ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ

সড়কপথে নির্বিঘ্নে ঈদযাত্রায় সংশয়

প্রকাশ : ১৯ জুন ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৯ জুন ২০১৭, ১২:২৯

বিশেষ প্রতিনিধি

সড়কপথে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্নে করতে প্রতিবারের মতো এবারও ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঈদযাত্রা ২৯ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীও বলছেন, ঈদযাত্রা নিরাপদ হবে। ৯০০ বিআরটিসির গাড়ি নামছে আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে। দুর্ঘটনা রোধে ও যানজট নিরসনে নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। কিছুতেই লক্কড়ঝক্কড় বাস নামতে দেওয়া হবে না। সড়কে যানবাহনের কোনো সমস্যা হলে তাৎক্ষণিকভাবে মেরামতের জন্য পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট চারটি কারিগরি টিম টাঙ্গাইল, বগুড়া, রংপুর এবং কাচপুর ব্রিজ এলাকায় সার্বক্ষণিক তদারকিতে থাকবে। গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের ১০টি পয়েন্টে তিন শতাধিক আনসার মোতায়েন ও পাঁচটি পয়েন্টে ১৫টি আইপি ক্যামেরা থাকছে। মহাসড়কের প্রবেশ পথগুলো দখলমুক্ত রাখতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এবারও ঈদের আগে তিন দিন মহাসড়কে পণ্যবাহী ট্রাক, লরি ও কাভার্ড ভ্যান চলাচল বন্ধ থাকবে। ৭০ শতাংশ সড়ক-মহাসড়ক প্রস্তুত করা হয়েছে। সড়কপথে বাসের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শেষ।

প্রতিবারের মতো লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত গুণেই সে টিকিট নিয়েছেন এবারও ঘরমুখো যাত্রীরা। যদিও ইতোমধ্যেই ঈদযাত্রা শুরু হয়েছে; কিন্তু মূল স্রোত নামবে আগামী বৃহস্পতিবার অফিস শেষে। স্বজনের সঙ্গে মহা-আনন্দে ঈদ করতে সড়কপথে এই যাত্রা চলবে ঈদের আগের রাত পর্যন্ত। মাঝখানে তিন দিন নির্ধারিত ছুটি শেষে পুনরায় মানুষ নামবে পথে কর্মস্থলে ফিরতে। কিন্তু গত ঈদুল ফিতরের মতো এবারও সরকার ঘোষিত ‘নির্বিঘ্ন’ ঈদযাত্রা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। দুশ্চিন্তায় আছেন ঘরমুখো মানুষ। সড়কজুড়ে খানাখন্দ, সরু রাস্তা, তীব্র যানজট, ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথে আটকে থাকা নারী শিশু ও বয়স্ক মানুষের অসহনীয় কষ্ট, লক্কড়-ঝক্কড় বাস, আর দুর্ঘটনায় প্রাণহানির পূর্ব দুর্ভোগের সেই চিরচেনা দৃশ্য ভাসছে চোখের সামনে।

বিশেষ করে সড়ক ও মহাসড়কের অবস্থা গতবারের তুলনায় এবার তেমন উন্নতি হয়নি। গত ঈদুল ফিতরের সময় ভাঙাচোরা সড়ক-মহাসড়কের পরিমাণ ছিল ৪৩ শতাংশ। একেবারেই বেহাল অবস্থা ছিল ৩২ শতাংশের। সেখানে এবার ভাঙাচোরা সড়ক কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৭ শতাংশে ও বেহাল সড়ক মহাসড়ক ২৬ শতাংশে। অর্থাৎ এবারও মোট সড়ক-মহাসড়কের এক-তৃতীয়াংশই ভাঙাচোরা। এমনকি দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা বা ব্ল্যাকস্পট নির্ধারণ এখনো বাকি। রং করে লক্কড়ঝক্কড় বাস পথে নামানোর প্রস্তুতি চলছে। ফলে গতবারের মতো এবারও সীমাহীন উদ্বেগ নিয়েই ঈদযাত্রায় পথে নামতে হচ্ছে ঘরমুখো মানুষকে।

