নির্বিঘ্নে ঈদযাত্রায় নৌপথেও সংশয়

প্রকাশ : ২০ জুন ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২০ জুন ২০১৭, ১০:২৩

প্রতীক ইজাজ

স্বজনের সঙ্গে ঈদ করতে এবারও নৌপথে পাড়ি দেবে অসংখ্য মানুষ। অগ্রিম টিকিট বিক্রি শেষ। যাত্রা নির্বিঘ্নে করতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। যাত্রীচাপ সামাল দিতে গত ঈদুল ফিতরের ছয়টি বিশেষ লঞ্চের জায়গায় এবার নামছে ১৪টি লঞ্চ। নজর রাখা হচ্ছে বিভিন্ন রুটের ফেরি সার্ভিসের নির্বিঘ্নে চলাচলে। ফিটনেসবিহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চ ঠেকাতে নানা তৎপরতার কথাও বলা হয়েছে। নদীপথে দুর্ঘটনা রোধে ঈদের পাঁচ দিন আগে থেকে ঈদের পর পাঁচ দিন পর্যন্ত বুড়িগঙ্গায় সব ধরনের বালুবাহী জাহাজ ও ট্রলার চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নৌপথে ডাকাতি, টিকেট কালোবাজারি, বেপরোয়া লঞ্চ চালনা কিংবা নদীর মাঝপথে থামিয়ে যাত্রী তোলাসহ নানা অসংগতির দিকে নজর রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো।

স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবারও নির্বিঘ্নে ঈদযাত্রায় যে ২৯ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন, সেখানে নৌপথও গুরুত্ব পেয়েছে। ঈদে ঘরমুখো মানুষকে নৌপথের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্য যাত্রা নিশ্চিত করতে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় ‘খুবই সতর্ক’ বলে জানিয়েছেন নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। চলমান বৈরী আবহাওয়ার কারণে এই বাড়তি সতর্কতা বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেছেন, এবার ঈদের লঞ্চে কিছুতেই অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন করতে দেওয়া হবে। গতবারের তুলনায় বিশেষ লঞ্চ বেশি হওয়ায় যাত্রীদের ছাদে চাপতে হবে না।

কিন্তু ঈদযাত্রার সময় যত ঘনিয়ে আসছে উদ্বেগ ততই বাড়ছে। গত বছরও নির্বিঘœ ঈদযাত্রার জন্য দেওয়া প্রতিশ্রুতির অধিকাংশই শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে মানুষকে। ঈদের আগে ও পরে ১২ দিনে ৩টি নৌ দুর্ঘটনায় ১১ জন নিহত ও আটজন আহত হয়েছেন। এবার এমনিতেই বর্ষাকাল। ঈদযাত্রার সময় ভরা কটালে উত্তাল থাকবে নদী। প্রাকৃতিকভাবেই ঝুঁকি কিছুটা বেশি। তার ওপর বিভিন্ন ডকইয়ার্ডে চলছে ফিটনেসবিহীন ত্রুটিপুর্ণ লঞ্চ মেরামাতের কাজ। সরকারের তালিকাভুক্ত ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চগুলোকে এখনো অপসারণ করা যায়নি। নির্বিঘœ লঞ্চ চলাচলে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর তদারকিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল এবারও অগ্রিম টিকেট। এমনকি ঈদে নৌযাত্রাকে নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে করতে সরকারের সমন্বয় সভায় নেওয়া নানা পদক্ষেপের অধিকাংশই এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। সেই সঙ্গে রয়েছে লঞ্চ অনুপাতে অধিক যাত্রী।

এমন অবস্থার মধ্যেই আগামী বৃহস্পতিবার থেকে ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষের মূলস্রোত নামবে পথে। দক্ষিণাঞ্চলের ৪১ নৌ-রুটেও চাপবে মানুষ। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন নৌ পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও নৌ যাত্রীদের নিয়ে কর্মরত সংস্থাগুলো। তাদের মতে, বর্ষাকালে দেশের নদীগুলো খরস্রোত থাকায় এবার নৌপথে ঈদযাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে।

নৌ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে খোঁজ নিয়ে ঈদযাত্রায় নৌপথের এমন চিত্র পাওয়া গেছে। এ বছর ২৭ জুন মঙ্গলবার ঈদুল ফিতরের সম্ভাব্য দিন ধরা হয়েছে। তিন দিনের সরকারি ছুটি শুরু হচ্ছে ২৬ জুন সোমবার থেকে। অর্থাৎ ঈদের সরকারি ছুটি থাকবে সোম, মঙ্গল ও বুধবার। এর আগে শুক্র এবং শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি। ফলে কার্যত ছুটি শুরু হবে ২৩ জুন শুক্রবার থেকে। সে হিসাবে ২২ জুন থেকে মূলত ঈদে বাড়ি ফেরা শুরু হবে মানুষের।

