চাল সঙ্কট : সর্বোচ্চ ছাড় দিতে হবে সরকারকে

প্রকাশ : ১৮ জুন ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৮ জুন ২০১৭, ১২:৪৯

প্রতীক ইজাজ

গত এক বছরে দেশের সব উৎস থেকেই চাল সরবরাহ কম হয়েছে। ফলে এই মুহূর্তে সরকারি ও বেসরকারি গুদামে তলানিতে এসে ঠেকেছে চালের মজুদ। গত বছর এই সময়ে সরকারি গুদামে চাল মজুদ ছিল ৬ লাখ টনের কম, সেখানে এখন তা নেমেছে ১ লাখ ৯১ হাজার টনে। এই মজুদ গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০১৫ সালে যেখানে বেসরকারি খাতে চাল আমদানি হয়েছিল ২ লাখ ৫৬ হাজার টন, সেখানে গত বছর হয়েছে মাত্র ১ লাখ ২৮ হাজার টন। আর এ বছর মে মাস থেকে শুরু হওয়া চলমান বোরো সংগ্রহ মৌসুমে আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে যেখানে চালকল মালিকদের থেকে সরকারের ৮ লাখ টন চাল সংগ্রহ করার কথা, সেখানে গত ১১ জুন পর্যন্ত সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ১৯ হাজার ৫৩২ টন। এ অবস্থা চলতে থাকলে চাল সংগ্রহের এই লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মজুদ কমে যাওয়ায় দফায় দফায় বাড়ছে চালের দাম। মোটা চালের পর বাজারে এবার সরু চালের দামও কেজিপ্রতি দুই টাকা করে বেড়েছে। মোটা চালের দামও কমার লক্ষণ নেই। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যমতে, এক বছরে মোটা চালের দাম বেড়েছে প্রায় ৪৭ শতাংশ। সরু চালের দাম বেড়েছে ২০ শতাংশ। এতে নিম্ন আয়ের মানুষ পড়েছে সবচেয়ে বিপাকে। তাদের আয়ের বেশিরভাগই চলে যাচ্ছে চাল কিনতে।

এই পরিস্থিতিতে সরকারকে সর্বোচ্চ ছাড় দিয়ে দ্রুত চাল আমদানির পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ এবং উন্নয়ন গবেষকরা। তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, বর্তমানে বিশ্ববাজারে ২০০৮ সালের মতো চালের সর্বোচ্চকালের ঊর্ধ্বমূল্যের প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন তারা। পরিস্থিতি এখনই সামাল দেওয়া না গেলে হঠাৎ করে চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে তা বাংলাদেশের মতো দেশের মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে। তারা একই সঙ্গে এমন পরিস্থিতির জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্বল তদারকি এবং ভুল নীতিকে দায়ী করছেন।

মজুদ সর্বনিম্ন, দাম সর্বোচ্চ : সরকারি গুদামে চালের বর্তমান মজুদ গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সরকারি গুদামে চাল ছিল মাত্র ১ লাখ ৯১ হাজার টন। এর আগে ২০১১-১২ অর্থবছরের একই সময়ে চালের মজুদ ছিল ৯ লাখ ৯৮ হাজার টন। আর গত অর্থবছরে ছিল ৬ লাখ ৯৬ হাজার টন। এবারই প্রথম চালের মজুদ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এমনকি বেসরকারি খাতেও দিন দিন চাল আমদানি কমছে বলেও জানা গেছে। গত বছর দেশে বেসরকারি খাতে চাল আমদানি হয়েছিল ২ লাখ ৫৬ হাজার টন। তার আগের বছর ১৪ লাখ ৯০ হাজার টন।

কারণ হিসেবে চাল আমদানিকারকরা জানান, প্রতি কেজি চাল আমদানিতে ৯ টাকা করে শুল্ক দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে ব্যাংকঋণ এবং অন্যান্য খরচ যোগ করে চালের দাম যা দাঁড়ায়, তাতে তাদের আমদানি করে পোষায় না। তাই চালের ঘাটতি সত্ত্বেও ব্যবসায়ীরা আমদানির দিকে যাচ্ছেন না। এছাড়া এবারকার বোরো মৌসুমে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রায় চাল সংগ্রহেও তেমন সাড়া মিলছে না। ৮ লাখ টন নির্ধারণ করেছে সরকার। প্রতি কেজি ধান ২৪ এবং চাল ৩৪ টাকায় কিনছে। কিন্তু মিলমালিকরা সাড়া না দেওয়ায় গত ৬ জুন পর্যন্ত সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ১৫ হাজার ৩৩৫ টন চাল।

অন্যদিকে, এর আগে ২০০৭-০৮ অর্থবছরে জরুরি অবস্থার সময় দেশে মোটা চাল সর্বোচ্চ প্রতি কেজি ৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। সরু চালের কেজি ছিল ৫৬ টাকা। স্বাধীনতার পর তখন ছিল চালের সর্বোচ্চ দর। এবার সেই দর ছাড়িয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের দুই দফার ক্ষমতায় (২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল) মোটা চালের কেজি ৩০ থেকে ৩৫ এবং সরু চাল ৪৫ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে ছিল। ওই সময় চালের মজুদ ভালো ছিল। কিন্তু এই প্রথম মজুদ সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায় চালের বাজার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

