যে কারণে বেড়েছে রেমিট্যান্স প্রবাহ

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২০, ০৭:৫৩ | আপডেট : ১১ জুলাই ২০২০, ১৪:৫১

বদরুল আলম মজুদার

চীনের উহান প্রদেশ থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসে সারা পৃথিবীতে যখন আর্থিক মন্দার প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে, ঠিক তখন বাংলাদেশের প্রবাসীরা বিভিন্ন দেশ থেকে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। এ নিয়ে সরকারের উচ্চমহলে অনেকটা স্বস্তিও লক্ষ করা গেছে। গত মার্চ মাস থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ নিম্নমুখী থাকায় অনেকে এ নিয়ে সতর্কবার্তাও দিয়েছিলেন। কিন্তু সব হিসাব পাল্টে দিয়ে গত জুন মাসে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে, যা অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্কভাবেই দেখছেন।

তারা বলছেন, জুন মাসে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে সৌদি আরব থেকে। অথচ দেশটি লকডাউন অবস্থা কাঠিয়ে সবে মাত্র স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। তাই এ অবস্থায় রেকর্ড রেমিট্যান্স আসাকে কাজ খুলে যাওয়ার প্রভাব হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ। আবার অনেকে বলছেন, মন্দার কারণে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে দেশে স্থানান্তর করা হচ্ছে। মূলত এ কারণেই জুনে বেশি রেমিট্যান্স আসছে। যেটা সামনের দু-এক মাস পর্যবেক্ষণ করা ছাড়া এর মূল কারণ এখনই বোঝা যাবে না।

জানা যায়, করোনার কারণে কাজ হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসীরা। এ সময় করোনার বিস্তার রোধে সবকিছু বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ছোট-বড় প্রায় সব প্রতিষ্ঠান। কাজকর্ম ফেলে নিজ আবাসেই কোয়ারেন্টাইনে এখনো আছেন লাখ লাখ প্রবাসী। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বেকার হয়ে দেশে ফেরার অপেক্ষায় যারা আছেন, তাদের সংখ্যাও কম নয়। দেশের প্রধান শ্রমবাজার সৌদি আরবের প্রবাসীরা করোনাকালে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় পড়েছেন। ঠিক তখনই দেশটি থেকে রেমিট্যান্স এসেছে সর্বোচ্ছ। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে একই রেমিট্যান্সের ঊর্ধ্বমুখিতা, নাকি প্রবাসীদের ঘরে ফেরার আয়োজন।

সোদি প্রবাসী পরিচালিত একটি গণমাধ্যম সূত্র জানায়, সৌদি আরবের পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে চাকরি কিংবা ব্যবসা থাকবে বলে মনে হচ্ছে না। ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে বিদেশি শ্রমিকদের দেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে। এজন্য দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ও ব্যবসার পুঁজি দেশে পাঠানোর চেষ্টা করছেন তারা। আর আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোয় বসবাসকারীরা বলছেন, দেশে থাকা স্বজনদের আয় নেই। এজন্য তারা ধার করে হলেও দেশে টাকা পাঠানোর চেষ্টা করেছেন। দেশে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে সৌদি আরব থেকে। গত মে মাসে দেশটি থেকে রেমিট্যান্স এসেছে রেকর্ড ৩৮০ মিলিয়ন ডলার। জুনে এসে সে রেকর্ডও ছাড়িয়ে যায়। গত মাসে দেশটি থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ৪৫০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি। যদিও গত মার্চ থেকে সৌদি আরবে ছিল টানা দুই মাসের লকডাউন। এ সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়া সব শ্রেণির দোকানপাট ছিল বন্ধ। যানবাহন ও যাতায়াতে আরোপ করা হয়েছিল কঠোর নিষেধাজ্ঞা। এ অবস্থায় ঘরে বসে থাকা প্রবাসীরা হঠাৎ করে কোথা থেকে এত অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন?

এমন প্রশ্নের জবাবে দেশটির জেদ্দায় বসবাসকারী বাংলাদেশি মাহবুবুর রহমান বলেন, এখানে একটি ইলেকট্রিক পণ্যের দোকান আছে আমার। মার্চের মাঝামাঝি থেকে মধ্য জুন পর্যন্ত টানা দোকান বন্ধ ছিল। মাঝেমধ্যে সীমিত পরিসরে খুললেও তাতে দৈনন্দিন খরচ উঠে আসেনি। সরকার জুনের মাঝামাঝি স্বাভাবিক পরিস্থিতি ঘোষণা করেছে। দোকানপাট খুলেছে। হাতে যা সঞ্চয় ছিল, তার সঙ্গে গত দুই সপ্তাহে বিক্রি হওয়া পণ্যের সব অর্থ দেশে পাঠিয়ে দিয়েছি। এ দেশে কত দিন থাকতে পারব, তা জানা নেই। পরিস্থিতি যা, তাতে সহসা দেশে ফিরতে হতে পারে।