অধিকাংশ সিদ্ধান্তই মুখে মুখে : ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে গত ৩০ মে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) কার্যালয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর এক সমন্বয় সভা হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, প্রয়োজনীয় সংখ্যক জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম না থাকলে কোনো লঞ্চকে ঘাট ছাড়ার অনুমতি দেওয়া হবে না। কিন্তু এখন পর্যন্ত অনেক লঞ্চে পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট, বয়া ইত্যাদি নিশ্চিত করতে দেখা যায়নি বলে স্বীকার করেছে নৌ অধিদফতর কর্তৃপক্ষ। কিছু লঞ্চে এসব সামগ্রী থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় যেমন কম, তেমনি অনেকগুলো এতই পুরোনো যে মানুষকে পানিতে ভাসিয়ে রাখার মতো সক্ষমতাও সেগুলোর নেই। গত ঈদুল ফিতরের সময় ঢাকা নদীবন্দরের পন্টুনের রেলিং ভেঙে কয়েক যাত্রী পানিতে পড়ে যান। প্রচ- ভিড়ে লঞ্চে উঠতে গিয়ে ও পা ফসকে দুর্ঘটনায় পড়তে হয় আরো অনেক যাত্রীকে। এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে এবার লঞ্চের সিঁড়ির দুই পাশে রেলিংয়ের ব্যবস্থা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু গতকাল সদরঘাট টার্মিনালে গিয়ে একটি লঞ্চেও রেলিংযুক্ত সিঁড়ি দেখা যায়নি। এ প্রসঙ্গে লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল সংস্থার সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান বাদল বলেন, আসলে নৌকা দিয়ে লঞ্চে উঠতে গিয়েই বেশি দুর্ঘটনা ঘটে। আগে সেগুলো বন্ধ করতে হবে।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্রমতে, এবার ঈদের ৫ দিন আগে থেকে ৫ দিন পর পর্যন্ত দিনেও বালুবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত হলেও কিছু অসাধু পুলিশ সদস্যের কারণে এ সিদ্ধান্তও কাগজে কলমে থেকে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন লঞ্চ মালিকরা। যাত্রীদের চলাচল নির্বিঘ্নে করতে ঢাকা নদীবন্দরে (সদরঘাট টার্মিনাল) হকার ও অস্থায়ী দোকান বসানো বন্ধের সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত কাগজে-কলমেই রয়েছে। লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বহন ঠেকাতে এবার নৌ অধিদফতরের দুটি, বিআইডব্লিউটিএর একটি ও ঢাকা জেলা প্রশাসনের একটিসহ মোট ৪টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কথা রয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় নৌযান না থাকায় সেটি হচ্ছে না বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।

রয়ে গেছে ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চ : বর্তমানে সারাদেশে মোট নৌযান ৩৫ হাজার। এর মধ্যে নিবন্ধিত সাড়ে ১৩ হাজার। এর মধ্যে যাত্রীবাহী নৌযান দুই হাজার ২২৫টি। তাছাড়া নৌপথে চলাচল করছে প্রায় ২০ হাজার ছোট-বড় নৌযান। ঈদকে সামনে রেখে ৫ হাজার ২৭২টি লঞ্চকে ফিটনেস পরীক্ষার জন্য চিঠি দিয়েছিল সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর। এর মধ্যে ২ হাজার ৮২টি নৌ-যান পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কাগজপত্র জমা দেয়। তাতে দেখা গেছে এক হাজার ৩৫৪টি লঞ্চ ত্রুটিপূর্ণ ও যাত্রীবহনে ঝুঁকিপূর্ণ। অধিদফতর থেকে এসব লঞ্চের রুট পারমিট বাতিলের জন্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশও করা হয়েছিল। কিন্তু সে সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। এর মধ্যে শুধু বুড়িগঙ্গার সাড়ে চার হাজার বিভিন্ন ধরনের লঞ্চের মধ্যে মাত্র ৭৮২টির ফিটনেস পরীক্ষা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তাদের মতে, এসব লঞ্চের ৫০ শতাংশের কোনো নিবন্ধন নেই। এ নৌযানগুলোতে লাইসেন্সধারী চালকের সংখ্যা মাত্র ১৫০ জন। ফলে এবার ঈদে এসব লঞ্চ আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে ঈদে মানুষের বাড়ি ফেরা।