সড়কপথের এমন পরিস্থিতিতে এবারও ঈদযাত্রায় চরম দুর্ভোগের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞ ও যাত্রী কল্যাণে কর্মরত সংস্থাগুলো। তাদের মতে, নির্বিঘœ ঈদযাত্রার জন্য সরকারের প্রস্তুতি পর্যাপ্ত নয়। দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে দুর্ভোগ বাড়তে পারে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, প্রতিবছরই নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবায়নে দুর্বলতা থাকে। ঈদের আগে ও পরে তিন দিন করে মোট ছয় দিন মহাসড়কে পণ্যবাহী যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা কোনোবারই মানা হয় না। এসব কারণেই গত বছর ঈদুল ফিতরে সড়ক দুর্ঘটনায় ১৯৬ জন নিহত হন। তাদের অধিকাংশের মৃত্যুর কারণ পণ্যবাহী যানবাহনের সঙ্গে যাত্রীবাহী বাসের সংঘর্ষ ও বেপরোয়া গতি। এই বিশেষজ্ঞ এই এবার ঈদে সড়ক ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

এ বছর ২৭ জুন মঙ্গলবার ঈদুল ফিতরের সম্ভাব্য দিন ধরা হয়েছে। তিন দিনের সরকারি ছুটি শুরু হচ্ছে ২৬ জুন সোমবার থেকে। অর্থাৎ ঈদের সরকারি ছুটি থাকবে সোম, মঙ্গল ও বুধবার। এর আগে শুক্র এবং শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি। ফলে কার্যত ছুটি শুরু হবে ২৩ জুন শুক্রবার থেকে। সে হিসাবে ২২ জুন থেকে মূলত ঈদে বাড়ি ফেরা শুরু হবে মানুষের।

বেহাল মহাসড়ক ২৬ শতাংশ, ভাঙাচোরা সড়ক ৩৭ শতাংশ : সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতরের মার্চের হিসাব অনুযায়ী, এ মুহূর্তে ২৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ মহাসড়কের অবস্থা বেহাল। জেলা সড়কসহ মোট ভাঙাচোরা সড়কের পরিমাণ ৩৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ সড়ক-মহাসড়কের এক-তৃতীয়াংশই ভাঙাচোরা। গত ঈদুল ফিতরের সময় ভাঙাচোরা সড়ক-মহাসড়কের পরিমাণ ছিল ৪৩ শতাংশ। বেহাল মহাসড়কের পরিমাণ ছিল ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ সারা দেশে ১৬ হাজার ৬২১ কিলোমিটার সড়ক ও মহাসড়কের মধ্যে এ মুহূর্তে ছয় হাজার ২০৬ কিলোমিটার সড়ক ও মহাসড়কের অবস্থা নাজুক।

সওজের তথ্যমতে, সারা দেশে জাতীয় মহাসড়কের দৈর্ঘ্য তিন হাজার ৮১২ কিলোমিটার। এর মধ্যে এক হাজার ৯৭৭ কিলোমিটার বা ৫৪ শতাংশের অবস্থা ভালো। মোটামুটি অবস্থায় রয়েছে ২৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ। বাকি ২০ দশমিক ২১ শতাংশের অবস্থা খারাপ। চার হাজার ২৪৬ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়কের মধ্যে ৪২ দশমিক ৮২ শতাংশের অবস্থা ভালো। অবশিষ্ট এক হাজার ২১৩ কিলোমিটার ভাঙাচোরা। আর চার হাজার ২৪৭ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ মহাসড়ক ভাঙাচোরা। এর মধ্যে ১৭০ কিলোমিটারের অবস্থা খুবই খারাপ। গত প্রায় এক বছর এসব সড়কে মেরামতের কাজ হয়নি ও এসব সড়ক সংস্কার করার মতো যথেষ্ট অর্থের বরাদ্দ নেই বলেও জানান সওজের কর্মকর্তারা।

মহাসড়কগুলোর অবস্থা আগের মতোই : গত ঈদেও ঘরমুখো মানুষকে যে তিনটি মহাসড়কে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়, সে মহাসড়কগুলোর অবস্থা একই রয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গের উত্তরের ১৬ জেলার যাত্রীদের একমাত্র রাস্তা ঢাকা থেকে গাজীপুরের চন্দ্রা, টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা হয়ে যমুনা সেতু পাড়ি দেওয়া। চন্দ্রা থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। এ কারণে গত ঈদেও দীর্ঘ যানজট হয়েছিল এবারও একই শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ২০১৫ সালে শুরু হওয়া এ মহাসড়কের কাজ শেষ হওয়ার কথা আগামী বছরের মার্চে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৩০ দশমিক ৭৪ শতাংশ। দক্ষিণবঙ্গের যাত্রীদের দুটি পথের একটি ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক। এ মহাসড়কও চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। রাস্তার একপাশে মাটি ভরাটের কাজ চলায় যানজট দেখা দিচ্ছে এখানেও। সবচেয়ে নাজুক অবস্থা ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের। এই মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে চার লেনের ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ চলছে। এর ফলে গাউছিয়া মার্কেট থেকে ভুলতা মোড় পর্যন্ত মহাসড়ক সরু হয়ে গেছে। গত ঈদেও এখানে ভুগতে হয়েছে যাত্রীদের। এবারের ঈদেও একই আশঙ্কা রয়েছে।