মাহবুবুর রহমানের গল্পই সৌদি আরবে বসবাসকারী সিংহভাগ বাংলাদেশির পরিস্থিতি। সৌদি আরবের দাম্মাম শহরে একজন প্রতিষ্ঠিত সুপারশপ ব্যবসায়ী শফিউল বাশার মুকুল পাটওয়ারী। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সেখানে ব্যবসা করেন তিনি। ব্যবসার সুবাধে পরিবারের সবাইকে নিয়ে যান সেখানে। বেশ ভালোই ছিলেন। কিন্তু ২০১৭ সালে সৌদি সরকারের পরিবর্তিত আইনকানুন তার ব্যবসায় ব্যাপক প্রভাব ফেলে। প্রবাসী ব্যবসায়ীদের ট্যাক্স, লিভিং কস্ট ও শ্রমিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় একপর্যায়ে নিজের ব্যবসা ছোট করে ফেলেছেন তিনি। দেশে চলে আসবেন বলে একে একে পরিবারের সবাইকে দেশে পাঠিয়ে দেন এই প্রবাসী। বর্তমানে সামান্য বিনিয়োগ করে কোনো রকম ব্যবসা আছে সেখানে। বাকি ব্যবসার অর্থ দেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন। সর্বশেষ করোনা মহামারিতে সৌদি আরব কঠোর হওয়ায় ব্যবসা বন্ধ করে নিজেও দেশে চলে এসেছেন। মুকুলের মতো সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে ব্যবসা করার চিন্তা করছেন দাম্মামের ব্যবসায়ী রানা রহমানও। রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় সুদিন হারিয়ে এই বাংলাদেশি এখন দেশে ফেরার তোড়জোড় শুরু করেছেন।

একই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে অবস্থানকারী বাংলাদেশিদেরও। শ্রমবাজারে সংকট এবং করোনা মহামারির শিকার ওমানে কয়েক হাজার বাংলাদেশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তারা জানান, ওমানে ব্যবসা-বাণিজ্য সংকুচিত হওয়া, বাসাভাড়া, দোকান-ভাড়া, সার্ভিস চার্জ, কর্মচারীদের বেতন দেওয়া এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা। ওমানের মাস্কাট শহরে বসবাসরত বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনা পরিস্থিতির কারণে ওমানে যারা দীর্ঘদিন সুনাম ও দক্ষতার সঙ্গে ব্যবসা করছিলেন, তারা এখন বেশ চ্যালেঞ্জের মুখে। ওমানের সালালাহ শহরে টেইলারিংয়ের ব্যবসা করেন করিম শেখ। প্রতি মাসে অন্তত চার-পাঁচ লাখ টাকা উপার্জন করতেন তিনি। করোনার কারণে ওমানে পর্যটক প্রবেশ করতে না পারায় চার মাস ধরে ব্যবসায় মন্দা ভাব। সালালাহ শহরে দেড় শতাধিক টেইলারিংয়ের ব্যবসা রয়েছে বাংলাদেশিদের। করোনা মহামারির প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শ্রমবাজার কুয়েত ও কাতার আরব আমিরাতেও লেগেছে।

এদিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে জুনে। গত মাসে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ১৮৩ কোটি ২৫ লাখ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। ২০১৯ সালের জুনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৩৬ কোটি ৮২ লাখ ডলার। সে হিসেবে গত মাসে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৩৪ শতাংশ। প্রবাসীদের পাঠানো এ রিজার্ভের ওপর ভর করে এক মাসেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি বেড়েছে। গত বৃহস্পতিবার রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩৬ দশমিক ১৪৪ বিলিয়ন ডলার। বিধ্বস্ত অর্থনীতিতে হঠাৎ করেই রিজার্ভ বৃদ্ধির সংবাদে উচ্ছ্বসিত সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক।

উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ের উদাহরণ টেনে বিশেষজ্ঞরা বলেন, ১৯৯০ সালের ২ আগস্ট হঠাৎ করেই ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন কুয়েত দখল করে নেন। ওই সময় কুয়েতে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি ও জর্ডানি প্রবাসীরা সাদ্দাম হোসেনের পক্ষ নেয়। যুদ্ধে সাদ্দাম হোসেন পরাজিত হলে ফিলিস্তিনি ও জর্ডানি নাগরিকদের কুয়েত ছাড়তে বলা হয়। প্রবাসীরা দেশে ফিরলেও জর্ডানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তরতর করে বাড়তে থাকে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে জর্ডানের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করতে চান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহসান এইচ মনসুর। উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ছিলেন তিনি। তার মতে, বাংলাদেশের রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ বৃদ্ধির পরিস্থিতিও জর্ডানের মতোই। তবে মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা অপেক্ষাকৃত নিম্নপদে চাকরি করেন। তাদের হাতে খুব বেশি অর্থ নেই।

রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের লেবার কাউন্সিলর মেহেদী হাসান বলছেন, এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও রেমিট্যান্সের ঊর্ধ্বগতি হয়েছে, যা অনেকে চিন্তাই করতে পারেনি। এটি বাংলাদেশের জন্য স্বস্তি-দায়ক। তবে এর কারণগুলো বলা খুব কঠিন। কারণ সময়টা আসলেই ভালো নয়। আমরা আগামী দু-তিন মাস পর্যবেক্ষণ করব। তারপরও হয়তো রেমিট্যান্সের গতিপ্রকৃতি ও কারণগুলো সম্পর্কে ধারণা করা সম্ভব হবে।

পিডিএসও/হেলাল