চলছে জোড়াতালির কাজ : ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ত এখন লঞ্চ মালিকরা। ঢাকা নদীবন্দরসহ আশপাশ জুড়ে ২৭টি ডকে চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। ফিটনেসবিহীন লঞ্চগুলোকে নতুন আদল দিতে জোড়া দেওয়া হচ্ছে লঞ্চের ভেঙে যাওয়া বিভিন্ন অংশ। মেঝে কিংবা কার্নিশে লাগানো হচ্ছে লোহার পাত। পরিবর্তন করা হচ্ছে ইন্টেরিয়র ডিজাইনে। এমনকি বুড়িগঙ্গার পাড়ে কেরানীগঞ্জের তেলপট্টি ও কেরসিনপট্টি অংশের ইয়ার্ডে বেশ কয়েকটি লঞ্চের নিচের অংশও মেরামত করতে দেখা গেছে। ডক ইয়ার্ডে লঞ্চ মেরামতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও লঞ্চ কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদের আগে ফিটনেস লাইসেন্স নিতে ত্রুটিপূর্ণ লঞ্চগুলো নামমাত্র সংস্কার করা হয়। যদিও এ ব্যাপারে বিআইডিব্লউটিএ বলছে, কোনো ঘাটেই আনফিট লঞ্চ ভিড়তে দেওয়া হবে না। লক্কড় ঝক্কড় কোনো লঞ্চ যাত্রী পরিবহন করতে পারবে না। কিন্তু নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে বলেন, আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে, প্রতিবারের মতো এবারও এসব ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চ ঠেকাতে পারবে না কর্তৃপক্ষ। সরকারি নৌযানের অপ্রতুলতাই বেসরকারি ঝুঁকিপূর্ণ নৌযানে যাত্রীপরিবহনের সুযোগ পাচ্ছে।

বেশি ঝুঁকি ২৫ পয়েন্টে : দেশের নৌপথের ২৫টি পয়েন্টকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছে নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি। এসব স্পর্শকাতর স্থানে মনিটরিং জোরদার করারও দাবি জানিয়েছে কমিটি। পয়েন্টগুলোর মধ্যে রয়েছে—চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী, চরগজারিয়া পাইলট স্টেশন, কাপ্তাই হ্রদ এলাকা, চাঁদপুরের হরিণা ফেরিঘাট, বরিশাল, পটুয়াখালী, কাউখালী পাইলট স্টেশন, খুলনা, মংলা পাইলট স্টেশন, আংটিহারা বা শেকবাড়িয়া পাইলট স্টেশন, মাওয়া-কাওড়াকান্দি, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া, বাগাবাড়ি বন্দর, সদরঘাট নদীবন্দর, নারায়ণগঞ্জ, মীরকাদিম, টঙ্গী-আশুলিয়া-ডেমরা, ভৈরববাজার বা আশুগঞ্জ, চামড়াঘাট, ছাতক, লেপসিয়া, খালিয়াজুড়ি, কিশোরগঞ্জ, কক্সবাজার, নোয়াপাড় প্রভৃতি।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা : এ ব্যাপারে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, এবারও ঈদে নৌপথে ঝুঁকি থাকছে। বিআইডব্লিউটিএ-এর সাতটি পোর্ট থেকেই প্রতিবছর ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চ দিয়ে যাত্রী পরিবহনের অভিযোগ করা হয়। সে সমস্যার সমাধান হয়নি। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর, পটুয়াখালী, আরিচা, বরিশাল ও খুলনা এই সাতটি পোর্টে কড়া নজরদারি রাখা হলে নির্বিঘœ যাত্রা সম্ভব। তিনি আরো বলেন, কিছুতেই ত্রুটিপূর্ণ নৌযান নামতে দেওয়া যাবে না। অদক্ষ মাস্টার ও চালক পরিহার করতে হবে। সতর্ক নজর রাখতে হবে যেন অতিরিক্ত যাত্রীবহন না হয়। এ ছাড়া নদীপথে যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য লাইফ জ্যাকেট, ফায়ার বাকেট, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, বালুভর্তি বাক্স বা বালতি এবং হস্তচালিত পানির পাম্পের ব্যবস্থা রাখতে হবে। নদীপথের সিগন্যাল বাতিগুলো নিশ্চিত করতে হবে।

পিডিএসও/হেলাল