চলছে ভাঙাচোরা বাস মেরামতের কাজ : ঈদ সামনে রেখে লক্কড়ঝক্কড় বাসগুলো মেরামতের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন বাস মালিকরা। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, ঈদের সময় শুধু ঢাকা থেকে প্রতিদিন সড়কপথে যাতায়াত করে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ। ঈদের বিশাল বাজার ধরতে মরিয়া হয়ে ওঠেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। তাই পুরনো বাসগুলো কোনো রকম মেরামত করে প্রস্তুত করেন রাস্তায় নামানোর জন্য। বেসরকারি এক জরিপে দেখা যায়, বিগত বছরগুলোতে যে দুর্ঘটনা ঘটেছে তার ৩৫ থেকে ৪০ শতাংই ঘটেছে ঈদের সময়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির তথ্যমতে, মাত্র ছয় হাজার বাসে ঈদের তিন দিন সড়ক পথে যাতায়াত করেন ২০ লাখেরও বেশি যাত্রী। ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যায়।

ব্ল্যাকস্পট হয়নি : বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই) ২০১০ সালে জুনে সারা দেশের ২০৯টি স্থানকে অতি দুর্ঘটনাপ্রবণ (ব্ল্যাকস্পট) হিসেবে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সওজের কাছে চিঠি দিয়েছিল। তাদের মতে, দেশে সারা বছর যত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে, এর ৩৫ শতাংশ ঘটে জাতীয় মহাসড়কের ব্ল্যাকস্পট হিসেবে পরিচিত ৪ শতাংশ এলাকায়। এসব স্থান ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার মূল কারণ অবৈধ স্থাপনা। একটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে বছরে তিনবার বা তারও বেশি দুর্ঘটনা ঘটলে এটাকে ব্ল্যাক স্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এসব স্পটে সড়কের অস্বাভাবিক বাঁক থাকে, সড়কের পাশে হাটবাজার গড়ে ওঠে এবং সড়ক সংকেত থাকে না। কিন্তু এ পর্যন্ত মাত্র ১৪৪টি দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় (ব্ল্যাকস্পট) সড়ক বিভাজক বসানো ও বাঁক সোজা করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে অর্ধেকই বাকি।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ : এমন পরিস্থিতিতে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে কি ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে এমন প্রশ্ন ছিল বিশেষজ্ঞদের কাছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, এবার বর্ষাকালে ঈদ হচ্ছে। সড়ক ব্যবস্থাপনায় প্রকৃতিকে বিশেষ বিবেচনায় রাখতে হবে। ঈদযাত্রা তুলনামূলক কম দুর্ভোগের করতে সড়কে সমন্বিত ব্যবস্থা খুব দরকার। রাস্তার যেসব মোড়ে যানজট হয়, সেগুলোতে উন্নত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা করতে হবে। সবাইকে শৃঙ্খলা মানতে বাধ্য করলে যানজট কমবে। টোল প্লাজাগুলোতে গাড়ি থামিয়ে রেখে টোল দিতে হয়। যা যানজট ও দুর্ভোগের আরেকটা কারণ। সেখানে বিকল্প কিছু ভাবতে হবে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, এ মুহূর্তে নির্মাণাধীন সড়কগুলোর নির্মাণকাজ শেষ করা সম্ভব নয়। কিন্তু ভাঙাচোরা রাস্তাঘাটগুলো অন্তত সাময়িক সময়ের জন্য মেরামত করা যেতে পারে। সড়ক ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে। বিশেষ করে চালকদের বেপরোয়াগতিতে গাড়ি চালানো এবং গাড়ির অতিরিক্ত গতি ও ওভারটেকিং বন্ধ করতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী একজন চালকের একনাগাড়ে চার ঘণ্টা গাড়ি চালানোর পর বিশ্রাম নিয়ে আবার চার ঘণ্টা গাড়ি চালানোর কথা। কিন্তু ঈদে যাত্রী বেশি থাকায় বাস মালিক ও চালকরা সে নিয়ম মানে না। নিয়মটা মানাতে হবে।

পিডিএসও/হেলাল