইলিশের উৎপাদন ও আকার বেড়েছে। এখন ছোট ছোট নদী ও হাওরে ইলিশ উৎপাদন হচ্ছে। ইলিশের প্রজনন এলাকা বিস্তৃত হয়েছে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ২০০৩-০৪ অর্থবছরে যেখানে দুই লাখ মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদন হয়েছে, সেখানে এ বছর উৎপাদন দাঁড়িয়েছে চার লাখ মেট্রিক টনের বেশি। এর কারণ হিসেবে তিনি মা ইলিশ সংরক্ষণ, জাটকরা ইলিশ নিধন বন্ধ ও অভয়াশ্রম বাস্তবায়নকে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ইলিশের আকারও বেড়েছে। এখন ১০০ কেজি ইলিশের মধ্যে এক কেজি বা তারও বেশি ওজনের ৫-১০ কেজি ইলিশ মিলছে। আগে মিলত না। মূলত আগস্ট ইলিশ মৌসুম হলেও এখন জুন-জুলাই মাসেও ইলিশ মিলছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এসব জলসীমায় বড় আকারে ইলিশ বাড়ছে। এমনকি ইলিশ উৎপাদন অঞ্চলও বিস্তৃত হয়েছে, উল্লেখ করে এই ইলিশ বিজ্ঞানী বলেন, ইলিশের মূল উৎপাদন স্থল-মেঘনা, আড়িয়াল খাঁ, ভোলার তেতুলিয়া নদীতে, চাঁদপুর, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর ও পটুয়াখালী। এখন এসব নদী ও স্থানের পাশাপাশি পদ্মা, সুরমা, কুশিয়ারা ও মহানন্দা নদী এবং হাকালুকিসহ বেশ কিছু হাওরও ইলিশে ভরপুর। এসব নদী ও হাওরে ইলিশ ডিম পাড়তে চলে আসছে। তার মানে পরিবেশ ভালো। এসব পরিবেশ ধরে রাখতে হবে।

তবে ইলিশ রফতানি প্রসঙ্গে ড. আনিছুর রহমান বলেন, দেশে ঠিক কতটা ইলিশের চাহিদা রয়েছে, তার কোনো গবেষণা নেই। তবে কাক্সিক্ষত মাত্রা অর্থাৎ সহনশীল মাত্রার উৎপাদন ধরে রাখা জরুরি। আমরা খাব, উৎপাদন করব ও পরবর্তী প্রজননের জন্য জলসীমাগুলোয় প্রয়োজনীয় ইলিশ থাকবে-এমন অবস্থা নিশ্চিত হলেই রফতানির কথা ভাবা যেতে পারে। তিনি ইলিশের উৎপাদন অব্যাবহত রাখতে মৎস্য প্রজনন চক্র ধরে রাখা ও জলসীমা যাতে দূষণ না হয়, সেদিকে সতর্ক নজর রাখার পরামর্শ দেন।

ইলিশ গবেষকরা ইলিশের অর্থনীতির উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথাও বলেন। মৎস্য অধিদফতর জানিয়েছে, দেশে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ইলিশের অবদান ১ দশমিক ১৫ শতাংশ। দেশের মোট মাছের ১২ শতাংশের উৎপাদন আসে ইলিশ থেকে, যার অর্থমূল্য আনুমানিক সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা। উৎপাদিত ইলিশের যেটুকু রফতানি হয় তাতে ১৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। প্রায় পাঁচ লাখ লোক ইলিশ আহরণে সরাসরি নিয়োজিত এবং ২০-২৫ লাখ লোক পরিবহন, বিক্রয়, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রফতানি ইত্যাদি কাজে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, বিশ্বে প্রতি বছর পাঁচ লাখ মেট্রিক টন ইলিশ আহরিত হয়, এর ৬০ শতাংশই আহরিত হয় বাংলাদেশে। ইলিশের গড় উৎপাদন হচ্ছে সাড়ে তিন লাখ টনের মতো। এই হিসাবে প্রচলিত বাজারমূল্যে প্রতি কেজির গড় দাম কম করে ৬৫০ টাকা ধরা হলেও সংগৃহীত সাড়ে তিন লাখ টন ইলিশের সার্বিক বাজারমূল্য দাঁড়ায় ২২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা।

পিডিএসও/হেলাল