ভুল নীতি ও দুর্বল তদারকি দায়ী : বিশেষজ্ঞরা চালের নিম্ন মজুদ এবং দাম বেড়ে যাওয়ার জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়কে দায়ী করেছেন। তাদের মতে, সরকারের চালের মজুদ এখন দুই লাখ টনের নিচে নেমে এসেছে। অথচ তা কমপক্ষে ৬ লাখ টন থাকা উচিত ছিল। যখনই মজুদ ৫ লাখ টনের নিচে নেমে গেছে, তখনই খাদ্যমন্ত্রীর উচিত ছিল নিজে উদ্যোগ নিয়ে বা সরকারের শীর্ষ মহলে যোগাযোগ করে যেকোনো উপায়ে মজুদ বাড়ানো। চালের মতো এমন স্পর্শকাতর একটি পণ্য নিয়ে এমন অবিবেচকের মতো আচরণ করা উচিত হয়নি। একইভাবে চালকলের মালিকরা বলছেন, সরকার চাইলেও দামের কারণে তারা সরকারের কাছে চাল বিক্রি করতে পারছেন না। সরকার প্রতি কেজি চাল ৩৪ টাকা দিতে চাইছে, যা বাজারদরের চেয়ে অনেক কম। ধানের দর যেখানে ২৪ টাকা, সেখানে চালের দাম অন্তত ৩৮ টাকা হতে হবে।

আর খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে (১০ টাকা কেজি দরের চাল) সাড়ে ৭ লাখ টন চাল বিতরণ করায় মজুদ তলানিতে নেমেছে। ওই কর্মসূচি নেওয়ার আগে তেমন কোনো প্রস্তুতি অথবা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। আর এ কারণেই মজুদ কমার সঙ্গে সঙ্গে তা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যাও খাদ্যের মজুদ কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া চাল আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তটিও সঠিক ছিল না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শুল্ক বেশি হওয়ায় আমদানিকারকরা গত কয়েক মাস ধরেই আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন। অথচ সরকার এটাকে গুরুত্ব দেয়নি। উচিত ছিল আরো আগে বিষয়টির সমাধান করা।

সঙ্কট উত্তরণের পথ কী : এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি অধ্যাপক গোলাম রহমান জানান, এবার বোরো মৌসুমে ব্লাস্ট এবং হাওরে বন্যায় ধানের উৎপাদন কম হয়েছে। এ বিষয়টি আগে থেকেই গুরুত্ব দিলে মজুদ পরিস্থিতি এমন হতো না। এখন বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকে আমদানি করে ঘাটতি মেটাতে হবে। সরকার ১০ লাখ টন চাল আমদানির পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে আড়াই লাখ টন আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তবে এটা অনেক দীর্ঘ মেয়াদে। এতে অনেক সময় লাগবে। এখন অস্থির বাজার স্বাভাবিক করতে ভারতসহ যেকোনো দেশ থেকেই হোক, অতি দ্রুত চাল আমদানি করতে হবে, যা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বাজারে ছাড়া সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক কাজী সাহাবউদ্দিন জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বেশ ঊর্ধ্বগতির দিকে। দাম আরো বাড়ার আগে সরকারের উচিত দ্রুত চাল আমদানি করা। বেসরকারি খাতের মাধ্যমে চাল আমদানির সুযোগ করে দিতে শুল্ক কমাতে হবে। নয় তো সংকট বাড়লে অনেক বেশি দামে চাল কিনে খেতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতি এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকা আজকের এই সংকটের কারণ। মন্ত্রণালয়ের কাছে খাদ্য মজুদ এবং উৎপাদনের সর্বশেষ তথ্য রয়েছে। এরপরও ব্যবস্থা নেয়নি কেন? মজুদ কমার সঙ্গে সঙ্গে তা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। তাই সংকট বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা আগে থেকেই সংকটের আশঙ্কা করছিলেন। এ থেকে পরিত্রাণে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত দ্রুত এবং যতটা সম্ভব ছাড় দিয়ে সরকারি-বেসরকারি খাতে চাল আমদানি করা।

বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাস্কিং মিলমালিক সমিতির সভাপতি (বগুড়া জেলা শাখা) আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘দেড় মাস আগে আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে একটি বৈঠক করি। সেখানে তাকে আমরা বলি, চালের মজুদে সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া এবার গড়ে প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ কম উৎপাদন হয়েছে। চালের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগে। সংকট পূরণ করতে হলে আমদানি বাড়াতে হাবে। সরকারি কর্মকর্তা আমাদের কথা তখন আমলে নেননি।’

এই আমদানিকারক আরো বলেন, ‘চাল আমদানির ওপর আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের কথা গতকাল সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। আমরা আরো আগেই সরকারের কাছে এই অনুরোধ করেছিলাম। তখন সরকার পদক্ষেপ নিলে হয়তো সংকট এত বেশি হতো না। সঙ্কট কমাতে বিদেশ থেকে আমদানি করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। তার মতে, চাল আমদানি বাড়াতে হলে সরকারের উচিত আমদানি শুল্ক ২৫ থেকে অন্তত ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা। কিছুদিনের জন্য হলেও এটা করতে হবে। তাহলে আমদানিকারকরা চাল আমদানিতে উৎসাহ পাবেন।

পিডিএসও/হেলাল